প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দিশেহারা চাষীরা
সাতক্ষীরার সাদা সোনা খ্যাত চিংড়ি চাষে মারাত্মক বিপর্যয়

শেখ ফরিদ আহমেদ, সাতক্ষীরা : সারাদেশ থেকে যে পরিমান চিংড়ি রপ্তানি হয় তার সিংহভাগই উৎপাদন সাতক্ষীরা জেলা থেকে। এ জেলার ৬টি উপজেলার অর্ধ লক্ষাধিক হেক্টর জমিতে সাদা সোনা নামে খ্যাত এই চিংড়ি চাষ হয়। মূলত বাগদা, গলদা ও হরিণা প্রজাতির চিংড়ি চাষ হয় এই জেলাতে। এর মধ্যে বাগদা ও গলদা দেশের বাইরে রপ্তানি হয় এবং হরিণা চিংড়ি দেশের আভ্যন্তরীণ বাজারে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। শুধু মাত্র চিংড়ি রপ্তানি করে সরকার সাতক্ষীরা থেকে বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি বৈদেশীক মুদ্রা অর্জন করে থাকে।

কিন্তু চলতি বছর (২০১৮সালে) চিংড়িতে ভাইরাস ও মড়ক দেখা দেয়ায় চাষীদের প্রায় পথে বসার উপক্রম হয়েছে। এক দিকে যেমন রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভাব, অন্যদিকে চিংড়ির দাম কমে যাওয়ায় দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চাষীরা। ফলে জেলার ছোট বড় অসংখ্য চিংড়ি চাষী তাদের মূলধন হারিয়ে পথে বসার উপক্রম হয়েছে। চলতি বছর জেলায় প্রায় ১০০ কোটি টাকার চিংড়ি মাছ মরে গেছে।

এদিকে, সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে ঘেরে পানি সল্পতা, পরিবেশ সম্মত না হওয়া এবং রেনু পোনা জীবানুমুক্ত না হওয়ায় মৎস্য ঘেরে ভাইরাস দেখা দিচ্ছে।

সাতক্ষীরার আশাশুনি উপজেলার সরাবপুর গ্রামের বিশিষ্ট চিংড়ি চাষি রাজ্যেস্বর দাশ জানান, বিগত ৩০ থেকে ৩৫ বছর যাবত তিনি রপ্তানিজাত চিংড়ি উৎপাদন করে আসছেন। চলতি মৌসুমেও তিনি ২ হাজার ৫০০ বিঘা পরিমান জমিতে বাগদা চিংড়ি চাষ করেছেন। তবে গত এক দশকের মধ্যে চলতি বছর চিংড়ি চাষে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন বলে জানান তিনি। তিনি জানান, চলতি বছর উৎপাদন শুরুর পর থেকে চিংড়িতে ব্যাপক হারে মড়ক লাগে। চিংড়ি গ্রেড হওয়ার কাছাকাছি এসেই তা মরে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে। এতে তার কম পক্ষে ২ কোটি টাকার উপরে লোকসান হয়েছে। তাছাড়া বছরের শেষ দিক এসে চিংড়ির দামও ভালো পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে তিনি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছেন বলে জানান।

বাংলাদেশ চিংড়ি চাষি সমিতির সাধারন সম্পাদক ডাক্তার আবুল কালাম বাবলা জানান, চলতি মৌসুমে তিনি প্রায় দেড় হাজার বিঘা মৎস্য ঘেরে বাগদা চিংড়ি চাষ করেছেন। কিন্তু ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে তার ঘেরের অধিকাংশ চিংড়ি মাছ মরে গেছে। তিনি বলেন, ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে চলতি মৌসুমে আধা-নিবিড় পদ্ধতিতে আরো প্রায় ১০০ বিঘা পরিমান পুকুরে বাগদা চিংড়ি চাষ শুরু করেছেন। কিন্তু তাতেও মড়ক লেগে সমুদয় চিংড়ি মরে গেছে। এতে তার প্রায় ১ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। তিনি আরো বলেন, চলতি বছর জেলায় বিভিন্ন চিংড়ি ঘেরে মড়ক লেগে যে পরিমান চিংড়ি মারা গেছে তার মুল্য কমপক্ষে ১০০ থেকে ১২০ কোটি টাকা হবে।

সদর উপজেলার ফিংড়ি গ্রামের চিংড়ি চাষি সামছুর রহমান ও জালাল উদ্দিন জানান, চলতি বছর ভাইরাসসহ অন্যান্য রোগবালাইয়ে তাদের ঘেরের চিংড়ি মাছে মারাত্বক ক্ষতি হয়েছে। এরমধ্যে সামছুর রহমানের প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লাখ টাকার লোকসান হয়েছে। একই অবস্থা চাষি জালাল উদ্দীনের।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুর রব জানান, সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারে চিংড়ির চাহিদা কমে যাওয়ায় ভালো দাম পাচ্ছেন না চাষীরা। দুই মাস আগে যে চিংড়ি ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে তা এখন ৫৫০ থেকে ৬০০ টাকা দামে বিক্রি হচ্ছে। ফলে চাষি ও ব্যবসায়ী উভয় ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য অফিস সুত্রে জানা গেছে, চলতি বছর সাতক্ষীরার ছয়টি উপজেলার ৪৯ হাজার ১৬৩ টি নিবন্ধিত ঘেরে রপ্তানিজাত বাগদা চিংড়ি চাষ করা হয়েছে। এরমধ্যে সাতক্ষীরা সদরে ২ হাজার ১০৫ টি, তালায় ১ হাজার ২৯৫টি, দেবহাটায় ২ হাজার ৮২৯টি, আশাশুনিতে ১৩ হাজার ২১৭টি, কালিগঞ্জে ১৪ হাজার ৫৫৯টি ও শ্যামনগর উপজেলায় ১৫ হাজার ১৫৮টি ঘেরে রপ্তানিজাত বাগদা চিংড়ি চাষ করা হয়েছে। যার উৎপাদন লক্ষ্য নির্ধারন করা হয়েছে ২৭ হাজার ৫০০ মেট্রিকটন। গত বছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ২৬ হাজার মেট্রিকটন।

বাংলাদেশ চিংড়ি চাষি সমিতির সাবেক সভাপতি ডাক্তার আফতাফুজ্জামান জানান, দেশের উপকুলীয় জেলা সাতক্ষীরাতে বানিজ্যিক ভাবে চিংড়ি চাষ শুরু হয় মুলত ১৯৭২ সালের দিকে। এর আগে তেমন ভাবে খুবএকটা আগ্রহ ছিলো না সাধারন চাষিদের। কিন্তু ৭২ সালের পর থেকে যখন এটি বিদেশে রপ্তানি‘র চাহিদা বাড়তে লাগলো তখন থেকে এ জেলার মানুষের মধ্যে আগ্রহ বাড়তে থাকে। তখন প্রাকৃতিক উপায়ে রেনু পোনা সংগ্রহ করে ঘেরে চাষ করা হতো। আর তখন চিংড়িতে রোগবালাইয়ের প্রাদুর্ভাবও ছিলো না। তিনি আরো বলেন, যখন থেকে হ্যাচারী পোনার উপর সাধারন চাষিরা নির্ভর হতে শুরু করলো তখন থেকেই চিংড়িতে নানা ধরনের রোগ বা ভাইরাসে আক্রান্ত হতে থাকে।

সাতক্ষীরা জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. শহীদুল ইসলাম জানান, এ জেলায় চিংড়িতে এতো বেশি ভাইরাস দেখা দেয়ার অনেকগুলো কারন রয়েছে। এরমধ্যে অন্যতম কারন হচ্ছে ঘেরে পানি সল্পতা ও পরিবেশ সম্মত না হওয়া। জেলার অধিকাংশ ঘেরে ৩ ফুট পরিমান পানি থাকে না। তাছাড়া অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে ঘের তৈরী করা হচ্ছে। এছাড়া যে রেনু পোনা ছাড়া হয় তা জীবানুমুক্ত নয়। ঘেরের তলা ঠিকমত শুকানো হয় না। যে কারনে পরিবেশ সম্মত না হওয়ায় ঘেরে মড়ক বা ভাইরাস লেগে মাছ মরে যায়। তার পরও জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বিভিন্ন এলাকার চিংড়ি চাষীদের পরামর্শ দেয়া হয়ে থাকে যাতে করে স্বাস্থ্যসম্মত চিংড়ি চাষ করা যায়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ