প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বরগুনা-১: শক্ত ঘাঁটিতে দ্বন্দ্বে আ’লীগ ঘুরে দাঁড়াতে চায় বিএনপি

যুগান্তর :  দক্ষিণের অবহেলিত বরগুনা জেলা সদর, আমতলী ও তালতলী উপজেলা নিয়ে বরগুনা-১ আসনে শুরু হয়েছে নির্বাচনী ঝড়। এটি দেশের একমাত্র আসন যেখানে এবার আ’লীগ থেকে ৫২ জন মনোনয়নপ্রত্যাশী ফরম জমা দিয়ে রেকর্ড করেছেন।

 

এটি আ’লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। ৩ লাখ ৯২ হাজার ৫৮২ ভোটারের এ আসনে গত ১০টি সংসদ নির্বাচনের মধ্যে ৫টিতেই জয় পেয়েছে নৌকা। আরও একটিতে জিতেছে আ’লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। এর মধ্যে চারবারই জিতেছেন জেলা আ’লীগের সভাপতি ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু। ২টি পৌরসভা এবং ২৪টি ইউনিয়ন নিয়ে বরগুনা-১ আসনে জাতীয় পার্টি ২ এবং বিএনপি একবার জয়লাভ করেছে। আগামী নির্বাচনে জয় পেতে বিএনপি কোমর বেঁধে নেমেছে মাঠে। তবে বিএনপির ভয়ের জায়গাটি হচ্ছে দলীয় কোন্দল। এই দ্বন্দ্ব না মিটলে নির্বাচনে এর প্রভাব পড়তে পারে। এরই মধ্যে বিএনপির মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেছেন ৭ নেতা। তবে বিএনপির মধ্যে দীর্ঘদিনের নিষ্ক্রিয়তার দেয়াল ভেঙে আগামীতে তারা কীভাবে এবং কতটুকু অগ্রসর হতে পারবে সেটিই দেখার বিষয়। এদিকে দ্বন্দ্ব রয়েছে আ’লীগেও। তবে শেষ মুহূর্তে নৌকা প্রশ্নে একাট্টা হওয়ার রেওয়াজ রয়েছে স্থানীয় আ’লীগে।

 

এর আগে তালতলী ও আমতলী নিয়ে আলাদা একটি আসন থাকলেও সবশেষ আসন পুনঃবণ্টনের সময় ৩টি উপজেলা নিয়ে বরগুনা-১ আসন করা হয়। জেলার ৩টি আসনের একটিকে বিলুপ্ত করে দুটি করা হয় জেলায়।

 

নব্বইয়ের পটপরিবর্তনের পর ১৯৯১ সালের ভোটে এমপি হন আ’লীগের জেলা সভাপতি শম্ভু। ’৯৬ সালেও তিনি জয় পান। ২০০১ সালে শম্ভুর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে জয়লাভ করেন আ’লীগের বর্তমান জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান দেলোয়ার হোসেন। ২০০৮ সালে ১ লাখ ৩১ হাজার ভোট পেয়ে এমপি হন শম্ভু। বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে আ’লীগের প্রার্থী দেলোয়ার হোসেন পান ৮০ ভোট। সবশেষ ২০১৪ সালের নির্বাচনেও আ’লীগের দেলোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে লড়াই করে জয় ঘরে তুলতে হয়েছে শম্ভুকে। শম্ভু পান ৮৫ হাজার ৮০ ভোট। দোলোয়ার পান ৬৫ হাজার ১৭৯ ভোট।

 

চাওয়া-পাওয়ার হিসাবে গরমিল এবং বিগত বেশ কয়েকটি নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে না পারার ঘটনায় সাধারণ ভোটাররা কিছুটা হলেও ক্ষুব্ধ। আ’লীগ নেতাদেরকে মাঠের এ বাস্তবতা মোকাবেলা করে এগোতে হচ্ছে। স্থানীয় আ’লীগের তরুণ নেতাকর্মীরা বলছেন, ‘বর্তমান এমপি শম্ভু চারবার এমপি একবার উপমন্ত্রী হয়েছেন। জীবনে তিনি অনেক কিছু পেয়েছেন। ফলে নতুন নেতৃত্বের জন্য জায়গা ছেড়ে দেয়ার সময় হয়েছে। আমরা নতুন প্রার্থী চাই।’

 

জেলা আ’লীগের সভাপতি বর্তমান এমপি অ্যাডভোকেট ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু ছাড়াও আ’লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হচ্ছেন- জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক ও বরগুনা জেলা পরিষদের সাবেক প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর কবীর, জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ও সাবেক স্বতন্ত্র এমপি মো. দেলোয়ার হোসেন, জেলা আ’লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জেলা যুবলীগ সভাপতি অ্যাডভোকেট মো. কামরুল আহসান মহারাজ, জেলা আ’লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক গোলাম সরোয়ার টুকু, সদর উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও বরগুনা সরকারি কলেজের সাবেক ভিপি অ্যাডভোকেট শাহ মোহাম্মদ ওয়ালি উল্লাহ অলি, জেলা আ’লীগের সদস্য গোলাম সরোয়ার ফোরকান, আ’লীগের কেন্দ্রীয় উপ-কমিটির সাবেক সহ-সম্পাদক মশিউর রহমান শিহাব এবং বরগুনা জেলা আ’লীগের সাবেক সদস্য ও জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি মো. আবদুল মোতালেব মিয়া।

 

বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশীরা হচ্ছেন- সাবেক এমপি মতিউর রহমান তালুকদার, জেলা বিএনপির সভাপতি মাহবুবুল আলম ফারুক মোল্লা, কর্নেল (অব.) আবদুল খালেক, কেন্দ্রীয় বিএনপির সহ-শ্রমবিষয়ক সম্পাদক ফিরোজ-উজ জামান মামুন মোল্লা এবং জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এসএম নজরুল ইসলাম। জাতীয় পার্টির জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল লতিফ ফরাজি মনোনয়ন চাইতে পারেন।

 

স্থানীয় আওয়ামী লীগে বেশ কিছুদিন ধরে অসন্তোষ চলছে। স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেন্দ্র করে শম্ভুর বিরুদ্ধে দফায় দফায় সংবাদ সম্মেলন করে নানা অভিযোগ করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভও হয়েছে। এলাকায় তাকে অবাঞ্ছিত পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়েছে। জানতে চাইলে শম্ভু বলেন, ‘সভানেত্রী আমাকে ৫ বার মনোনয়ন দিয়েছেন। ৪ বার এমপি হয়ে দলকে শক্তিশালী করা ছাড়াও এলাকায় ব্যাপক উন্নয়নমূলক কাজ করেছি। অসমাপ্ত কাজ শেষ করতে মনোনয়ন চাইব।’

 

তিনি বলেন, ‘বরগুনা জেলায় একসময় যেখানে কোনো রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ ছিল না। এখন ৭০ ভাগ গ্রামে বিদ্যুৎ। ২৫০ শয্যার হাসপাতাল, মা ও শিশু ক্লিনিক করা হয়েছে। বরগুনা, আমতলী ও বেতাগী পৌরসভাকে প্রথম শ্রেণীতে উন্নীত করা হয়েছে।’ আ’লীগের আরেক মনোনয়ন প্রার্থী জাহাঙ্গীর কবীর বলেন, ‘প্রার্থী বদল দরকার, নতুন করে যিনিই এমপি হবেন তার পক্ষেই আরও বেশি বেশি কাজ করা সম্ভব। পরিবর্তন না হলে বরগুনার উন্নয়ন হবে না। এমপিরা উন্নয়নমূলক কাজ কোথায় কীভাবে করেন তা দল জানে না।’ দেলোয়ার হোসেন বলেন, ‘২০০১ সালে বর্তমান এমপিকে হারিয়ে জয়লাভ করেছিলাম। এ বছর বরগুনা জেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছি। সংসদ নির্বাচনে দলের কাছে মনোনয়ন চাইব। মনোনয়ন পেলে ৮০ ভাগ ভোট পেয়ে জয়ী হব।’

 

অ্যাডভোকেট মহারাজ বলেন, ‘বর্তমান নেতৃত্বের প্রতি মানুষ আস্থা রাখতে পারছে না। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও আত্মীয়করণ এখন সবার মুখে মুখে। আস্থা ফিরিয়ে আনতে মনোনয়ন পরিবর্তনের বিকল্প নেই।’ তিনি বলেন, ‘আগামী নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন চাইব। এ ভয়ে আমাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে।’

 

গত পৌরসভা নির্বাচনে দলীয় অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জেরে তিনি গুলিবিদ্ধও হন। ‘বরিশাল বিভাগে এক সঙ্গে ১৭টি পৌরসভায় নির্বাচন হয়। শুধু আমিই পরাজিত হয়েছি- এ জন্য তিনি বর্তমান এমপিকে দায়ী করেন। আ’লীগের প্রার্থী ওয়ালিউল্লাহ অলি বলেন, ‘অবশ্যই আগামী জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন চাই। বরগুনার মানুষ পরিবর্তন চায়। গ্রাম থেকে গ্রাম ঘুরে সাধারণ মানুষের মনের কথা জেনেছি। সবাই চায় নতুন নেতৃত্ব আসুক।’

 

গোলাম সরোয়ার ফোরকান বলেন, ‘দলের কাছে মনোনয়ন চেয়ে একবার পেয়েছি। আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন চাই। মনোনয়ন দিলে আমতলী ও তালতলী দুই উপজেলায় একচেটিয়া ভোট দেবে। মশিউর রহমান শিহাব বলেন, ‘সারা দেশে উন্নয়নের জোয়ার বইলেও বরগুনায় তা দৃশ্যমান হয়নি। আমি মনোনয়ন পেলে জনগণের আশার প্রতিফলন ঘটাব।’ বিএনপির সাবেক এমপি মতিউর রহমান তালুকদার বলেন, আমতলী ও তালতলীতে আমি একক প্রার্থী। মনোনয়ন পেলে জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।

 

বিএনপির মাহবুবুল আলম ফারুক মোল্লা জানান, ‘দলের কাছে মনোনয়ন চেয়েছি।’ মনোনয়ন চাওয়ার কথা জানিয়েছেন তার আপন ভাতিজা মো. ফিরোজ-উজ জামান মামুন মোল্লা কে বলেন, ‘আগামীতে তরুণ নেতৃত্ব হিসেবে আসছেন তারেক জিয়া। তরুণ হিসেবে মনোনয়ন চেয়েছি।’ কর্নেল (অব.) আবদুল খালেক বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যখন ক্ষমতায় তখন বরগুনা সদর উপজেলা নির্বাচনে চেয়ারম্যান হই। দল মনোনয়ন দিলে বিপুল ভোটে জয়লাভের ব্যাপারে আমি আশাবাদী।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ