প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জনসভা রণক্ষেত্র : ‘ময়লা ধুলে কয়লা যায় না!

অসীম সাহা : ‘কয়লা ধুলে ময়লা যায় না’ বহুল প্রচলিত কথাটি কি বিএনপির জন্যে প্রযোজ্য? যদি প্রযোজ্য হয়, তা হলে ‘ময়লা ধুলে কয়লা যায় না’ কথাটি কাদের জন্যে প্রযোজ্য? সকল প্রতিকূলতা অতিক্রম করতে না পারলেও বিএনপি শুভবুদ্ধির পরিচয় দিয়ে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্ব মেনে জাতীয় যুক্তফ্রন্টকে নিয়ে নির্বাচনের যে আয়োজনে স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের জন্যে নিজেদের দলের মনোনয়নপত্র পর্যন্ত বিক্রি শুরু করে দিয়েছিলো, সেখানে হঠাৎ করে এমন কী ঘটলো যে, বিএনপি অফিসের সামনে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে এলাকাটি রণক্ষেত্রে পরিণত হলো? বিএনপির অভিযোগ, বিনা উস্কানিতে পুলিশ তাদের কর্মিদের ওপর আক্রমণ চালিয়েছে।

আর আওয়ামী লীগ ও পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বিএনপির উচ্ছৃঙ্খল কিছু লোক প্রথম পুলিশের ওপর ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যাতে বাধ্য হয়ে পুলিশকে অ্যাকশনে যেতে হয়েছে। তাতে বিএনপির কর্মিরা আরো উত্তেজিত হয়ে পুলিশের পিকআপভ্যানসহ বেশকিছু গাড়িতে আগুন দিয়েছে। পুলিশ ও বিএনপি কর্মিদের সংঘর্ষে এলাকাটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। টেলিভিশনের ফুটেজ এবং পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ ও চিত্র থেকে এটা অনেকটাই স্পষ্ট, বিএনপির সিনিয়র নেতা মির্জা আব্বাস নিজের সাব্বাসি দেখাতে শত শত লোক নিয়ে শোডাউন করার জন্য হাজির হবার পর পরই হঠাৎ শান্ত পরিবেশ বিশৃঙ্খল হয়ে ওঠে। তার আগপর্যন্ত আনন্দ-উল্লাসে মেতে বিএনপির মনোনয়ন-প্রার্থীরা মনোনয়নপত্র কিনছিলেন। তা হলে মির্জা আব্বাস আসার পরই এমনটি হলো কেন?

এ-এক প্রশ্নবোধক প্রশ্ন! মির্জা আব্বাস সকল সময়ই ঘোলাজলে মৎস্যশিকারে পটু একজন চাণ্যক্যনেতা! দেখতে চামচিকের মতো হলেও তার মনে ঈগলের শক্তি ও কুবুদ্ধি। তিনি কি তার মাস্তানদের লেলিয়ে দিয়ে এই পরিস্থিতির সৃষ্টি করে বোঝাতে চেয়েছেন, বিএনপির মধ্যে তারচেয়ে শক্তিশালী ও বোদ্ধা নেতা আর একজনও নেই? যদি তাই হয়ে থাকে, তা হলে তিনি নির্বোধের মতো কাজ করেছেন। বিএনপি যেখানে একটি সৃশঙ্খল পরিবেশে সমান্তরাল ময়দানে খেলার জন্যে প্রস্তুত হচ্ছে, সেখানে মাঝমাঠে গিয়ে হঠাৎ করে ফাউল করা কি তার জন্যে খুব বেশি দরকার ছিলো? বাহাদুরি দেখানোর স্থান কি বিএনপির অফিসের সামনের এলাকা?

জনগণের চলাচলের পথ বন্ধ করে আপনারা মানুষকে নাস্তানাবুদ করবেন, তাদের চলাচলে বিঘœ ঘটাবেন, আর পুলিশ নিশ্চল দর্শকের মতো তা বসে বসে দেখবেন, এমনটা আশা করা কি ঠিক? আপনারা যখন ক্ষমতায় ছিলেন, তখন কি এমন ঘটনা ঘটেছিলো? বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী ও সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূরকে আপনাদের পুলিশ যখন বিনা উস্কানিতে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে মাটিতে ফেলে দিয়েছিলো, তখন কি আপনারা পুলিশকে সংযত করেছিলেন? এই তিনজন তো পুলিশকে কোনো উস্কানিও দেননি। তা হলে তাদের মতো সম্মানিত মানুষদেরও পুলিশ দিয়ে আপনারা পেটালেন কেন? এখন পুলিশ অ্যাকশনে গেলে আপনাদের খারাপ লাগে, তা হলে নিজেরা যখন ক্ষমতায় থেকে সম্মানিত মানুষদের লাঞ্ছিত করেছিলেন, তখন লাগেনি কেন? আাসলে পুলিশ সরকার কর্মচারি। তারা সরকারি নির্দেশ মানতে বাধ্য। জনগণের জানমালের হেফাজত করা যদি তাদের কর্তব্য হয়ে থাকে, তা হলে বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টির চেষ্টা করলে পুলিশ অ্যাকশনে যাবে, এটা তো আপনাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা থেকেই জানার কথা। তারপর আবার আপনাদের কর্মিরা পুলিশের গাড়িতে আগুন দিলো, পুলিশের দিকে ইটপাটকেল ছুড়লো, পরিস্থিতিকে রণক্ষেত্রে পরিণত করলো, তখন পুলিশ কী করবে?

যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেয়া যায়, বিএনপির জনসমুদ্র দেখে আওয়ামী পেটোয়াবাহিনী পরিস্থিতিকে জটিল করার জন্য এই আক্রমণ চালিয়েছে, তা হলে সেক্ষেত্রে বিএনপিকর্মিরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে না জড়িয়ে যদি সংযত থেকে এর মোকাবেলা করতেন, তা হলে গোটা পরিস্থিতি কি তাদের অনকূলে যেতো না? জনগণের সমবেদনা ও সহানুভূতি নিয়ে কি বিএনপি লাভবান হতে পারতো না? কিন্তু তারা তা না করে ফের ‘আগুনসন্ত্রাসে’ লিপ্ত হওয়ায় জনগণ এটিকে যে ভালোভাবে নেয়নি, মিডিয়া ও চ্যানেলগুলোর ছবি ভাইরাল হওয়ার মধ্য দিয়ে তা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এতে লাভবান হয়েছে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলীয় জোট। তারা পুরনো দিনের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলার সুযোগ পেয়েছে, “এই দেখো ‘আগুনসন্ত্রাসী’রা দেশে জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতি শুরু করেছে।

‘কয়লা ধুলে যে ময়লা যায় না’ বিএনপি তার অনন্য প্রমাণ!” এরপর বিএনপির আর বলার কী থাকতে পারে? বিএপির সিনিয়র নেতাদের অবশ্যই ভেবে দেখতে হবে, মির্জা আব্বাসরা কি বিএনপিকে ডোবাতে, না ভাসাতে চায়? তাদের খুঁজে বের করতে হবে ‘হেলমেটবাহিনী’ কারা? যদি তাদের নিজেদের লোক হয়, তা হলে তাদের বিরত রাখা আর যদি বিপক্ষের কেউ হয়, তাদের প্রতিহত করা; আর যদি তৃতীয় পক্ষের সুযোগসন্ধানী কেউ হয়, তা হলে সকলে মিলে তাদের রুখে দেয়া সকল দলের জন্যেই জরুরি। আগামী নির্বাচনকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে সকলকেই একযোগে সতর্কভাবে কাজ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নেতিবাচক মনোভাব থেকে সরে এসে শেষপর্যন্ত ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে বসে বিএনপিকে তাদের গা থেকে কলংকের কালি মুছে ফেলার একটা সুযোগ দিয়েছিলেন। বিএনপি সে-পথেই হাঁটছিলো বলে মনে হচ্ছিলো। কিন্তু হঠাৎ সেই কালিতে আরো ঘন-কালো পোচ লাগিয়ে দিলো কে বা কারা?

সন্দেহ নেই, এটা খুঁজে বের করার দায়িত্ব সরকারেরই বেশি। কিন্তু শুধু সরকারের ওপর দায় চাপিয়ে নিজেদের দূরে সরিয়ে রাখলে নির্বাচনী-পরিস্থিতি কিছুতেই স্বাভাবিক হবে না। আর তা না হলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বিএনপিই। পরাস্ত হয়ে তারা যদি ফের জ্বালাও-পোড়াওয়ের রাজনীতি শুরু করে, তা হলে নিজেদের অস্তিত্ব বিপন্ন হওয়া থেকে কেউ তাদের রক্ষা করতে পারবে না। তখন আওয়ামী লীগও সুযোগ পেয়ে আর কয়লা ধোয়ার কাজ না করে ময়লা পরিষ্কার করতে করতে কয়লাকেই ধুয়েমুছে শেষ করার চেষ্টা করবে। আর তখন যদি বিএনপি মাথা তুলে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে, তা হলে আওয়ামী লীগ ‘কয়লা ধুলে ময়লা যায় না’ এই প্রবাদ্যবাক্যটি ইতিহাসের পাতা থেকে মুছে দিয়ে চালু করে দেবে, ‘ময়লা ধুলেও কয়লা যায় না’। তখন কিন্তু বিএনপি আর তাদের গায়ে লেপ্টে যাওয়া এই অমোচনীয় বাক্যটি কিছুতেই তাদের গা থেকে ঘষে তুলতে পারবে না! কাজটা কি তাদের জন্য আত্মঘাতী হবে না?

লেখক : কবি ও সংযুক্ত সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ