প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএনপি কি নিজের নাক কাটবে?

বিভুরঞ্জন সরকার : গত ১৪ নভেম্বর নয়াপল্টনে পুলিশের গাড়িতে আগুন দেয়ার ঘটনাটি সব মহল থেকেই নিন্দিত হচ্ছে। আনন্দঘন পরিবেশে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আগ্রহ নিয়ে সারা দেশের মানুষ যখন অপেক্ষা করছে, তখন নয়াপল্টনের আগুন সবার মনেই শঙ্কা ও সংশয়ের জন্ম দিয়েছে। এটা নির্বাচন বানচালের ষড়যন্ত্রের অংশ কিনা সে প্রশ্নও অনেকেই তুলছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও তেমন সন্দেহ প্রকাশ করে বলেছেন, ‘বিএনপি-জামায়াত ২০১৪ সালে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করে সফল হতে পারেনি। এবারও তারা সফল হতে পারবে না। কারণ, জনগণ আমাদের ( আওয়ামী লীগের) সঙ্গে আছেন। দেশের জনগণ নির্বাচন চায়, তারা উৎসবমুখর পরিবেশে ভোট দিয়ে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচিত করতে চায়।’

প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতির বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশের সুযোগ নেই। দেশের মানুষ শান্তিপূর্ণ পরিবেশে ভোট দিতে চায়। পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে চায়। যারা নিজেদের জনপ্রিয় মনে করেন তাদের উচিত ভোটে দাঁড়িয়ে জনগণের মুখোমুখি হয়ে জনপ্রিয়তার পরীক্ষা দেয়া। বিএনপি একদিকে নিজেদের নির্বাচনের দল বলে দাবি করে, আবার অন্যদিকে নির্বাচন এলে তাতে অংশ নিতে টালবাহানা করে।

২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেয়া থেকে বিএনপি শুধু বিরত ছিলো তা নয়, নির্বাচন যাতে অনুষ্ঠিত হতে না পারে তার জন্য চরম হিংসাত্মক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িয়েছিলো দলটি। মানুষ পুড়িয়ে মারা, নির্বাচন কর্মকর্তাকে হত্যা করা, নির্বাচন কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত শত শত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুড়িয়ে দেওয়ার মতো ঘৃণ্য অপরাধ সংঘটের মাধ্যমে বিএনপি দেশের নির্বাচনী রাজনীতিকেই কলুষিত ও কলঙ্কিত করেছে। বিএনপি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দাবি করে, আর ভোটারদের ভোট প্রদানের অধিকার খর্ব করতে বলপ্রয়োগের নীতি গ্রহণ করে। ২০১৪ সালের মহাভুল থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বিএনপির যেখানে সব ওজর-আপত্তিসহই নির্বাচনী ট্রেনে ওঠা জরুরি, তখন বিএনপি ব্যস্ত আছে ‘যদি, কিন্ত, তবে’-নিয়ে।

বিএনপি নির্বাচনে যেতে চায় নিজেদের সুবিধামতো অবস্থা ও শর্তে। তারা ভুলে যায় যে, ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগও একটি পক্ষ এবং রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে প্রবল শক্তিধর পক্ষ। বিএনপির শর্তে নির্বাচন আওয়ামী লীগ করবে না। আওয়ামী লীগকে বাধ্য করার কোনো উপায় বা কৌশলও বিএনপির আয়ত্তে নেই। সন্ত্রাস-সহিংসতার মাধ্যমে রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করা যায় না। যতো সেটা হতো তাহলে সন্ত্রাসী সংগঠনগুলো রাষ্ট্রক্ষমতা কব্জা করে ফেলতো বহু আগেই। বন্দুকের দল তখনই কেবল ক্ষমতার উৎস হতে পারে, যখন তার পেছনে জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন থাকে।

জামায়াতের মতো একটি সন্ত্রাসী সংগঠনের পেটে ঢুকে বিএনপির যে চরিত্র বদল হয়েছে, বিএনপি যে মুক্তিযুদ্ধের ধারার বিপরীতে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, তথাকথিত সমন্বয়ের রাজনীতির নামে বিএনপি যে পাকিস্তানিদের সহযোগী দলে পরিণত হয়েছে, এটা এখন দেশের অনেকেই বোঝেন। বিএনপির রাজনীতিতে পরিচিতির সংকট বা আইডেনটিটি ক্রাইসিস প্রবল হয়ে উঠেছে। বিএনপির রাজনীতিতে এখন নীতিগত বা আদর্শিক অবস্থান খুবই দুর্বল। এতোদিন বিএনপি রাজনীতির একটি বড় ভিত্তি কিংবা উপাদান ছিলো ‘ভারতবিরোধিতা’। আওয়ামী লীগকে তারা ভারতের অনুগত দল হিসেবে প্রচার করে সস্তা বাহবা পেতে চায়। আমাদের দেশে জনসাধারণের একাংশের মধ্যেও ভারতবিরোধিতার ব্যাধি সংক্রমিত আছে।

এবার দেখা যাচ্ছে ভারতবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত বিএনপি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য দিল্লির দরবারে গিয়ে ধরনা দিচ্ছে। দিল্লির মন পাওয়ার কোশেশ করছে।

গত নির্বাচনের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে হোক, বা অন্য যেকোনো কারণেই হোক এবার বিএনপির নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সিদ্ধান্ত সব মহলে প্রশংসিত হয়েছে। নির্বাচনটি অংশগ্রহণমূলক হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিন্তু বিএনপির মধ্যে নানা ধরনের গোষ্ঠী বা চক্র সক্রিয় আছে। বিএনপি গণতান্ত্রিক রাজনীতির ধারায় ফিরে আসুক, নির্বাচনের মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা বদলের ধারায় বিএনপি দৃঢ় অবস্থান নিক এটাই হলো জনপ্রত্যাশা। কিন্তু বিএনপির দোলাচল চিত্তবৃত্তি দেশের রাজনীতিকেই সংকটের মধ্যে ফেলছে।

বিএনপি মনে করে তারাই বাংলাদেশে সবচেয়ে জনপ্রিয় দল। হতে পারে তাদের ধারণাই সত্য। তাহলে কেন ভোটের জন্য সাধারণ ভোটারদের কাছে না গিয়ে তারা একেক সময় একেকটি অপপ্রচারকে ‘প্রমোট’ করছে? কোনো জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল কখনও নির্বাচনী কারচুপিরকে খুব বড় করে দেখে না। আমাদের মতো ভঙুর গণতন্ত্রের দেশে শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন আশা করা যথার্থ নয়। তবে মানুষের মধ্যে জাগরণ তৈরি হলে, মানুষ ‘আমার ভোট আমি দেবো, যাকে খুশি তাকে দেবো’ প্রত্যয়ী বলীয়ান হলে কারো পক্ষেই সহজে ভোট জালিয়াতি করা সম্ভব হবে না। বিএনপিকে মানুষের কাছে যেতে হবে। অসত্য কিংবা বিকৃত তথ্য সম্বলিত গুজবভিত্তিক প্রচারণার ওপর নির্ভরতাও কমাতে হবে। নির্বাচন বানচাল হতে পারে এমন কোনো ঘটনার সঙ্গে বিএনপির সংশ্লিষ্টতা দলটিকে রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া করে দেবে।

নয়াপল্টনের ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করেছে পুলিশ। তাদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়েছে। এখন বিএনপি শাক দিয়ে মাছ ঢাকার চেষ্টা করবে কিন্তু ফল হবে উল্টো। সরকারের হাত অনেক লম্বা এটা মেনে নিয়েই বিএনপিকে অগ্রসর হতে হবে। পরের যাত্রা ভঙ্গের জন্য বিএনপি নিজের নাক কাটবে না বলেই দেশের মানুষ আশা করে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ