Skip to main content

পৃথিবীকে অনিন্দ্যসুন্দর দুজন ভালো মানুষ উপহার

ড. সেলিম জাহান : প্রায় বিশ বছর আগের কথা। কুইবেকের প্রাদেশিক সংসদে আমন্ত্রিত হয়েছি মানব উন্নয়নের ওপরে বিশেষ বক্তৃতা দিতে। শেষ করেছি সবে। তুমুল করতালির পরে লোকজন ঘিরে ধরেছে আমাকে। তারমধ্যে দু’হাতে জনতার ভিড় ঠেলে একটি তণ্বী-তরুণী সামনে এসে জড়িয়ে ধরলো আমাকে, দু’গালে দুটি চুম্বনসহ। তার অস্ফুট ‘বাবা’ ডাকের মধ্যেই অনুভব করলাম সব- ভালোবাসার উষ্ণতা, গর্বের গভীরতা, আশ্রয়ের আস্থা। ‘কি যে সুন্দর বলেছো’- আমার চোখে তাকিয়ে গভীর মমতায় বলেছিলো সে, সেদিন বিকেলেই এ অনুষ্ঠানের জন্য বিশেষ করে কেনা তার কালো পোশাকে ঝিলিক তুলে। বছর তিনেক আগে আদিস আবাবাতে ২০১৫ সালের মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনের বৈশ্বিক উপস্থাপন। অনুষ্ঠান শুরু হবে কিছুক্ষণ পরেই। বিশাল হলঘরের সুসজ্জিত মঞ্চে উপবিষ্ট ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী, জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচীর প্রশাসক ও আমি। সবকিছু বিস্মৃত হয়ে আমার চোখ তখন অস্থির-উৎসুক হয়ে একটি মুখই খুঁজে বেড়াচ্ছে। যাকে খুঁজছি, সেও আমার চাঞ্চল্য ধরতে পেরেছে। কিছুক্ষন পরে লাজুক হাসিতে কিছুটা হাত তুলে শেষের সারি থেকে সে আমাকে জানান দিল - আছে সে, আছে এখানেই - আমাদের কনিষ্ঠা কন্যা। এ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে দু’দিন আগেই সে এসেছে তার কর্মসস্থল দক্ষিণ সুদানের জুবা থেকে। পরে সে আমাকে বলেছিল, কোনো কিছু না দেখে কোথাও না আটকে তিরিশ মিনিট সংখ্যাবিপুল এ রকমের বক্তব্য সে আর শোনে নি। আজ দু’জনেই অনেক বড় হয়ে গেছে - সুপ্রতিষ্ঠিত জীবনে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তাদের কাজ - যার সূত্রে ঘুরে বেড়াই বিশ্বময়। কিন্তু তবু তাদের দিকে এখনও তাকালে তাদের ছোট বেলার কথাই আমার মনে পড়ে যায়। ঐ তো ম্যাকগিলের মাঠে বড়টি একটি গাছের ছোট্ট ডাল হাতে ধরে তীরের মতো ছুটছে শেররুক সড়কের দিকে। পেছনে ছুটন্ত তাদের মা - পেরে উঠছে না বেচারা। অন্যদিক থেকে আসা আমার এক সহপাঠী আমাদের কন্যাটিকে ধরে তার মায়ের কাছে ফেরত দিচ্ছে। কিংবা সে যুগের লিখন-গণন যন্ত্র থেকে বার করা আমার অভিসন্দর্ভের জন্যে বড় বড় কাগজের দিস্তা ধাপ ধাপ করে অনুক্রমিকভাবে সাজানো টেবিলে। আমাদের কনিষ্ঠা কন্যা গুটি গুটি পায়ে সেখানে গেলো। চারদিকে চোরা চাহনিতে দেখলো কেউ আছে কি-না। তারপর এক ধাক্কা - ‘আমার সাজানো বাগান শুকিয়ে গেলোর’ মতো সাজানো সব কাগজ ছড়িয়ে পড়লো মাটিতে। আমার দাপ্তরিক কক্ষে তাদের অন্যান্য ছবির সঙ্গে আমাদের কন্যাদ্বয়ের খুব ছোটবেলার দু’টো ছবি আছে। তাদের বহু প্রতিবাদ সত্ত্বেও সরাইনি - বড় হয়ে যাওয়া দু’জন তরুণীকে বিব্রত করতে এরচেয়ে মোক্ষম অস্ত্র আর নেই। আমাদের মেয়ে দু’টোকে আসলে বড় করে তুলেছে তাদের প্রয়াত মা - আদরে-শাসনে। আমি শুধু পাশে ছিলাম - অনেকটা রাজমিস্ত্রীর পাশে যোগালীর মতো। তবু দোষ কিছু করলেই মেয়েরা ‘আমার মেয়ে’ হয়ে যেতো, নইলে অন্য সবসময়েই তারা ‘মায়ের মেয়ে’। আমি যে তাদের জন্য বহুকিছু করেছি, তার স্বীকৃতিতে কি যে কৃত্রিম হাসি-ভরা অনীহা ছিল সবার। এ সব কিছু নিয়ে কতো যে হাসি-ঠাট্টা হতো! তিনজন নারীর সঙ্গে এক চালার নিচে বসবাস বড় সহজ কর্ম নয়। আমার জীবনে একটি মধুরতম অভিজ্ঞতা ও বিরাট প্রাপ্তি হচ্ছে দু’টি মানব শিশুর জন্ম, বেড়ে ওঠা, পরিপূর্ণ মানুষ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা প্রত্যক্ষ করা এবং সে প্রক্রিয়ার অংশ হওয়া। আমাদের কন্যাদের শৈশবে তাদের হাত ধরে রেখেছি, তাদের বয়ঃসন্ধিকালে তাদের পাশে থেকেছি, তাদের যৌবনে ভাব-ভালোবাসার ভাঙ্গা-গড়ারও সাক্ষী থেকেছি। খুব ছোট বেলায় তার মা রাগ করে যখন তার ধার করে বইটি ছিঁড়ে ফেলেছিলো, তখন ভদ্রমহিলাকে লুকিয়ে আমার বড় কন্যা আর আমি দু’জনেই জলভরা চোখে আঠা দিয়ে এক এক পৃষ্ঠা জোড়া দিয়েছিলাম। রিকশায় পঠনরত তার ‘নন্টে-ফন্টে’ হাওয়ায় উড়িয়ে নিলে রিকশা ঘুরিয়ে বিহ্বল কনিষ্ঠা কন্যাকে নিয়ে নিউমার্কেটের ‘জিনাত বুক স্টোর’ থেকে বইটি আবার কিনে দিয়ে তার মুখে হাসি ফুটিয়েছিলাম। তাদের যৌবনে তাদের ছেলে বন্ধুদের বিষয়ে গল্প করেছি - নানান ঠাট্টা করেছি। তাদের বন্ধুদের বিষয়ে বহু মতামত দিতে হয়েছে - তার কিছু গ্রাহ্য হয়েছে, কিছু হয়নি। কখনও কখনও পুরুষজাতির অংশ হিসেবে ঐ সব যুবকদের অর্বাচীন কাজের জন্য তিরস্কৃত হয়েছি। তাদের কৃতকর্মের বোঝা আমাকেও বইতে হয়েছে। এখনও মানব জীবন ও সম্পর্কের নানান বিষয় নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলে - একমত, সহমত, মতানৈক্য সবই সেখানে বিদ্যমান। কতো ছোটখাটো জিনিস নিয়ে গল্পে মাতি আমরা। আমার বলা বহুলকাহিনী তারা গল্প বলেই মনে করে, মানে না সেটা। সত্যিই আমাদের বড় কন্যা সত্তর দশকে কানাডার বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডোর সঙ্গে কোনো একদিন ম্যাকগিলের মাঠে খেলেছিলো। কিংবা আশির দশকে নিউমার্কেটে কোনো এক ভিড়ের দিনে এক লহমার তরে আমাদের কনিষ্ঠা কন্যার হাত আমার থেকে বিচ্যুত হয়েছিলো। সত্যিই আমি ছাড়িনি সে কচি হাত। কিন্তু প্রশ্নবিদ্ধ রয়ে গেছে বিষয়টি- আমিই তার হাত ছেড়ে দিয়েছিলাম, না সে আমার হাত ছেড়ে দিয়েছিলো, সে বিতর্কের মীমাংসা এই তিরিশ বছর বাদেও হয়নি। আমার কন্যারা আমার পরম বন্ধু - আমার শিক্ষকও বটে। জীবনের বহু শিক্ষা, বহু সংবেদনশীলতা তো তাদের কাছেই পাওয়া। মা নেই, কন্যারাই তো মা আমার - শাসন করে, ভুল শোধরায়, কি করতে হবে বলে দেয়, আবার ভালোও তো বাসে পরম মায়ায়। একদিন পথ চলতে আমি তাদের কচি হাত ধরতাম, এখন তারা আমার হাত ধরে। জীবনে বহু প্রশংসা পেয়েছি, লাভ করেছি অনেক প্রশস্তি। কিন্তু বড় মায়াময় দু’টো সনদ এসেছে আমদের কন্যাদ্বয়ের কাছ থেকে। বেশ কিছুকাল আগে আমার বড় মেয়ে অবয়বপত্রে আমার একটি ছবি দিয়ে লিখেছিলোÑ ‘আমার বাবা, আমার দেখা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম পুরুষ’। তার গ্রন্থ ‘বাংলাদেশে গৃহকর্মে নিয়োজিত শ্রমিকেরা - ঢাকা শহরের একটি চালচ্চিত্রের ভূমিকায় আমদের কনিষ্ঠা কন্যা লিখেছিলো, ‘এটা লিখতে আমি গর্ব অনুভব করি যে, আজ থেকে বিশ বছর আগে এ বিষয়টির ওপরে আমাদের দেশের প্রথম কাজটি আমার বাবার, যার উল্লেখ অধ্যাপক অমর্ত্য সেন ঢাকায় তার নোবেল বিজয়োত্তর বক্তৃতায় উল্লেখ করেছিলেন’। হাসি পায় ভাবলে যে, আশির দশকে আমদের দু’কন্যা তাদের প্রয়াত মাতামহ অধ্যাপক কবীর চৌধুরীর সঙ্গে উত্তুঙ্গ তর্ক করতো যে, তাদের পিতা বেশি ভালো, না তাদের মাতার পিতাটি বেশি ভালো। অস্বীকার করবো না, আমাদের কন্যাদ্বয়ের প্রশস্তি আমাকে উদ্বেলিত করে, গর্বিতও করে। কিন্তু তাদের বিষয়ে আমার একটি অহংকারের গহীন জায়গা আছে। জানি, এ জীবনে জগৎ থেকে নিয়েছি অনেক, দিতে পারি নি তেমন কিছুই, শুধু একটি জিনিস ছাড়া। এ পৃথিবীকে দু’জন অনিন্দ্যসুন্দর ভালো মানুষ উপহার দিয়েছি। আর কি চাই এক জীবনে? লেখক : অর্থনীতিবিদ

অন্যান্য সংবাদ