Skip to main content

‘আমি কোন কূল হতে কোন কূলে যাবো...’

অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে তারা কূল খুঁজে পাচ্ছেন না। কোন কূলে তরী ভেড়ালে একটু ঠাঁই পাওয়া যাবে, তা যেন ঠাহর করতে পারছেন না। আর তাই একবার এদিকে, আরেকবার ওদিকে ছোটাছুটি করে শরীর ঘর্মাক্ত করে ফেলছেন। কিন্তু কোথাও আশার আলো দেখতে পাচ্ছেন না। গত ১৩ নভেম্বর যখন খবরটি চাউড় হলো যে, বিকল্প ধারার মহাসচিব মেজর আবদুল মান্নান (অব.) ও যুগ্ম-মহাসচিব মাহী চৌধুরী আওয়ামী লীগের ধানমন্ডি কার্যালয়ে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেছেন, তখন থেকেই বাতাসে ভেসে বেড়াচ্ছে নানা গুঞ্জন। তারা মহাজোটে অন্তর্ভূক্ত হয়ে নির্বাচন করার খায়েশ ব্যক্ত করেছেন বলে জানা গেছে। তবে, আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাদেরকে তেমন কোনো আশ্বাস দেওয়া হয়নি। বলা হয়েছে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে চলছে সমালোচনার ঝড়। নানাজন নানা মন্তব্য করছেন। বি. চৌধুরী-মাহী চৌধুরীর এই রাজনৈতিক রঙ বদলকে অনেকেই মেনে নিতে পারছেন না। তারা আলোচিত-সমালোচিত এই পিতা-পুত্রের সাম্প্রতিক কর্মকা-কে তীব্র ভাষায় সমালোচনা করছেন। কেউ কেউ তাদের নীতি-নৈতিকতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী দেশের একজন বিশিষ্ট নাগরিক, পরিচিত রাজনীতিক। শীর্ষস্থানীয়ও বলা যায়। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের বদান্যতায় তার রাজনৈতিক অঙ্গনে পদচারণা শুরু। জিয়াউর রহমান প্রথমে তাকে উপদেষ্টা এবং বিএনপি প্রতিষ্ঠা করলে তার মহাসচিব করেন। জিয়াউর রহমানের কেবিনেটে তিনি উপ-প্রধানমন্ত্রীও ছিলেন। ১৯৮১ সালের ৩০ মে জিয়াউর রহমানের শাহাদৎ বরণের পর মহাসচিব হিসেবে বি. চৌধুরী দলের জন্য কাঙ্খিত ভূমিকা পালন করেননি। এরপর সেনাপতি এরশাদ রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর বিএনপি সম্মুখীন হয় কঠিন পরিস্থিতির। সে সময় বি. চৌধুরী দলীয় কর্মকা- থেকে নিজেকে অনেকটা গুটিয়ে নেন। দলের চরম দুর্দিনে তিনি কোনো কারণ ছাড়াই মহাসচিব পদ থেকে সরে যান। ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর তাকে শিক্ষামন্ত্রী ও জাতীয় সংসদের উপনেতা করা হয়। কিন্তু তাকে রাষ্ট্রপতি না করায় তিনি শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। তবে, সংসদ উপনেতা পদে থেকে যান। ২০০১ সালে পুনরায় বিএনপি সরকার গঠনের পর তিনি রাষ্ট্রপতি পদের জন্য উঠেপড়ে লাগেন এবং একপর্যাযে সফল হন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি হওয়ার সাত মাসের মাথায় সরকার ও দলের বিরাগভাজন হয়ে বঙ্গভবন ত্যাগ করতে বাধ্য হন। এরপর তিনি ২০০৪ সালে বিকল্প ধারা গঠন করেন। তার ছেলে মাহী চৌধুরী বিএনপি থেকে পদত্যাগ করে বিকল্প ধারায় যোগ দেয়। পরবর্তীতে ২০০৬ সালের ২৬ অক্টোবর বি. চৌধুরী বিএনপিতে আরেক সংক্ষুব্ধ নেতা কর্নেল অলি আহমেদ (অব.)কে নিয়ে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি-এলডিপি গঠন করেন। কিন্তু মাত্র ছয় মাসের মাথায় সে দল ভেঙে যায়। বি. চৌধুরী তার বিকল্প ধারাকে পুনর্জীবিত করেন, আর কর্নেল অলি তার সমর্থকদের নিয়ে এলডিপির সাইনবোর্ড দখলে রেখে অন্যদিকে হাঁটতে শুরু করেন। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির বাতিল হয়ে যাওয়া নির্বাচনের প্রাক্কালে বি. চৌধুরী নৌকায় চড়ার জন্য যারপর নাই চেষ্টা করলেও সফলকাম হতে পারেন নি। ফলে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বিকল্প ধারা এককভাবে নির্বাচন করে। ওই নির্বাচনে বি. চৌধুরী মুন্সিগঞ্জ-১ ও ২ এবং ঢাকার একটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। তিনটির দু’টিতেই তার জামানত বাজেয়াপ্ত হয়, তার নিজস্ব আসনে অল্পের জন্য জামানত রক্ষা পায়। এরপর বি. চৌধুরী তার রাজনৈতিক কেবলা পরিবর্তনের চেষ্টায় ব্রতী হন। বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করেন। বিএনপির অভ্যন্তরে তার গুটিকয় শুভানধ্যায়ীর সহায়তায় কিছুটা এগিয়েও যান। জিয়ার শাহাদতবার্ষিকীর আলোচনাসভায় প্রধান অতিথি হওয়ারও সুযোগ পান। এরপর যুক্তফ্রন্ট গঠন, বিএনপি নেতাদের তার বাসায় গিয়ে ক্ষমা প্রর্থনা, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন নিয়ে তার পূত্র মাহী চৌধুরীর অতি খবরদারি, ইত্যাদি অতি সাম্প্রতিক ঘটনা, যা সবাই জ্ঞাত আছেন। কিন্তু তাকে বাদ দিয়ে যখন ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়, তখনই তিনি তার স্বমূর্তিতে আত্মপ্রকাশ করেন। ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলার চেষ্টায় মনোনিবেশ করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সংলাপে গিয়ে তিনি সরকারের অধীনে নির্বাচনে যাওয়ার কথা ঘেষণা করেন। আর গত মঙ্গলবার মেজর মান্নান ও মাহীর ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার মধ্য দিয়ে তাদের বর্তমান অবস্থা ও অবস্থানের একটি চিত্র ফুটে উঠেছে। রাজনৈতিক সচেতন মহলের মতে বিকল্প ধারা বা বি. চৌধুরী বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনীতিতে কোনো ফ্যাক্টর নয়। তারা অনেক আগেই অপাংক্তেয় হয়ে গেছেন। বারবার পক্ষ পরিবর্তন করে তারা এটা প্রমাণ করে দিয়েছেন যে, রাজনৈতিক আদর্শ বলে তাদের কিছু নেই। তারা নিজেদের স্বার্থে যে কোনো সময় গিরগিটির মতো রঙ বদলে ফেলতে পারেন। এমন চরিত্রের মানুষদের আওয়ামী লীগ কতটা বিশ্বাস করবে তা নিয়ে অনেকেরই সংশয় আছে। আওয়ামী লগি নেতৃত্ব নিশ্চয়ই এটা মাথায় রাখবেন যে, স্বাথের্র অনুকূল না হলে এরা যে কোনো মুহূর্তে চোখ উল্টে ফেলতে পারে । অনেকের মতে বি. চৌধুরী এখন অনেকটা দিশেহারা। তিনি ঠিক করতে পারছেন না, কোথায় যাবেন, কী করবেন। তার বোধকরি সময় হয়েছে প্রখ্যাত শিল্পী আব্বাসউদ্দিনের সেই গানটি গাওয়ার- ‘নদীর কূল নাই কিনার নাইরে, আমি কোন কূল হতে কোন কূলে যাব কাহারে শুধাই রে....।’ লেখক: সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক।

অন্যান্য সংবাদ