প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নওগাঁয় রুলিবালা তৈরি করে বহু নারীর সংসারে ফিরেছে স্বচ্ছলতা

আশরাফুল নয়ন, নওগাঁ প্রতিনিধি: অনেকটা স্বর্নের মতো দেখতে অথচ ব্রঞ্জ দিয়ে তৈরি রুলিবালা। আর এই রুলিবালা তৈরি করে গৃহবধু সুচরিতা, হাসনা হেনাসহ বহু নারীর সংসারে ফিরে এসেছে স্বচ্ছলতা। গত তিন বছর আগে যেখানে সাংসারিক কাজের পাশাপাশি প্রতিবেশেীদের সাথে গল্প করে সময় পার করতেন এই নারীরা। আর এখন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নকশা কাটা ছোট ছোট হাতুড়ি ও সেনি দিয়ে ব্রঞ্জ দিয়ে তৈরি করা রুলিবালায় নানা ধরণের নকশার কারুকার্য ফুটাতে ব্যস্ত থাকেন। আর এই কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিত্য নৈমিত্তিক সাংসারিক কাজও করেন । প্রতিজন দিনে পাঁচ জোড়া রুলিবালায় নকশা তৈরি করে দিলে ২শ’ টাকা করে মজুরি পান তারা।

সুচরিতা এই কাজ করে যে পরিমান টাকা আয় করেন তা দিয়ে গত দুই বছর থেকে মাসে ২ হাজার টাকার মুদারাবা মাসিক কিস্তি (ডিপিএস) খুলেছেন। মেয়ে সুমাইয়া গ্রামের স্কুলে ৬ষ্ঠ শ্রেণীতে পড়াশুনা করাচ্ছেন। স্বামী এনামুল সরদার ‘স’ মিলে কাজ করেন। ফলে দুজনের উপার্জনে সংসারে স্বচ্ছলতা ফিরেছে রনসিঙ্গার গ্রামের এ দম্পত্তির।

নওগাঁর রানীনগর উপজেলার সদরের এ গ্রাম রনসিঙ্গার। এ গ্রামের বাজারে সাবেক সেনা সদস্য এমদাদুল হক গড়ে তুলেছেন রুবিবালার কারখানা। কারখানাটির নাম রেখেছেন ‘এমদাদ বালা ঘর’। এ গ্রামটি এখন কারিগরপাড়া গ্রাম নামে পরিচিতি পেয়েছে। এ গ্রামের প্রায় ১৫০ জন নারী রুলিবালার কাজ করেন। সকাল ৮ টা থেকে বিকেল ৫ টা পর্যন্ত কাজ করে বহু নারীর সংসারে স্বচ্ছলতা নিয়ে এসেছেন দরিদ্র পরিবারের এসব গৃহবধুরা। এছাড়া উপজেলার খট্টেশ্বর, পশ্চিম বালুভরা, রানীনগর বাজারসহ বিভিন্ন গ্রামে আরো প্রায় শতাধিক নারীরা কাজ করে থাকেন।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, স্বর্নের পরিবর্তে ব্রঞ্জ দিয়ে তৈরি হয় রুলিবালা। ব্রঞ্জের রং এবং সোনার রং প্রায় সমান। স্বর্ণের দাম বেশি হওয়ায় সবার পক্ষে অলংকারের স্বাদ গ্রহণ করাও সম্ভব হয়না। রুলিবালাতে কারুকার্য তৈরি করে সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলা হয়। ফলে পছন্দের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে ক্রেতাদের। আর এ কাজ এলাকার বেকার নারীদের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলায় এসব রুলিবালা এখন সরবরাহ করা হচ্ছে।

উপজেলার খট্রেশ্বর রানীনগর গ্রামের এক প্রতিবন্ধীর স্বামীর স্ত্রী তহমিনা আক্তার জানান, হত দরিদ্র পরিবারে আমার বিয়ে হয়েছে। স্বামী ঠিকমতো কাজ কর্ম করতে পারে না। পাশ্ববর্তীরা যখন এই রুলিবালায় নকশা তৈরির কাজ করতো আমি দেখে দেখে এই কাজ শিখেছি। প্রতিদিন ৬/৭ জোড়া বালায় নকশা তৈরী করে দিতে পারি। এই কাজ করে যে পরিমান মজুরী পাই সেটা দিয়ে সংসারের অভাব অনটন অনেকটা দুর হয়েছে।

রনসিঙ্গার গ্রামের গৃহবধু রোজিনা আক্তার জানান, আমাদের গ্রামের অনেকেই রুলিবালায় নকশা করতে দেখে শখের বসে এই কাজ শুরু করি। সাংসারিক সকল কাজ কর্ম শেষ করে অবসর সময়ে এই কাজ করি। যে পরিমান টাকা মজুরী পাই সেটা বাড়তী আয় বলে মনে করি। প্রতি মাসে এ কাজ থেকে প্রায় ৪ হাজার টাকা আয় হয়।

একই গ্রামের গৃহবধু হাসনা হেনা বলেন, রুলিবালার উপর নকশা করতে গ্রামেই ২০ দিনের একটা প্রশিক্ষণ নিই। গত চার বছর ধরে এ কাজ করছি। এখানকার প্রতিটি বাড়িতে রুলিবালা তৈরি করা হয়। আগে গল্প করে এ গ্রামের নারীরা সময় পার করলেও এখন সবাই রুলিবালা তৈরীতে ব্যস্ত। প্রতিদিন প্রায় ১৫০-২০০ টাকা পারিশ্রমিক পান এ কাজ করে। প্রতি মাসে গড়ে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় হওয়ায় তার সংসারেও ফিরে এসেছে স্বচ্ছলতা।

রানীনগর উপজেলার রুলিবালা কারখানার মালিক এমদাদুল হক বলেন, ২৩ বছর সেনাবাহিনীতে চাকুরির পর ২০১৩ সালে অবসর গ্রহন করেন। এরপর নাটোর, সৈয়দপুর ও পাবর্তীপুর সহ বেশ কয়েকটি জেলায় প্রায় ছয় মাস রুলিবালা তৈরির উপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ২০১৪ সালে স্ত্রী রুমাকে রুলিবালার কাজ শেখান। এরপর বাড়িতে ১০ জন নারী শ্রমিক দিয়ে কারখানায় কাজ শুরু করেন। স্বর্নের পরিবর্তে ইমেনটেশানের এই গহনার দাম সাধ্যের মধ্যে হওয়ায় সবার কাছেই পছন্দ হওয়ায় অতি সহজেই বাজারজাত করা যায়।

তিনি আরো বলেন, বর্তমানে এ উপজেলায় প্রায় ৩ থেকে ৪’শ জন নারী কারিগর রুলিবালার নকশা তৈরীর সাথে সম্পৃক্ত। তার কারখানায় কাজ করে ১৮৫ জন নারী শ্রমিক। দক্ষ নারী শ্রমিকদের ৮ থেকে ৯ হাজার টাকা বেতন দেয়া হয়। এছাড়া প্রতি জোড়া ভেদে ৭০ থেকে ৮০ টাকা করেও মজুরি দেয়া হয়। রুলিবালা বাজারে বিক্রি হয় রং ছাড়া ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা এবং রংসহ বিক্রি হয় ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা জোড়া। এসব রুলিবালা ঢাকার তাঁতিবাজার, সিলেট, বগুড়া, নাটোর ও নওগাঁসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করা হয়। এখানে তৈরী রুলিবালা মোবাইল ফোনে অর্ডার দিয়ে কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে ডেলিভারী নিয়ে থাকেন।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ