Skip to main content

‘…কারও পিঠের চামড়া থাকবে না’!

বিভুরঞ্জন সরকার : যারা ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনার সাথে ৩০ হাজার টাকা ব্যয় করে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপত্র কিনেছিলেন, তারা ১৪ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ‘সাক্ষাৎ’ শেষে কি তাদের উদ্দীপনা বজায় রাখতে পারছেন? একবার কোনো মতে নৌকা মার্কাটা পেয়ে গেলেই কেল্লাফতে বা বাজিমাৎ, বিজয় ঠেকায় কে ভাবতেন তারা কি এখনও তেমনই ভাবছেন, নাকি তাদের ভাবনার জগতে কিছু পরিবর্তন এসেছে? প্রধানমন্ত্রী কিন্তু আগামী নির্বাচনে কাউকে সহজ বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দেননি। প্রধানমন্ত্রী বরং বলেছেন আগামী নির্বাচন হবে খুব কঠিন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন আর বাংলাদেশে হবে না, এই কথাটা আমরা অনেকদিন থেকেই বলে আসছি। প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাও সেটা একাধিকবার বলেছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের অনেকের কানেই পানি ঢোকেনি। তারা দুটি বিষয় নিশ্চিত ধরে নিয়েছিলেন : এক. বিএনপি যে চিপার মধ্যে আছে তাতে এবারও তারা নির্বাচনে আসবে না। দুই. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতে বিপদতাড়িনী মহাধন্বন্তরি বটিকা আছে, কাজেই শেষ পর্যন্ত তিনিই করবেন তরী পার। কিন্তু রাজনীতি কোনো সময় রেল লাইনের মতো সোজা পথে চলে না। কখন কার মাথায় কোন হিসেব কাজ করে তা-ও বোঝা যায় না। যেসব কারণে বিএনপি গত নির্বাচনে অংশ নেয়নি, সেইসব কারণ শুধু অবিকল বলবত থাকা নয়, নতুন আরো মারাত্মক কারণ যুক্ত হওয়ার পরও (দুর্নীতি মামলায় খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের সাজা, খালেদা জিয়ার কারাবাস) বিএনপি এবার নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং এটা এখন পরিষ্কার যে আওয়ামী লীগকে নাকানি-চুবানি খাওয়ানোর মতো ক্ষমতা বিএনপি হারিয়ে ফেলেনি। আওয়ামী লীগকে টেক্কা দেওয়ার অবস্থা বিএনপির আছে। সরকারবিরোধী অনেকের সমর্থনও বিএনপি পাচ্ছে এবং পাবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক কৌশলের কাছে তার প্রতিপক্ষ শিশু-এটা প্রমাণিত হয়েছে একাধিকবার। শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা আওয়ামী লীগের দলগত জনপ্রিয়তার চেয়ে অনেক বেশি। তারপরও এটা ঠিক যে, তার একক চেষ্টায় বারবার সংকট উত্তরণ সহজ নয়। আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন প্রত্যাশী চার সহস্রাধিক ব্যক্তিকে গণভবনে সাক্ষাৎ দিয়ে শেখ হাসিনা স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘আগের মতো নির্বাচনে সবার দায়িত্ব নিতে পারবো না। এবার নেত্রীকে বেটে খাওয়ালেও কাজ হবে না। গত দুই নির্বাচনে এনেছি, এবারও আমিই ক্ষমতায় আনবো, এটা মনে করে কোনো লাভ নেই। প্রার্থীর নিজ নিজ যোগ্যতা, দক্ষতা, রাজনৈতিক ত্যাগ-তিতিক্ষা থাকতে হবে। জনসম্পৃক্ত হতে হবে’। আওয়ামী লীগ টানা দশ বছর ক্ষমতায় থেকে বাংলাদেশকে উন্নয়নের মহাসড়কে তুলে দিয়েছে। কেউ এটা বলতে পারবেন না যে, শেখ হাসিনার সরকার দেশের উন্নতি করেনি। সরকারের উন্নয়ন কাজের স্বীকৃতি দিয়ে একেবারে সাধারণ মানুষও বলেন যে, শেখ হাসিনা দেশকে এগিয়ে নিয়েছেন কিন্তু তার দল আওয়ামী লীগ মানুষের মন জয় করতে পারেনি। অর্থাৎ শেখ হাসিনা বিরামহীন পরিশ্রম করে দেশের জন্য, দলের জন্য যে বিরাট ‘ক্যাপিটাল’ সংগ্রহ করেছেন বা করেন তা চরম অবহেলায় অপচয় বা অপব্যয় করেন দলের একশ্রেণির অপরিণামদর্শী নেতা-কর্মী স্বেচ্ছাচারী গণবিরোধী ভূমিকা পালনের মাধ্যমে। সকল পর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা যদি মানুষকে খুশি করতে পারতো, তাহলে তারা হেসেখেলে নির্বাচনী বৈতরণী পাড়ি দিতে পারতো। অথচ এখন যথেষ্ট ঘাম ঝরিয়েও জয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব কিনা প্রশ্ন আছে। না, এসব বলার উদ্দেশ্য এটা নয় যে, আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে খারাপ করবে। বরং আওয়ামী লীগকে সতর্ক করার জন্যই বলা। আওয়ামী লীগ সংগঠন এখন অগোছালো। কিছুটা বিশৃঙ্খল। প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, ‘কোথাও কেথাও দলের মধ্যে নেতৃত্ব শূন্যতাও আছে’। সরকার সফল, দল দুর্বল এবং অসফল। এটা খারাপ। এখন দলকে সংগঠিত হয়ে নির্বাচনী লড়াইয়ে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের সমর্থন আছে, কর্মী আছে, ভোট আছে। কিন্তু কর্মীদের দৃশ্যমান হতে হবে’। ‘আওয়ামী লীগের শত্রু আওয়ামী লীগ’ এটা এখন একটি জনপ্রিয় প্রবচন হয়ে দাঁড়িয়েছে। শেখ হাসিনা আছেন, কাজেই আমাদের আর ভয় কি এমন মনোভাবও দলের জন্য ক্ষতিকর। মনোনয়ন প্রত্যাশীরা মনোনয়নবঞ্চিত হলেই নেমে পড়েন দলের বিরুদ্ধে। মার্কা পাওয়া প্রার্থীকে হারিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করা হয় যে ‘নৌকা’ উপযুক্ত ব্যক্তির হাতে দেওয়া হয়নি। এবার তাই শেখ হাসিনা আগাম সতর্কতা জারি করে বলেছেন, মনোনয়নবঞ্চিত হলেও দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে হবে। অনেক জ্যেষ্ঠ নেতাও বাদ যেতে পারেন। এতে কিছু করার নেই। এটা মেনে নিতে হবে। একটা আসন হারিয়ে দিই, অন্যগুলোতে জিতবেই, এমন করবেন না কেউ। এটা করলে দেখা যাবে ৩০০ আসনে দল হেরে যাবে। একানব্বই সালের মতো গা ভাসিয়ে দেওয়া যাবে না। মনে রাখতে হবে, দল হেরে গেলে কারও পিঠের চামড়া থাকবে না’। ভয়াবহ আশঙ্কা। জামায়াতের ঘাড়ে ভর করে বিএনপি যদি আবার ক্ষমতায় আসে তাহলে শুধু আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পিঠের চামড়া থাকবে না তা নয়, বিচারের কাঠগড়ায় উঠবে মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ। এখন ‘পিঠের চামড়া’ রক্ষার তাগিদ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীসমর্থকরা অনুভব করেন কিনা সেটাই দেখার বিষয়। লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

অন্যান্য সংবাদ