Skip to main content

সাঁওতালদের জীবনযাপন

শাহিন আখতার : ‘ওগো সাঁওতালি ছেলে, শ্যামল সঘন নববরষার কিশোর দূত কি এলে/ধানের ক্ষেতের পারে শালের ছায়ার ধারে/বাঁশির সুরেতে সুদূর দূরেতে চলেছ হৃদয় মেলে’। রবীন্দ্রনাথের এই গানে চমৎকারভাবে ফুটে উঠেছে সাঁওতালদের প্রকৃত রূপ। সাঁওতালদের বেশিরভাগই দিনাজপুর, রাজশাহী অঞ্চলে বাস করলেও বগুড়া, রংপুর ও সিলেটে কিছু কিছু সাঁওতালের দেখতে মেলে। নৃবিজ্ঞানীদের মতে, এদের মূল নিবাস অস্ট্রেলিয়া। বাংলাদেশের আদিবাসী এই সাঁওতালরাই। তবুও এরা অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর তুলনায় অনেক পিছিয়ে আছে। বর্তমানে এদের জীবনমানের উন্নয়নে বেশ কিছু এনজিও কাজ করছে। এদের মধ্যে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করছে ‘কারিতাস’। এছাড়াও গ্রামবিকাশ, পল্লীশ্রীরও কিছু ভূমিকা রয়েছে। এসব এনজিও তাদের প্রতিষ্ঠানে সাঁওতালদের কর্মসংস্থানেরও ব্যবস্থা করেছে; যার ফলে তাদের মধ্যে শিক্ষার হার  কিছুটা বেড়েছে এবং তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ ফেসবুক ও ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। সভ্যতার ইতিহাসে কৃষিকাজের সূচনা হয়েছিলো নারীদের দ্বারা। পরবর্তী সময়ে নারীরা কৃষিকাজ থেকে দূরে সরে গিয়ে গৃহমুখী হলেও সাঁওতাল নারীরা এখনো সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। এখনো পুরুষের সাথে তাল মিলিয়ে বেশিরভাগ নারীই মাঠে গিয়ে কৃষিকাজ করে। অনেক সময় যেসব নারীর ছোট বাচ্চা আছে, তারা গারোদের মতো বাচ্চাকে পিঠে কাপড়ে ঝুলিয়ে কৃষিকাজ করে। অবশ্য এখনো কেউ কেউ তাদের আরেকটি ঐতিহ্যবাহী পেশা বাঁশ, শাল ও বেত দিয়ে মাদল, ছাতা, কুলা ডালা প্রভৃতি তৈরি করে। বর্তমানে কেউ কেউ গার্মেন্টসমুখীও হয়েছে। সাঁওতালরা ফুল পছন্দ করে। তাদের বাড়ির বেশির ভাগ উঠোনেই সন্ধ্যামালতি, গাঁদা, নয়নতারা ফুল দেখতে পাওয়া যায়। বর্তমানে কিছু কিছু বাড়ি দালানের হলেও বেশির ভাগ বাড়িই মাটির। এসব মাটির ঘরের দেয়ালেও থাকে ফুলের নকশা। সাঁওতালরা সনাতনধর্মাবলম্বী হলেও বর্তমানে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ উন্নত জীবনের আশায় খ্রিস্টানধর্মে দীক্ষিত হয়েছে এবং হচ্ছে। এরা পুরোপুরি সনাতন ধর্মের নিয়ম অনুয়ায়ী পুজো করে না বরং আনন্দ ও খাওয়া-দাওয়ার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা সারে। সাঁওতালদের জাতীয় দেবতা আছে। নাম মারাং বুরু। আগে মারাং বুরু পুজোয় নরবলি দেয়া হলেও বর্তমানে লাল রঙের ফুল- ফল দিয়ে পুজো করা হয়। অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর মতো সাঁওতালদের মধ্যেও সাতটি গোত্র আছে। এসব গোত্র হচ্ছে, হাঁসদাক, মুরমু, কিসকু, হসবরোন, মারুদি, সোরেন ও টুডু। সাঁওতালরা বিশ্বাস করে, তাদের আদিমানব পিলচু হড়ম ও আদিমানবী পিলচু বুড়ির সাতজোড়া সন্তান থেকে এসব গোত্রের উদ্ভব হয়েছে। সাঁওতালদের মধ্যে আসলি বিবাহ, রাজারাজি বিবাহ, হুরকাটারা এই তিন বিবাহপদ্ধতি জনপ্রিয়। হুর কাঠারা বিয়েতে কোনো যুবক যদি কোনো যুবতীকে জোর করে বা যে কোনো উপায়ে সিঁদুর পরিয়ে দেয়, তাহলে ঐ যুবতীর অন্য কোথাও বিয়ে হয় না। রাজারাজি বিয়েতে যুবক-যুবতীর পছন্দমতো অভিভাবকেরা বিয়ের আয়োজন করে। আর আসলি বিয়েতে অভিভাবকদের আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে বিয়ে ঠিক হয়। সাধারণত বিয়ে ঠিক করার জন্য পাত্রপক্ষের লোকজন পাত্রীর বাড়িতে যায় এবং বিয়ের দিন-তারিখ ঠিক করে। বিয়ের আগের দিন গায়ে হলুদের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। এই গায়ে হলুদের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে গানবাজনা শুরু হয় এবং বিয়ে সম্পূর্ণ না হওয়া অবধি চলে। তাদের একটি জনপ্রিয় দং বা গান হচ্ছে ‘ছাম লাতার ছামডা লাতা, একেন লে বলোই না দিদিমণি’। মানে আমরা শামিয়ানার নিচে এসেছি, আমরা এখন দিদিমণি। এমন বেশ কিছু গানে নারীরা একসাথে সুর করে একে অপরের কোমরে হাত দিয়ে নাচ করে। সেসময় পুরুষেরা পচানো ভাতের সাহায্যে বা তালগাছের রসের তৈরি চোয়ানি বা মদ খেয়ে মাতাল হয়ে ঢোল ও মাদল বাজায়। বিয়ের দিন পাত্রপক্ষ আসার আগেই তাদের কয়েকজন কনের বাড়িতে গিয়ে খাবারের তদারকি করে। খাবারের মূল আর্কষণ শুয়োরের মাংস। বিয়ের দিন পাত্র ধুতি-পাঞ্জাবি পরে আর কনে পরে মার্কিন সুতিকাপড়ে কাঁচা হলুদ বেটে লাগানো শাড়ি এবং বিশেষ ধরনের খোঁপা করে কাঁটা ব্যবহার করে। বিয়ের সময় পাত্রীকে বড় ডালিতে করে পাত্রের ভাই ঘর থেকে বের করে আনে এবং পাত্রকে তার দুলাভাই বা ফুপারা উপরে উঠিয়ে কনের মাথায় সিঁদুর পরিয়ে দিলেই বিয়ে সম্পন্ন হয়। কোনো মন্ত্র উচ্চারণ করতে হয় না। এরপর ছেলের বাসায় বউভাত শেষে নতুন কনেকে শ্বশুরবাড়ির সকলের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। এ-সময় নতুন বউ সবার পা ধুয়ে দেয় এবং উপহার হিসেবে হাঁস, মুরগি, ছাগল এবং ক্ষেত্রবিশেষে সোনার নাকফুলও পায়। সাঁওতালদের মধ্যে খুব কম হলেও বিবাহ বিচ্ছেদ হয়। এ ক্ষেত্রে যে তালাক দেয়, তাকে গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে আমপাতায় তেল-সিঁদুর মাখিয়ে দুভাগ করে দশজনের গায়ে ছিটিয়ে দিয়ে সামনে রাখা পানিভর্তি ঘটি ফেলে দিলেই বিয়েবিচ্ছেদ কার্যকর হয়। লেখক : কবি।

অন্যান্য সংবাদ