প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কোথায় যাচ্ছে এত টাকা

সমকাল : শিল্প স্থাপনে ব্যবহূত মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারিজ) আমদানি বেড়েছে ব্যাপকভাবে। বেসরকারি খাতের ঋণের প্রবৃদ্ধিও ভালো। এই পরিসংখ্যানের হিসাবে দেশে বিনিয়োগে চাঙ্গা ভাব বিরাজ করার কথা। বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। নতুন শিল্প স্থাপন নেই বললেই চলে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের চিত্র অনেকটা হতাশাজনক। আবার আমদানি ব্যয়ও বাড়ছে। শিল্প স্থাপনের নামে কোটি কোটি ডলারের এলসি খোলা হলেও বিনিয়োগ সে অনুযায়ী হচ্ছে না। অর্থনৈতিক বিশ্নেষকদের প্রশ্ন- তাহলে এত টাকা যাচ্ছে কোথায়!

অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, সাধারণত নির্বাচনের বছরে নানা শঙ্কা ও ভয়ের কারণে দেশ থেকে অর্থ পাচার বাড়ে। অধিকাংশ দেশেই কমবেশি এ প্রবণতা দেখা যায়। তবে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটা বেশি। তাদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে শিল্পের মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি যে হারে বেড়েছে, সে তুলনায় বিনিয়োগ হয়নি। জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মধ্যে অনিশ্চয়তা রয়েছে। এ অবস্থায় নিরাপত্তার অভাবে সম্পদশালী ব্যক্তিদের অনেকে অর্থ বিদেশে পাঠিয়ে দিতে পারেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক বিভিন্ন পরিদর্শনেও অর্থ পাচারের নানা তথ্য উঠে এসেছে। অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সম্প্রতি বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দেশ থেকে টাকা পাচারের কথা উল্লেখ করেন। বর্তমানে অর্থ পাচার সংক্রান্ত ৩২টি ঘটনার অনুসন্ধান করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

সূত্র বলছে, রফতানি না করেও এর বিপরীতে শত শত কোটি টাকা নগদ সহায়তা নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। আবার আমদানির নামে এলসি খুলে বিল পরিশোধ করলেও অনেক ক্ষেত্রে পণ্য দেশে আসছে না। কর ফাঁকির মাধ্যমেও টাকা পাচার হচ্ছে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, নির্বাচনের আগে এ প্রবণতা বাড়ছে। এভাবে নানা উপায়ে দেশ থেকে টাকা পাচার হচ্ছে। যদিও সরকারের দায়িত্বশীল পর্যায়ের কেউ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে চাননি। গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেগ্রিটির (জিএফআই) সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে বিদেশে অর্থ পাচার বেড়েছে। অর্থ পাচারের দিক থেকে শীর্ষ ১০০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৪০তম। এনবিআর সূত্র বলেছে, উচ্চ করহারের কারণে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে আমদানি-রফতানির আড়ালে বিপুল অর্থ পাচার হয়।

বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব উভয়ই কমেছে। আলোচ্য সময়ে দেশি বিনিয়োগ নিবন্ধন হয়েছে প্রায় ৯৭ হাজার কোটি টাকার, যা আগের অর্থবছরের একই সময় ছিল প্রায় এক লাখ কোটি টাকা। অপরদিকে একই অর্থবছরের ফেব্র্রুয়ারি পর্যন্ত বিদেশি বিনিয়োগ নিবন্ধন হয়েছে ৯৩০ কোটি ডলারের। অথচ গত অর্থবছরের এই সময়ে ছিল দেড় হাজার কোটি ডলার।

সম্প্রতি বাংলাদেশে আশানুরূপ বিনিয়োগ না হলেও মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি থেমে নেই। আসলে পণ্য আমদানি হচ্ছে, নাকি আমদানির আড়ালে দেশ থেকে অর্থ পাচার হচ্ছে- এ নিয়ে নানা প্রশ্ন রয়েছে। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার তদারকি ব্যবস্থা দুর্বল থাকায় এটা বন্ধ হচ্ছে না। প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত ২০১৭-১৮ অর্থবছরে মোট ৫ হাজার ৪৪৬ কোটি ডলার মূল্যের আমদানি হয়। এর মধ্যে শুধু মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি দেখানো হয়েছে এক হাজার ৪৫৬ ডলার। অর্থাৎ এক লাখ ২২ হাজার কোটি টাকা, যা মোট আমদানির ২৫ শতাংশ। এটি আগের অর্থবছরের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বেশি। যেখানে আমদানিতে প্রবৃদ্ধি ছিল ২৫ শতাংশের বেশি। সামগ্রিক আমদানির তুলনায় মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির বিষয়টি প্রশ্নবিদ্ধ বলে মনে করেন সংশ্নিষ্টরা।

চলতি অর্থবছরেও একই প্রবণতা অব্যাহত আছে। গত জুলাই-আগস্টে আমদানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ। অথচ মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বেড়েছে প্রায় ১৩ শতাংশ। এ সময়ে ২৪৯ কোটি ডলারের মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি দেখানো হয়েছে, যা মোট আমদানির ২৬ শতাংশের বেশি। এদিকে বিপুল পরিমাণের আমদানি দায় মেটাতে গিয়ে চাপে পড়েছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। বর্তমানে রিজার্ভের পরিমাণ কমে নেমে এসেছে ৩২ বিলিয়নে, যা গত বছর ৩৩ বিলিয়নের ওপরে ছিল।

ব্যাংকাররা জানান, মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বাড়লে সাধারণত শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ ব্যাপক বাড়ে। কিন্তু তেমনটি দেখা যাচ্ছে না। গত মার্চ পর্যন্ত শিল্প খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১৩ শতাংশের কম। অথচ সামগ্রিকভাবে বেসরকারি খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ১৮ শতাংশ। ঋণ প্রবৃদ্ধির এ অসামঞ্জস্যতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ প্রসঙ্গে বেসরকারি খাতের একটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি বৃদ্ধির মানে নতুন কারখানা স্থাপন বা কারখানা সম্প্রসারণ। আর এ রকম হলে ব্যাংক খাতে ঋণ চাহিদা ব্যাপক বেড়ে যায়। তবে তেমনটি দেখা যাচ্ছে না। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির নামে দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে যাওয়ায় এমনটি হচ্ছে বলে তার ধারণা।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরের আগস্ট পর্যন্ত বেসরকারি খাতে বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ লাখ ১০ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় যা ১৫ শতাংশ বেশি। অবশ্য গত বছরের নভেম্বর পর্যন্ত ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৯ দশমিক ০৬ শতাংশে উঠেছিল। তবে ঋণের নামে অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে- এ রকম অভিযোগ ওঠার পর কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঋণ নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা নেয়। গত বছরের জানুয়ারিতে এক নির্দেশনার মাধ্যমে ব্যাংকগুলোর ঋণ-আমানত অনুপাত কমিয়ে দেওয়া হয়।

যোগাযোগ করা হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি যেভাবে বেড়েছে সে হারে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান হচ্ছে না। এই প্রবণতার অর্থই হচ্ছে মূলধনী যন্ত্রপাতির আড়ালে দেশ থেকে টাকা পাচার হচ্ছে। বিষয়টি সরকারের সংশ্নিষ্ট সংস্থার তদন্ত করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। সাবেক এই গভর্নর মনে করেন, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ থাকলে এত টাকা পাচার হতো না। তার মতে, নির্বাচন এলেই টাকা পাচার হয়। এ জন্য রাজনৈতিক সংস্কৃৃতির উন্নয়ন প্রয়োজন।

আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সাবেক কর্মকর্তা ও বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ক্ষমতা পরিবর্তনের সময় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। এটা অনেককে অর্থ পাচারে প্ররোচিত করে। তিনি আরও বলেন, আমদানি পর্যায়ে পাচারকৃত অর্থের বড় একটি অংশ যায় মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির আড়ালে। কারণ এসব পণ্য আমদানিতে নূ্যনতম শুল্ক্কহার থাকে। ফলে মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে শুল্ক্ক ফাঁকির মাধ্যমে টাকা পাচার করা সহজ।

আহসান এইচ মনসুর আরও বলেন, বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং অবকাঠামো খাতের মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের কারণে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কিছু বাড়তে পারে। কিন্তু অস্বাভাবিকভাবে বাড়লে তা অবশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ। বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআরের বিষয়টি যৌথভাবে তদন্ত করা উচিত বলে মনে করেন তিনি। শিল্প খাতে ঋণ বিতরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচনের আগে ঋণ বৃদ্ধির বিষয়টি সন্দেহজনক। ঋণের টাকা নির্বাচনের কাজে ব্যবহারের আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সম্প্রতি মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির বেশি প্রবৃদ্ধি হচ্ছে। এখানে বেশি মূল্য দেখানো হচ্ছে। বিষয়টি খতিয়ে দেখতে হবে।

এনবিআর সূত্র বলছে, সাধারণত শূন্য শুল্ক্ক বা যেসব পণ্যের শুল্ক্কের হার কম থাকে, সেসব পণ্য আমদানিতে মিথ্যা ঘোষণা বেশি হয়। বর্তমানে শিল্পে ব্যবহূত ক্যাপিটাল মেশিনারিজ বা মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি শুল্ক্ক ১ শতাংশ। এনবিআরের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, শিল্প স্থাপনের নামে যে পরিমাণ মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হয়, বাস্তবে তার প্রতিফলন দেখা যায় না।

জানা যায়, টাকা পাচার বন্ধে আইনের সংস্কার হলেও তা কমেনি, বরং বেড়েছে। দেশ থেকে টাকা পাচার বন্ধে বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড ও দুদকের তিনটি আইন থাকলেও টাকা পাচার অব্যাহত রয়েছে। মূলত এই তিনটি সরকারি সংস্থার মধ্যে সমন্বয় না থাকায় এসব আইনের সুফল পাওয়া যাচ্ছে না। মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ সংক্রান্ত আইনটি ২০১২ সালে আরও শক্তিশালী করা হয়। এতে টাকা পাচার সংক্রান্ত যে কোনো ঘটনা তদন্তের যুগপৎ ক্ষমতা কেন্দ্রীয় ব্যাংক, এনবিআর ও দুদক প্রতিনিধিদের পাশাপাশি পুলিশের গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দেওয়া হয়। কিন্তু সুফল মিলছে না।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ