প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মহম্মদপুর যুদ্ধ দিবস আজ
আপন দুই সহোদরসহ তিন শহীদের আত্মত্যাগের গৌরব উজ্জল ইতিহাস

রক্সী খান, মাগুরা : মহম্মদপুর যুদ্ধ দিবস আজ। স্বাধীনতার ইতিহাসে এই দিন টি একটি ঐতিহাসিক দিন। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে এদিন পাক সেনাদের সাথে মহম্মদপুরের মুক্তিযোদ্ধাদের এক ভয়াবহ যুদ্ধ সংগঠিত হয়। এ যুদ্ধে আহম্মদ হোসেন ও মহম্মদ হোসেন নামে আপন দুই সহদরসহ ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙ্গালী সৈনিক মহম্মদ আলী পাকিস্থানী সেনাদের গুলিতে নিহত হন। এই দিনটি মহম্মদপুর বাসীর কাছে অত্যন্ত বেদনা বিধূর ও নিষ্ঠুরতম।

মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন ও মহম্মদপুর বাসী দিনটি যথাযোগ্য মর্যাদায় নানা কর্মসুচীর মাধ্যমে পালন করছেন। এ উপলক্ষে আজ সোমবার উপজেলার নাগড়িপাড়া গ্রামে শহীদ দ্বয়ের নীজ বাড়িতে আলোচনা সভা, কোরআন খানি, মিলাদ মাহফিল, কাঙালী ভোজ ও কবর জিয়ারত অনুষ্ঠিত হয়।

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে ১৯ নভেম্বর মহম্মদপুর উপজেলা সদরে সংগঠিত রণাঙ্গনে পাকিস্থানী বাহিনি ও তাদের দোসরদের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে শহীদ হন আপনা দুই সহদর বীর মুক্তিযোদ্ধা হাবিবুর রহমান, মহম্মদ ও আহম্মদ হোসেন। এরা উপজেলার নাগড়িপাড়া গ্রামের আফসার উদ্দিনের পূত্র। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এই বিরোচিত যুদ্ধ মহম্মদপুর যুদ্ধ নামে পরিচিত।
১৯৭১ সালের অক্টোবর মাসের প্রথম দিকে পাকিস্থানী সেনারা স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় টিটিডিসি ভবনে (বর্তমান উপজেলা পরিষদ) ক্যাম্প স্থাপন করে উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে লুটপাট ও নিরীহ মানুষের উপর নানা রকম অত্যাচার ও নির্যাতন চালায়। ওই ভবনেই তারা শক্তিশালী পর্যবেক্ষক চৌকি তৈরী করে।

এই ক্যাম্প দখলের লক্ষ্যে আক্রমন করার সিদ্ধান্ত নেয় মহম্মদপুরের মুক্তিযোদ্ধারা। ১৮ নভেম্বর আনুমানিক রাত একটায় উপজেলা সদর থেকে দক্ষিন পশ্চিমে ৭ কিঃমিঃ দুরে ঝামা বাজারে সমবেত হয় তারা। আক্রমন পরিকল্পনা অনুযায়ী মুক্তিযোদ্ধা কোমল সিদ্দিকি (বীর উত্তম) ও তার বাহিনীর ৫০ জন মক্তিযোদ্ধা টিটিডিসি ভবনের দক্ষিন কোনে, আবুল খায়ের ও নুর মোস্তফার যৌথবাহিনীর ৫৫জন মুক্তিযোদ্ধা উত্তর দিকে, বীর প্রতিক গোলাম ইয়াকুব মিয়ার নেতৃত্বে ২০৫ জন মুক্তিযোদ্ধা দক্ষিন পশ্চিমে এবং আহম্মদ হোসেনের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা উত্তর পূর্বকোনে অবস্থান করেন। সিদ্ধান্ত ছিল কমল সিদ্দিকির বাহিনী ও ইয়াকুব হোসেনের বাহিনী আক্রমন করবে এবং অপর বাহিনী সামনের দিকে এগিয়ে যাবে।

কিন্তু ঝামা বাজার থেকে মহম্মদপুর আসতে বেশী দেরী হয়ে যাওয়া এবং পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করতে না পারায় ফজরের আযানের মাত্র আধা ঘন্টা আগে পাকিস্থানী সেনাক্যাম্পে মুক্তিবাহিনী আক্রমন চালায়। দীর্ঘক্ষণ দুই পক্ষের মধ্যে গুলি বিনিময় হয়। হানাদার বাহিনীর ব্যাপক গোলাবর্ষনের মুখে এক সময় মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটার সিদ্ধান্ত নেয়। এসময় হানাদার বাহিনীর একটি গুলি আহম্মদ হোসেনের মাথায় বিদ্ধ হয়। বড়ভাই মহম্মদ হোসেন ছোট ভাইকে বাঁচাতে ছুটে যাওয়ার প্রাক্কালে তিনিও গুলি বিদ্ধ হন। দুই ভাই পরস্পরকে জড়িয়ে ধরে গড়াতে গড়াতে পুকুরের পানিতে পড়ে যান এবং সেখানেই শহীদ হন আপনা দুই সহদর। অল্প সময়ের ব্যাবধানে শহীদ হন ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের বাঙ্গাালী সৈনীক মহম্মদ আলী। এই দুই শহীদ সহোদর আহম্মদ,মহম্মদ ও মহম্মদ আলীকে উপজেলার নাগড়িপাড়া গ্রামে পাশাপাশি দাফন করা হয়।

তাদের স্মৃতি চারণে মহম্মদপুর উপজেলা পরিষদ মহম্মদপুর শহরে শহীদ আহম্মদ-মহম্মদ মার্কেট এবং উপজেলা সদর থেকে নাগড়িপাড়া অভিমূখি সড়কটি আহম্মদ-মহম্মদ নামকরণ করা হয়েছে। স্বাধীনতা সংগ্রামের এই মহান দুই শহীদের ৪৭তম শাহাদৎ বার্ষিকী নানা আয়োজনে আজ রবিবার পালিত হবে। অনুষ্ঠান মালার মধ্যে রয়েছে আলোচনা সভা, কুরআনখানী, মিলাদ মাহফিল, কাঙ্গালী ভোজ ও কবর জিয়ারত। মহম্মদপুরের মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন শোক ও গৌরবের এই দিন টিকে দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ভাবে শহীদ দিবস ঘোষনার দাবী করে আসলেও উপজেলা প্রশাসন কোনো পদক্ষেপ গ্রহন করছেন না অভিযোগ করেন মুক্তিযোদ্ধারা। মহম্মদপুর উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক ডেপুটি কমান্ডার আঃ হাই বলেন, মহান দিনটিতে সরকারি কোনো উদ্যোগ না থাকায় আমরা নিজেদের উদ্যোগে এ দিনটিকে যথাযোগ্যভাবে পালন করে থাকি।

উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. হাসিফুর রহমান আমাকে বলেন, মুক্তিযোদ্ধা সংগঠন বা শহীদ পরিবারের কেউ এ বিষয়ে আমাকে অবহিত করেননি। তবে এমন মহান বিষয়ে আমি সব সময় সার্বিক সহযোগিতা করতে প্রস্তুত আছি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ