প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সুখকর সারপ্রাইজ এবং বিশ^মানের বিশ^বিদ্যালয় আকাক্সক্ষা

কামরুল হাসান মামুন : ১৩ নভেম্বর বুধবার সকালে আমার অফিসের দরজায় নক। খোলা মাত্রই দেখি একটি সুখকর সারপ্রাইজ! আমাদের ছাত্র নাফিস ইশতিয়াক। ও কানাডার বিখ্যাত পেরিমিটার ইনস্টিটিউটে পিএইচডির প্রায় শেষ দিকে। দরজা খুলে বসতে বললাম। সময় কতো দ্রুত চলে। মনে হচ্ছিলো এই তো সেই দিনের কথা, যখন দ্বিতীয় বর্ষের ল্যাব ক্লাস করছিলো। সেই ছেলেটি আজ পরিপূর্ণ সধঃঁৎবফ একজন মানুষ যার সাথে বয়সের পার্থক্যের গন্ডিকে  ছাড়িয়ে পৃথিবীর তামাম বিষয়ে কথা বলা যায়।

কথায় কথায় আমাদের এখানে গবেষণার প্রসঙ্গ এসেছিলো। বললাম আমাদের এখানে গবেষণার ন্যূনতম পরিবেশও নেই। আমি যে বিষয়ে গবেষণা করি সেই বিষয়ের একজন গবেষকও বাংলাদেশে নেই। গবেষণার কোনো বিষয়ে যে কারো সাথে কথা বলবো সেইরকম একজন মানুষও নেই। আজ এতো বছর যাবৎ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছি হাতেগোনা দুয়েকজন সহকর্মী ছাড়া কেউ কখনো জানতে চায়নি আমি কি বিষয়ে কাজ করছি। শেষ যেই আর্টিকেলটি প্রকাশিত হয়েছে সেটি কিসের ওপর? আমাদের আলোচনার বিষয় শিক্ষক রাজনীতি, জাতীয় রাজনীতি, নির্বাচন, প্রমোশন, কে কি সুযোগ সুবিধা পেল বা পেলো না ইত্যাদি।

কথায় কথায় ও বলছিলো ওর গ্রুপে চারজন পোস্ট-ডক এবং ততোধিক পিএইচডি ছাত্র আছে। তারা প্রতিদিন একসাথে ক্যাফেটেরিয়াতে লাঞ্চ করতে যায়। বললো এই সময়টাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়। দেখা গেছে কোনো একটি জটিল প্রব্লেমের  সমাধান হচ্ছিলো না কিন্তু ওই সময় অন্যদের সাথে বিষয়টি শেয়ার করে আলোচনা করলে সমাধান বের হয়ে আসে। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যাফেটেরিয়া যাকে ব্রিটিশরা রেফেক্টরি বলে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এতোবড় একটি কার্জণ হল! অথচ এর ভিতরে কোনো ক্যাফেটেরিয়া নেই যেখানে ছাত্রশিক্ষক একত্রে বসে খাবে, গল্প করবে এবং ওইসব আলোচনার মাধ্যমে অনেক কিছুই শেখা হবে, জানা হবে। এটাই হলো একটি টিপিকাল বিশ্ববিদ্যালয়ের আবশ্যিক অনুসঙ্গ। আর এটিই আমাদের এখানে মিসিং।

আমরা যখন ছাত্র ছিলাম তখন বর্তমান প্রকৌশল অনুষেদের ডিন কার্যালয় যেখানে সেটি ছিলো মোটামোটি ভালো মানের ক্যাফেটেরিয়া। যেখানে ছাত্রছাত্রীদের খেলাধুলা এবং ছাত্রশিক্ষকদের খাওয়ার ব্যবস্থা ছিলো। খেলাধুলার ব্যবস্থা ছাড়া সেখানে এখনো খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থা আছে তবে মান দিনদিন নামতে নামতে তলানিতে। একটি পার্থক্য হলো ছাত্র-শিক্ষকদের বসা এবং খাওয়ার জায়গা আলাদা। কাঁচঘেরা একটি ছোট রুমে শিক্ষকরা আর বাকি খোলা জায়গায় ছাত্ররা। কী আশ্চর্য যেন ছাত্র-শিক্ষক কোনো আলাদা স্পেসিস। শিশুরা যেমন বড়দের সাথে বিশেষ করে বাবা মায়েদের সাহচার্যেই সবচেয়ে বেশি শেখে ঠিক তেমনি ছাত্ররাও শিক্ষকদের সাহচার্যেই শিখবে। ছাত্ররা শিক্ষকদের শুধু ক্লাসরুমের ডায়েসে দেখে। এর বাইরে ছাত্রশিক্ষক সম্পর্ক গড়ে উঠতে দেখি না। আমাদের সময় আমাদের পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের অফিসের ঠিক পেছনে মতিনের ক্যান্টিন ছিলো। টপ অফ দ্য আওয়ারে ক্লাসের শেষে আমরা দৌড়ে ওখানে যেতাম সিনিয়র জুনিয়র মিলে চা-টায়ের সাথে গল্প হতো, আড্ডা হতো। এর মাধ্যমে সিনিয়র জুনিয়রদের মাঝে একটি সম্পর্ক গড়ে উঠতো। সেই ক্যান্টিন এখন আর নেই। এইসবই প্রমাণ করে দিন দিন আমরা নিম্নগামী হচ্ছি। আমাদের সময় টিএসসিও ছিলো জমজমাট। ওখানকার খাওয়ার মান মন্দ ছিলোনা। টেবিল টেনিস খেলার ব্যবস্থা ছিলো। নিয়মিত ওখানে গিয়ে খেলতাম।

নাফিসকে দেখে মনে হচ্ছিলো পড়াশোনাই মানুষকে সুন্দর করে, আলোকিত করে। সাজসজ্জা বা ফেয়ার এন্ড লাভলী না। জ্ঞানই হলো সৌন্দর্যের আধার। বিশ্ববিদ্যালয় হলো এমন একটি ফ্যাক্টরি যার কাজই হলো প্রথম বর্ষে ভর্তি হওয়া ছাত্রটিকে চার/পাঁচ বছরের মধ্যে এমন পরিবর্তন যে তার আপন বাবা-মা-ই সন্তানকে দেখে চমকে উঠে। আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও করে। কিন্তু পরিবর্তনটা সবার জন্য পজেটিভ নয়। তারপরও আমাদের যেই ছাত্রটি এখন মাস্টার্সে তাদের অনেককেই আমি দ্বিতীয় বর্ষের ল্যাবে পেয়েছি। আমি টের পাই কতো পরিবর্তন ঘটেছে। অথচ সত্যিকারের বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় হলে অধিকাংশের মধ্যে বড় আকারের পজেটিভ পরিবর্তন আসতো।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ