প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড : নির্বাচন কি খেলা?

কাকন রেজা : অনেকে নির্বাচনের ‘লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড’ নিয়ে কথা বলছেন। নির্বাচন নিয়ে নানা ধরনের পরামর্শ দিচ্ছেন। তা দিন। কিন্তু আমি ‘প্লেয়িং ফিল্ড’ নিয়ে কথা বলতে কিছুটা ইতস্তত বোধ করি। নির্বাচনটাকে ঠিক খেলা হিসেবে ভাবা আমার সম্ভব হয় না, খেলার তুল্যও মনে করি না। প্রতিযোগিতা শুধু খেলার ব্যাপারেই নয়, মেধা-মননের ক্ষেত্রেও হয়। রাজনীতি সেই মেধা-মননের ক্ষেত্র। প্রতিযোগিতার একটি অংশ হলো খেলা, প্রতিযোগিতা খেলার অংশ নয়। সুতরাং ‘প্লেয়িং ফিল্ড’ শব্দটিতে আমার আপত্তি বরাবরের।

আপত্তি বিষয়ে বলি। কদিন আগে কাগজে দেখলাম, সম্ভবত গাজীপুরের এক ভদ্র্রলোক, নির্বাচন কমিশনে আবেদন করেছিলেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হতে এবং হবার প্রক্রিয়া জানার জন্য। গণমাধ্যম বিষয়টিকে নিয়েছে ফান হিসেবে, খবরও হয়েছে সেই ঢঙেই। কিন্তু ঢঙ করতে গিয়ে যে, বিষয়ের আসল রঙটা মুছে গিয়েছে, সে খবর রাখেনি খবরের মাধ্যম। এই যে, ‘প্লেয়িং ফিল্ড’ বা খেলার মাঠ বকতে বকতে নির্বাচনটা কতোটুকু খেলায় পরিণত হয়েছে, ওই ভদ্রলোকের আবেদনটিই তার প্রমাণ। যারা এই আবেদনটিকে হাস্যরসের বিষয় হিসাবে নিয়েছিলেন, আরেকটু ভাবলেই তারা দেখতে পেতেন, মূল হাস্যরসের ব্যাপার কোনটি; ওই আবেদন, না স্বয়ং নির্বাচন কমিশন তথা নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা।

ইংরেজিতে একটি প্রবাদ রয়েছে, ‘চেয়ার মেকস অ্যা ম্যান’। এ কথাটিতেও আমার আপত্তি রয়েছে। ‘আপার চেম্বারে’ যদি কিছু না থাকে, হুমায়ূন আহমেদের ভাষায় যাদের বলা হয় ‘ব্রেইনলেস ক্রিয়েচার’, তাদের চেয়ার বেটে খাওয়ালেও মানুষ বানানো সম্ভব না। যেমন সম্ভব না, গাধা পিটিয়ে মানুষ বানানো। সুতরাং একটি প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা অনুযায়ী চেয়ারে সেই মাপের মানুষ লাগে। চেয়ারের যোগ্য কিনা, যিনি চেয়ারে বসেন তাকেই তা প্রমাণ করতে হয়। সামনে নির্বাচন, যোগ্যতার পরীক্ষা চলছে নির্বাচন কমিশনের মানুষদেরও। ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে, তাদের অবস্থান। সফল হলে ইতিহাস ধরে রাখবে, ব্যর্থ হলে ‘রিসাইকেল বিন’ তো রয়েছেই। দুই. আমাদের রাজনীতিবিদরা নির্বাচনটাকে হয়তো খেলা হিসেবেই নিয়েছেন। যে খেলায় জয়লাভ করলে ‘কাপ’ পাওয়া যায়, প্রাইজমানি’ পাওয়া যায়। সম্ভবত ‘কাপ’টা হলো ক্ষমতা। হও বললে হয়ে যাওয়ার ক্ষমতা। নিজেদের প্রায় ঈশ্বর ভাবার ক্ষমতা। আর প্রাইজমানি হলো ‘মানি’, মালয়েশিয়ায় সেকেন্ড হোম, কানাডায় বেগম পল্লী বানানোর রসদ। যে রসদ যোগাতে, নিজ পরিজনের ভবিষ্যত নিরাপদ করতে, নিশ্চিত করতে; আমজনতার জীবনকে অনিশ্চিত ও অনিরাপদ করা ছাড়া গত্যন্তর থাকে না। যা করতে রডের বদলে বাঁশ দিতে হয়, সিমেন্টের বদলে দিতে হয় মাটি। দেশের ব্যাংক উজাড় করে বিদেশের ব্যাংক ভরতে হয়। বিশ্বে দ্রুত ধনী হওয়ার ‘তকমা’ অর্জন করতে হয়। আরো অনেক কিছু করতে হয়। এই অনেক কিছুর মধ্যে ‘সহমত ভাই’ ধরনের স্বভাবকূল জোগাড় করতে হয়। যারা বলবেন, ‘হুজুরের মতে অমত কার’। যারা বলবেন, ‘হুজুর হলেন সেরা, অন্যরা সব ভেড়া’।

তিন. খেলা খেলা করতে, আমাদের কিন্তু বেলা অনেকটাই গেলো। কদিন আগে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পার্লামেন্টে আলোচনা হলো আমাদের দেশকে নিয়ে, যুক্তরাষ্ট্রে কথা হলো, জাতিসংঘ বললো, একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের কথা। সবার অংশগ্রহণমূলক অবাধ-সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা। বিশ্বের নেতৃস্থানীয় প্রতিটি দেশই একই সুরে কথা বলেছে। গত নির্বাচনে একটি মাত্র দেশ ভারত চুপ থাকলেও এবার তারাও বলছে একই সুরে। যার প্রতিধ্বনি হয়েছে একজন নির্বাচন কমিশনারের কথায়। তিনি বলেছেন, এবারের নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে বিশ্বে মুখ দেখানো যাবে না। যদিও ‘মি-টু’র ধাক্কা লেগেছে দেশে; তবু বলবো আমাদের রাজনীতিবিদরা কাপুরুষ নন, মন ও মননে পুরোটাই পুরুষ। আর ‘লজ্জা-দ্বিধা-ভয়’ এই তিন পুরুষের থাকতে নয়। আর রাজনীতির এমনসব সিংহ হৃদয় পুরুষদেরদের থাবার বাইরে কী নির্বাচন কমিশন রয়েছে? এমন প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে নির্বাচন কমিশনকেই। না হলে, আগামীতেও বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য হওয়ার আবেদন পড়বে কমিশনে।

লেখক : সাংবাদিক ও কলাম লেখক।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ