প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এতো মানুষ কেনো এমপি হতে চায়?

চিররঞ্জন সরকার : নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর বড় রাজনৈতিক দলগুলোতে মনোনয়ন ফরম বিক্রির হিরিক পড়েছে। মনে হয়, সবাই যেনো এমপি হতে চান। কেউ আর কর্মী থাকতে চান না। আগামী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে সবাই ছুটছেন। কোনো রাজনৈতিক অতীত নেই, এলাকায় জনসম্পৃক্ততা নেই, নেই কোনো জনপ্রিয়তা এমন ব্যক্তিরাও এমপি হতে চান। বাবা সেই কোন আমলে এমপি ছিলেন তার নাম ভাঙিয়ে সন্তানরা এমপি হতে চান। মাঠের রাজনীতিতে তার ভূমিকা থাক না থাক, তাতে কিছু আসে যায় না। তারা এখন আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জাতীয় পার্টির মনোনয়ন চাইছেন।

এইসব এমপি পদ প্রত্যাশীরা কেন্দ্র থেকে তৃণমূল দলের নেতাদের দুয়ারে যতো না ছুটছেন তার চেয়ে বেশি যাচ্ছেন গণমাধ্যম কর্মীদের কাছে। জাতীয়, স্থানীয় দৈনিকে হামেশাই তাদের প্রার্থী হিসেবে নাম লেখাচ্ছেন, ছবি ছাপাচ্ছেন। আবার অনেকে এমপি হতে অসুস্থ প্রতিযোগিতায় নেমেছেন। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে গিয়ে দলের বিরুদ্ধে দুর্নাম ছড়াচ্ছেন, নিজ দলের নেতাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা তথ্য দিয়ে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।

সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন, ছাত্রজীবনে রাজনৈতিক দলের আদর্শের প্রতি কমিটমেন্টও ছিলো না, তারাও নেমেছেন এমপি হওয়ার মিছিলে। ব্যবসায়ী হিসাবে অর্থবিত্ত গড়েছেন, জীবনে একবার এমপি হতে চান। রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা না থাক , বিশ্বাস করেন অর্থের জোরে কি না হয়! খরচপাতি যেখানে যা লাগছে তা ব্যয় করতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ আবার প্রভাবশালী ব্যক্তি-গোষ্ঠীর ছায়ায় থেকে অতীতে বা বর্তমানে ব্যবসা, বাণিজ্য, ঠিকাদারি ভালোই করেছেন। টাকা অনেক হয়ে গেছে, টাকার জোরে দলের বিভিন্ন পদ-পদবি অর্জনও করেছেন। এখন এমপি হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে ছুটছেন।

কিন্তু এর কারণ কী? কেনো সবাই নেতা হতে চায়? কেনো আর কর্মী থাকতে চায় না কেউ? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে হলে একটু গভীরে তো নামতেই হবে। নেতা পদবিটি বড়ই আকর্ষণীয়, বড়ই ফলদায়ক। এ বিশেষণটি যদি একবার লাগানো যায় তাহলে জীবনে উন্নতির সিঁড়ি খুঁজে পেতে যেমন সমস্যা হয় না, তেমনি সে সিঁড়ির সোপানগুলো টপাটপ টপকে উচ্চতর আসনটি বাগানো সহজ হয়ে যায়।

একটা সময় ছিলো, এই আমাদেরই দেশে, নেতা মানেই অতি সম্মানীয়জন। যিনি একবার নেতা হিসেবে পরিচিত হতেন, সমাজে তিনি সম্মানের আসনটি পেয়ে যেতেন। নিজের দল কিংবা ভিন্ন দল সবাই নেতাকে সম্মান করতো। এখন সে অবস্থা নেই। ভিন্ন দলের নেতাকে সম্মান তো দূরের কথা, একই দলের নেতারাও একে অপরকে সম্মান করেন না। বরং কে কাকে ল্যাং মেরে উপরে উঠবেন সে কসরতে লিপ্ত সবাই। আর কার চেয়ে কে বড় নেতা, এটা জাহির করতে এমন কোনো হীন কাজ নেই যা তারা করতে পারেন না।

রাজনীতি ছিল এক সময় দেশ ও মানুষের সেবা করার সবচেয়ে উত্তম পন্থা। যারা রাজনীতির খাতায় নাম লেখাতেন তারা আত্মস্বার্থ কখনো বিবেচনায় রাখতেন না। দেশ-জাতি, মানুষের কল্যাণই ছিল তাদের মূল উদ্দেশ্য। তারা জাতির কল্যাণ সাধনায় ব্রতী হয়ে নিজেদের দিকে তাকানোর সময় পেতেন না। জনগণের স্বার্থকে সর্বোচ্চে তুলে ধরে সত্য ও ন্যায়ের পথে আগুয়ান হতেন সব ধরনের ভয়-ভীতি, লোভ-লালসাকে উপেক্ষা করে। আর এখন? দুই-একজন ব্যতিক্রম বাদে সবাই ছুটছেন নিজের স্বার্থসিদ্ধির ধান্দায়। এখন এমপি বা নেতা মানেই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হওয়ার কাহিনি!

নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার, সত্যি কথা। কিন্তু তাই বলে এমন ঝাঁকে ঝাঁকে, পালে পালে লোক এমপি হওয়ার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হবে? হিরা আর চিড়া এক দরে বিকোবে? এমপি হওয়ার জন্য টাকা ছাড়া আর কোনো যোগ্যতাই ‘যোগ্যতা’ বলে বিবেচিত হবে না?

ক্ষুদ্র পরিসরে পরোক্ষ রাজনীতির কোনও সুফল নেই, এমন কথাও বলছি না। হাজার হোক, রাজনীতির সাহায্যেই তো অশুভ শক্তিকে ঠেকানো যায়, অন্তত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার সেটাই শিক্ষা। কিন্তু অত্যধিক নেতার সমস্যাও কিন্তু রাজনীতিতে বিস্তর। রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের জন্য গুণসম্পন্ন নেতা চাই। গুণহীন টাকাসর্বস্ব পালে পালে নেতা চাই না।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত