প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

উদ্বুদ্ধকরণ ও সেবার মনোভাব নিয়েই আয়কর মেলা

ড মোহাম্মদ আবদুল মজিদ: জাতীয়ভাবে আয়কর মেলা আয়োজনের মূল উদ্দেশ্যই হচ্ছে -কর প্রদানে মানুষকে সচেতন করা,কর বিভাগকে কর দাতাদের কাছে নিয়ে যাওয়া এবং তাদের মধ্যেকার দূরত্ব কমিয়ে আনা। সার্বিকভাবে সেবাধর্মী মনোভাব নিয়েই আয়কর মেলার আয়োজন। কর আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে মেলা করা হলে সেবা ও সচেতনতা সৃষ্টির ফোকাসটা বাণিজ্যিক পর্যায়ে চলে যায়। মনে রাখা উচিত, আয়কর মেলা কোনও বাণিজ্যিক মেলা নয়। সেবা প্রদান, প্রক্রিয়া সহজীকরণ ও জনগণের দোরগোড়ায় পৌছানোর মাধ্যমে করের আওতা বৃদ্ধি এবং কর ফাঁকি রোধ করা গেলেই দেশে কর জিডিপি অনুপাত বাড়বে। ২০০৮ সালে দেশে প্রথম জাতীয়ভাবে আয়কর দিবস উদযাপনে সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। একই সঙ্গে কর প্রদানে জনগণকে উদ্বুদ্ধকরণে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি হিসেবে নীতিমালার আওতায় সেরা করদাতা স্বীকৃতি ও পুরস্কার চালু এবং আয়কর মেলার আয়োজনের উদ্যোগ নেয়া হয়। আয়কর মেলা খুব উজ্জ্বলভাবেই আয়োজিত হচ্ছে। উদযাপন হচ্ছে। এতে তিনি তৃপ্তিবোধ করেন। এর জন্য এনবিআর সংশ্লিষ্ট সবাই অভিনন্দন যোগ্য। তবে কিছু বিষয়ে এনবিআর মূল লক্ষ্য ও ধ্যান-ধারণার কতটা কাছে আছে তা দেখা দরকার। কর মেলার মূল ধারণাটির এখন কিছুটা বিবর্তন ঘটেছে। কর মেলা আয়োজনের মূল লক্ষ্য ছিল প্রত্যন্ত অঞ্চল- যেখানে সক্ষম করদাতা রয়েছে, কিন্তু কর অফিস নেই, করদাতারা দূরে কর অফিসে আসতে স্বচ্ছন্দবোধ করে না, অথবা কর আদায়কারী যেতে পারে না সেই জায়গায় গিয়ে আয়কর মেলার আয়োজন করা। করদাতার কাছে যাবে কর বিভাগ। করমেলার উদ্দেশ্যই হচ্ছে উৎসবমুখর পরিবেশে কর সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় সব ধরনের সেবা প্রদান এবং অধিকতর করদাতা তৈরি ও অ-করদাতাকে করদাতা বানানো। এই লক্ষ্যে প্রথম থেকেই থানা ও নতুন জেলা পর্যায়ে কর মেলার আায়োজনের উদ্যোগ ছিল। সেটির এখন প্রসার হলেও বিভাগীয় ও কেন্দ্রীয়ভাবে আয়োজনের মধ্য দিয়ে কার্যক্রম কেন্দ্রীভূত হয়ে পড়েছে বলে প্রতীয়মান হয়।

ঢাকায় ও বিভাগীয় শহরে বহু কর অফিস রয়েছে। সেখানকার করদাতারা মেলা না করলেও কর প্রদান করবেন। অ-করদাতাদের সঙ্গে কর কর্মকর্তাদের যোগাযোগ রক্ষা করতে হবে। কিন্তু প্রত্যন্ত অঞ্চলে সেসব সুবিধা নেই। অর্থাৎ জেলা উপজেলা পর্যায়ে পরিকল্পিতভাবে মেলা আয়োজনের উদ্যোগ নিতে হবে। কারণ এটাই ছিল আয়কর মেলা উদযাপনের মূলপ্রেরণা। এখন সেটি অন্য রকম ঝলমলতায়, অতি আগ্রহ-অনাগ্রহের ভিড়ে ভিন্নপথগামী যাতে না হয় সজাগ থাকতে হবে ।

সেরা করদাতা নির্বাচন প্রসঙ্গে বলা যায়, এটি করা হয়েছে সৎ, নিয়মিত, নিয়মনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল করদাতার স্বীকৃতি দিতে। ট্যাক্স কার্ড নীতিমালার আলোকেই সেরা কর দাতা নির্বাচন করা উচিত। যিনি বা যে প্রতিষ্ঠান হরহামেশা কর ফাঁকি দেয়ার ফন্দি-ফিকির আটেন, মামলা করেন, কর ফাঁকির এক বা একাধিক অভিযোগ বা ঝামেলা আছে তিনি বা তার কোম্পানির কেউ সেরা করদাতা নির্বাচিত হলে সৎ, নিয়মিত, নীতিনিষ্ঠরা নিরুৎসাহিত হতে পারেন। সেরা করদাতা নির্বাচনের উদ্দেশ্য বিফলে যেতে পারে। তাই এটি নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠলে তা দেখা উচিত।

গত এক-দুই বছর যাবৎ প্রকৃত অর্থে বোঝা যাচ্ছে না করদাতা সত্যিই বাড়ছে কি-না। সার্বিকভাবে উৎসে কর ও কোম্পানির করের উপরই আয়কর নির্ভর হয়ে পড়েছে। এটি বাড়ছে। কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। দেখতে হবে করের প্রকৃত পরিধি বাড়ছে কি-না। করদাতার সংখ্যা বাড়ছে কি-না এবং সেই হারে করের পরিমাণ বাড়ছে কি-না। আবার এর সঙ্গে কর ফাঁকিও রোধ করতে সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রে কর্পোরেট করও যারা দিচ্ছেন, তারা সবাই সঠিক পরিমাণে দিচ্ছেন কি-না সেটিও দেখার বিষয় রয়েছে। কারণ প্রায় দেখা যায়, অমুক প্রতিষ্ঠান বা কোম্পানির এত কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি। এটি তো ছেলে খেলার বিষয় নয়। এখানে কর আহরণকারী প্রতিষ্ঠানের তদারকি ও দায়িত্ব পালনে সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। কারণ সেখানে কর্তৃপক্ষের মনিটরিংয়ের, প্রয়াসের, দক্ষতার, সততার দায়িত্বশীলতার ঘাটতির প্রতিই ইঙ্গিত করে। আশার কথা এনবিআর এ দুর্বলতা কাটিয়ে কঠোর ও কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে।

গত কয়েক বছরে রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় এনবিআরের বেশ কিছু সংস্কার ও জনবল ও কাঠামোয় ব্যাপক সম্প্রসারণ হয়েছে। সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। রাজস্ব আদায়ও বেড়েছে। এটি অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে ভেবে দেখতে হবে – যে হারে সংস্কার ও সম্প্রসারণ হয়েছে, সে হারে কর বা করদাতা বাড়ছে কি-না, কিংবা যারা যুক্ত হচ্ছে তারা পরবর্তিকালে থাকতে পারছে কি-না? বিদ্যমান কর ব্যবস্থায় কিছু সীমাবদ্ধতা এবং ক্ষেত্রবিশেষে কর বিভাগের অপারগ পরিস্থিতির কারণে করদাতারা যেন হয়রানির শিকার না হন সেদিকে নজরদারীও বাড়াতে হবে। করের বেজ বাড়ানোর জন্য এটি জরুরি ।
লেখক : সরকারের সাবেক সচিব । এন বি আরের সাবেক চেয়ারম্যান

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ