প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পদ্মা সেতু : পরিবর্তিত নকশায় ১৫ মাস পর পিয়ারের পাইলিং শুরু

বাংলাদেশ জার্নাল : পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ চলা অবস্থায় গত বছরের জুলাইয়ে জটিলতা দেখা দেয় ১৪টি পিয়ারের নকশায়। পরবর্তী সময়ে একই জটিলতা দেখা দেয় আরো ছয়টি পিয়ারে। পরিবর্তন আনতে হয় এসব পিয়ারের নকশায়। ত্রুটি শনাক্তের ১৫ মাস পর সম্প্রতি পরিবর্তিত নকশার এসব পিয়ারের পাইলিং শুরু হয়েছে। এর মধ্যে মাওয়া প্রান্তের যেসব পিয়ারের নকশায় ত্রুটি দেখা দিয়েছিল, সেগুলোর পাইলিংয়ের কাজ চলছে পুরোদমে।

পদ্মা সেতুর ৬, ৭, ৮, ৯, ১০, ১১, ১২, ১৫, ১৯, ২৬, ২৭, ২৯, ৩০, ৩১, ৩২ ও ৩৫ নম্বর পিয়ারসংলগ্ন মাটির গঠনে ভিন্নতা পাওয়ার পর সেগুলোর পাইলিং স্থগিত রেখে নতুন করে নকশা প্রণয়নের উদ্যোগ নেয়া হয়। এর মধ্যেই ২৪, ২৫, ২৮, ৩৩, ৩৪ ও ৩৬ পিয়ারেও দেখা দেয় একই সমস্যা। এর পরিপ্রেক্ষিতে এসব পিয়ারের পাইলিং স্থগিত রাখা হয়। সেতুর ব্রিটিশ পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কাউইর প্রকৌশলীরা এসব পিয়ারের নতুন নকশা করে দিয়েছেন।

শুক্রবার সরেজমিন প্রকল্প এলাকা ঘুরে মাওয়া প্রান্তের ৬, ৭, ৮ ও ৯ নম্বরসহ বেশ কয়েকটি পিয়ারে পরিবর্তিত নকশায় পাইলিং করতে দেখা গেছে। এর মধ্যে ৬, ৭ ও ৮ নম্বর পিয়ারের পাইলিং কিছুটা দৃশ্যমানও হয়েছে। ৯ নম্বর পিয়ারের পাশে বসানো বিশালাকার হ্যামার। আরেকটি বিশালাকার হ্যামার রয়েছে ১২ ও ১৩ নম্বর পিয়ারের কাছে। একইভাবে মাঝ পদ্মার কয়েকটি পিয়ারেও চলছে পাইলিংয়ের কাজ।

পদ্মা সেতুতে পিয়ার হবে মোট ৪২টি। এর মধ্যে নদীর ভেতরে থাকা ৪০টি পিয়ারের প্রতিটিতে ছয়টি করে পাইল করার কথা ছিল। নকশা বদলে ফেলা পিয়ারে ছয়টির বদলে সাতটি করে পাইল করা হচ্ছে। ফলে পাইলের সংখ্যা ২৪০ থেকে বেড়ে ২৬২টিতে উন্নীত হচ্ছে।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্যানেল অব এক্সপার্ট টিমের সভাপতি অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী বণিক বার্তাকে বলেন, নতুন নকশায় ২২টি পিয়ারে ছয়টির বদলে সাতটি করে পাইল করা হচ্ছে। পাশাপাশি পাইলগুলোর গভীরতা স্থানভেদে ১০-১৫ মিটার পর্যন্ত কমানো হয়েছে। নতুন নকশা করা হয়েছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কাউইর তত্ত্বাবধানে। পরিবর্তিত নকশায় দ্রুত পাইলিংয়ের কাজ এগিয়ে চলছে।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের একাধিক প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেশির ভাগ পিয়ারের গভীরতা ১২০-১৩০ মিটার। তবে নকশায় পরিবর্তন আনা পিয়ারের পাইলের গভীরতা ৯৮ থেকে ১১৪ মিটারের মধ্যে রাখা হয়েছে। মাওয়া প্রান্তের পিয়ারগুলোর গভীরতা তুলনামূলক কম। জাজিরা অংশে পরিবর্তিত নকশার পিয়ারগুলোর গভীরতা সে তুলনায় বেশি হচ্ছে।

জানা যায়, কাউইর কাছ থেকে পদ্মা সেতুর পরিবর্তিত নকশা চলতি বছরের মার্চের দিক থেকে পেতে শুরু করে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন। ক্রমান্বয়ে সব পিয়ারের পরিবর্তিত নকশা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বুঝে পেয়েছে। সব মিলিয়ে এ জটিলতায় পেরিয়ে গেছে প্রায় ১৫ মাস।

তবে পিয়ারের নকশা জটিলতা সেতুর কাজকে দীর্ঘায়িত করবে না বলে জানিয়েছেন পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্যানেল অব এক্সপার্ট টিমের এক সদস্য। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, নকশা জটিলতা সেতুর নির্মাণকাজ বিলম্বিত করছে না। কারণ যে অংশটুকুর জন্য নকশায় পরিবর্তন আনতে হয়েছে, শুধু সেই অংশটিই তো মূল কাজ নয়। এর বাইরে আরো নানা কাজ রয়েছে। এ সময়ের মধ্যে সেগুলো এগিয়ে নিয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

তাহলে নির্মাণকাজে বিলম্বের কারণ কী, জানতে চাইলে তিনি বলেন, পদ্মা বিশ্বের বড় ও শক্তিশালী নদীগুলোর অন্যতম। এর তলদেশের মাটির অবস্থাও অন্য রকম। একেক স্থানের মাটির ধরন একেক রকম। বলতে গেলে প্রকৃতির সঙ্গে যুদ্ধ করে পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে হচ্ছে। এ প্রকল্পে প্রায় ১০ হাজার মানুষ কাজ করছেন। এর মধ্যে এক হাজার চীনা কর্মীও রয়েছে, যারা এক্সপার্ট হিসেবে কাজ করছেন। এর বাইরে ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট আছে, প্যানেল অব এক্সপার্ট আছেন। এত মানুষ তো আর বসে নেই। বিশাল কর্মযজ্ঞ চলছে। পলিটিক্যাল মাস্টাররা অনেকেই বলবেন যে এটা এখনো কেন হলো না। কিন্তু তাদের হয়তো ধারণা নেই যে কাজটা কত বড়। এ ধরনের ফাউন্ডেশন পৃথিবীতে এই প্রথম হচ্ছে। যে হ্যামার দিয়ে কাজ করা হচ্ছে, সে ধরনের শক্তিশালী হ্যামার পৃথিবীতে ছিল না। শুধু পদ্মা সেতুর জন্য পরীক্ষামূলকভাবে বানানো হয়েছে।

এখনো সেতুর অনেক কাজ বাকি উল্লেখ করে তিনি বলেন, নদীর তলদেশে পাইলিং করে কংক্রিট ঢেলে পিয়ার তোলা হচ্ছে। পিয়ার হয়ে যাওয়ার পর স্প্যান বসবে। সেগুলোর ওপর আবার বসবে কংক্রিটের বিম। রেললাইন বসাতে হবে। স্টেশন নির্মাণ করতে হবে। এখনো অনেক কাজ বাকি।

পদ্মা সেতু প্রকল্প কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, নদীর ভেতরে থাকা ৪০ পিয়ারের মধ্যে ১১টির কাজ পুরোপুরি শেষ হয়েছে। ২৬২টির মধ্যে টপ অ্যান্ড বটম পাইলিং হয়েছে ১৬৯টি। সেতুতে মোট স্প্যান বসবে ৪১টি। এর মধ্যে ১৭টি স্প্যান প্রকল্প এলাকায় এসে পৌঁছেছে, যার ছয়টি এরই মধ্যে স্থাপন করা হয়েছে। প্রকল্পের জন্য চীনের ওয়ার্কশপে স্টিল প্লেট থেকে স্টিল মেম্বার তৈরির কাজ শেষ হয়েছে ১৩টি স্প্যানের। কাজ চলছে আরো ছয়টির। এ স্প্যানগুলো চীন থেকে শিগগিরই মাওয়া ঘাটে এসে পৌঁছবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প কর্মকর্তারা।

প্রাক্কলন অনুযায়ী, পদ্মা সেতু প্রকল্পের মাওয়া ও জাজিরা প্রান্তের সংযোগ সড়ক ও সার্ভিস এরিয়া-২-এর নির্মাণকাজ পুরোপুরি শেষ। মূল সেতুর নির্মাণ ও নদী শাসনকাজের পরামর্শক তত্ত্বাবধানের কাজ সম্পন্ন হয়েছে ৭৫ শতাংশ। এখন পর্যন্ত নদী শাসনের কাজ শেষ হয়েছে ৪৫ শতাংশ।

জানতে চাইলে পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক শফিকুল ইসলাম বলেন, প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। কিছুদিনের মধ্যে সেতুর ওপর আরো একাধিক স্প্যান বসবে। এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক।

পদ্মা সেতু প্রকল্পের প্রাক্কলিত মেয়াদ শেষ হচ্ছে চলতি নভেম্বর মাসেই। এখন পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৫৯ শতাংশ। স্বভাবতই প্রকল্পের মেয়াদ বাড়াতে হবে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে প্রকল্পের মেয়াদ কতদিন বাড়ানো হতে পারে, তা জানতে চাওয়া হয় সেতু বিভাগের জ্যেষ্ঠ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলামের কাছে। তবে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ