প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রমেশের আবিষ্কৃত সাত রঙের চা এখন বিশ্বখ্যাত

ডেস্ক রিপোর্ট : রমেশের আবিষ্কৃত সাত রঙের চা পান করার চেয়ে মনে বিস্ময় জাগায় বেশি। রমেশরাম গৌড় দীর্ঘ এক যুগ ধরেই এই চা বানাচ্ছেন।বর্তমানে তার দোকান রয়েছে দুইটি। একটি মনিপুরী সম্প্রদায় অধ্যুষিত রামনগর এলাকায়। আরেকটি শ্রীমঙ্গল কালিঘাট রোডের ১৪ বিজিবি ব্যাটালিয়নের ক্যান্টিনে।দোকানের নাম নীলকণ্ঠ চা কেবিন।

মৌলভীবাজার জেলাকে চায়ের রাজধানী বলা হয় কারণ শুধু মাত্র এই জেলাতেই রয়েছে ৯২টি চা-বাগান। আকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, সারি সারি চা-বাগান, পাহাড় টিলা, জলপ্রপাতসহ অসংখ্য দর্শনীয় স্থানের জন্য এই জেলার খ্যাতি বিশ্বব্যাপী। প্রায় প্রতিদিনই দেশ-বিদেশের হাজারো পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকে এই জেলা। বিশেষ করে শীত মৌসুমে প্রতিটি হোটেল মোটেল, কটেজ থাকে কানায় কানায় পূর্ণ।

আর দর্শনীয় স্থানগুলো থাকে লোকে লোকারণ্য। প্রকৃতির অপরূপ দৃশ্য উপভোগ করার পাশাপাশি পর্যটকদের অন্যতম প্রধান একটি আকর্ষণ থাকে শ্রীমঙ্গলে রমেশরাম গৌউরের আবিষ্কৃত সাত রঙের চায়ের স্বাদ নেয়া। শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে এসেছেন অথচ সাত রঙের চায়ের স্বাদ নেয়া হয়নি তাহলে আপনার শ্রীমঙ্গল ভ্রমণটাই অপূর্ণ থেকে যাবে।

এক কথোপকথনে রমেশ রাম গৌড় জানান, তার জীবন যুদ্ধের গল্প। তার মূল বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার মুক্তাগাছা উপজেলার আটানিবাজার এলাকায়। অর্থের দিক দিয়ে খুব একটা সচ্ছল ছিলেন না তিনি। সামান্য কিছু পুঁজি জমিয়ে ময়মনসিংহ জেলার মুক্তা গাছায় এক বন্ধুর সাথে যৌথভাবে ক্ষুদ্র ব্যবসায় নেমেছিলেন। কিন্তু সেই অংশীদার পুরো টাকাই আত্মসাৎ করে নিয়ে পালিয়ে যায়। এমতাবস্থায় পরিবার নিয়ে বেশ বিপাকে পরে যান তিনি।

সংসারে তিন ছেলে দুই মেয়ে এবং এক ভাই রয়েছে। কোনোরকম চাল কিনলে সবজি কেনার সামর্থ্য ছিলো না রমেশের। দিনের পর দিন একবেলা আধা বেলা খেয়ে জীবন চলতো পরিবার সহ তার। একপর্যায়ে রমেশ সিদ্ধান্ত নেন পরিবার নিয়ে শ্রীমঙ্গলে চলে আসবেন। কিছু একটা করে চলবেন।

শ্রীমঙ্গলকেই কেন বেছে নিলেন প্রতিবেদকের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, ব্যবসার প্রয়োজনে শ্রীমঙ্গলে আমার পূর্বে থেকেই আসা- যাওয়া ছিল। শ্রীমঙ্গল থেকে চা পাতা কিনে নিয়ে ময়মনসিংহের বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করতাম। কিন্তু ব্যবসার অংশীদার লাভ করে তার পুঁজি আত্মসাৎ করায় পরিবার নিয়ে বিপাকে পরে যান তিনি। তারপরই তিনি সিদ্ধান্ত নেন শ্রীমঙ্গলে চলে আসবেন।

ভাগ্য বদলের আশায় ২০০০ সালের মার্চ মাসে স্ত্রী তিন ছেলে, দুই মেয়ে ও ছোট ভাই সহ মাত্র দেড় হাজার টাকা সঙ্গে নিয়ে স্বপরিবারে শ্রীমঙ্গলে চলে আসেন। শ্রীমঙ্গলে এসে শহর থেকে কিছুটা দূর মণিপুরী বস্তিতে সামান্য টাকা ভাড়ায় একটি বাসা নেন। প্রথম দিকে রমেশ পৌর শহরের নতুন বাজার এলাকায় একটি চায়ের দোকানে সামান্য বেতনে চাকরি নেন। চাকরি করে কিছু পুঁজি জমা হওয়ার পর তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন নিজেই একটি চায়ের দোকান করবেন। যেই কথা সেই কাজ চাকরি ছেড়ে দিয়ে শহর থেকে দূরে চা বাগান এলাকায় বাংলাদেশ চা গবেষণা ইন্সটিটিউট (বিটিআরআই) সংলগ্ন ফিনলে টি কোম্পানির কাকিয়াছড়া চা বাগানে একটি চায়ের দোকান দেন।

দোকান দেয়ার পর নিজে গবেষণা করে ২০০২ সালে এক গ্লাসে দুই-রঙা চা আবিষ্কার করেন। তখন রমেশের এই দুই রঙের চা পান করতে শহরের মানুষ যেতে শুরু করলেন। একে একে পর্যটকরাও তার এই ভিন্ন রকম চা পান করতে দোকানে ভিড় জমাতেন। ব্যবসা ভালো চলতে শুরু করলো ধীরে ধীরে গবেষণা করে চায়ের স্তর বাড়াতে শুরু করেন। এ পর্যন্ত তার চা সাত কালারের দশ লেয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে। ধীরে ধীরে রমেশ রাম গৌড়ের সুনাম বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। তার এ বিস্ময়কর আবিষ্কার মিডিয়াতে প্রচার হতে থাকে। শুধু বাংলাদেশের মিডিয়া নয় বিদেশী গণমাধ্যমেও তার এ বিস্ময়কর আবিষ্কার নিয়ে সংবাদ হয়।

লন্ডনের বিখ্যাত দি গার্ডিয়ান পত্রিকায় তাকে নিয়ে প্রতিবেদন করে। লন্ডন আমেরিকা সহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক শীর্ষ স্থানীয় টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে রমেশের সাক্ষাৎকার। আর এই থেকেই ভাগ্য বদলে যায় রমেশের। লন্ডনের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী জর্জ মরিসন বাংলাদেশে ঘুরতে এসে রমেশের এই চা পান করেন এবং তাকে লন্ডনে তার প্রতিষ্ঠানে মোটা অংকের বেতনে চাকরির প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি চাকরির সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন।

বাংলাদেশের শীর্ষ স্থানীয় ব্যবসায়ী, আমলা সাংবাদিক শীর্ষ স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি থেকে শুরু করে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিশ্বের প্রায় বেশিরভাগ দেশের রাষ্ট্রদূত তার হাতে তৈরী করা এই বিস্ময়কর চা পান করেছেন। তিনি জানান, আমার একটি স্বপ্ন ছিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমি নিজ হাতে চা বানিয়ে এই সাত রঙের চা পান করাবো। আমার সেই স্বপ্নও পূরণ হয়েছে। সম্প্রতি শ্রীমঙ্গলে নবনির্মিত একটি সরকারি হাসপাতাল উদ্বোধন এসে রমেশের নিজ হাতে তৈরী করা এই সাত রঙের চা পান করে অনেক প্রশংসা করেছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

রমেশ যে গ্লাসটিতে প্রধানমন্ত্রীকে সাত রঙের চা পান করিয়েছেন সে গ্লাসটি স্মৃতি হিসেবে বাঁধিয়ে দোকানে সাজিয়ে রেখেছেন। তাছাড়া পঞ্চম শ্রেণীর ইংরেজি পাঠ্য বইয়েও রমেশের এই বিস্ময়কর চা নিয়ে একটি লেখা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

রমেশ জানান,আমার জীবন স্বার্থক। কি ছিলাম আর কি হয়েছি। বিশ্বব্যাপী অনেক বড় বড় মাপের মানুষ আজ আমাকে চিনে। ইতোমধ্যে রমেশ নিজের টাকায় বাড়ি বানিয়েছেন, গাড়ি কিনেছেন এবং বড় ছেলেকে পৃথক ব্যবসা দিয়ে দিয়েছেন। ছোট দুই ছেলে আর ছোট ভাইকে নিয়ে দুই দোকান পরিচালনা করেন তিনি। রমেশের আবিষ্কৃত এই বিস্ময়কর চা তিনি নিজে বানান। এই চা প্রস্তুতের সময় তিনি দরজা বন্ধ করে তৈরী করেন যাতে করে গোপনীয়তা বজায় থাকে। তবে সম্প্রতি তার এক ছেলেকে এই বিস্ময়কর চা প্রস্তুতের নিয়ম কানুন শিখিয়েছেন।

রমেশ জানান, আমার দোকানের এক কর্মচারী লুকিয়ে লুকিয়ে দেখে শিখে ফেলে। তারপর সে আলাদা দোকান দেয়। কিন্তু সাত রঙের চা মানেই রমেশের সাত রঙের চা এটা প্রায় সকলেই জানে তবে অনেক সময় অনেক পর্যটকই ধোকা খায় এই নকল চা খেয়ে আর আমারও ক্ষতি হয়। তিনি জানান, তার সেই কর্মচারী দোকান দিয়ে টিকতে না পেরে অন্য চায়ের দোকানে চাকরি নেন আর এভাবেই অনেক জায়গায় এই চায়ের ঘোমর ফাঁস করে দিয়েছে সে। তবে পর্যটক সহ শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি বর্গ রমেশের দোকানেই যায় এই সাত রঙা চা পান করতে।

রহস্য জনক এই সাত রংঙের চা দেশি-বিদেশি পর্যকদের কাছে এখনো বিস্ময়কর বিষয়। কিভাবে একটি গ্লাসে সাতটা রংঙের চা তৈরী হয়!এক লেয়ার অপর লেয়ারের সাথে মিশে না। এই রহস্যময় চা পর্যটকদের অারও আকর্ষণ বাড়িয়ে দেয়। আর এজন্যই শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে আসা প্রায় প্রতিটা পর্যটক স্বাদ নেন এক গ্লাসে সাত রঙের চায়ের। প্রতিটি লেয়ার আলাদা আলাদা থাকে এবং প্রতিটি লেয়ারের স্বাদও ভিন্ন। চায়ের রাজধানী খ্যাত এই শ্রীমঙ্গলে পর্যটকদের বেড়াতে অাসা মানেই সাত রংঙের চায়ের সাথে পরিচিত হওয়া।

কিভাবে তৈরি করা হয় সাত রঙের চা জানতে চাইলে এ চায়ের অাবিষ্কারক রমেশ রাম গৌড় সারাবাংলাকে মৃদু হাসি দিয়ে বলেন, এটা বলা যাবে না। এটা বলা মানেই আমার গোমর ফাঁস হয়ে যাওয়া। তখন আর কেউ আমার দোকানে আসবে না। আমার এই ব্যবসার মূল পুঁজি হলো তৈরির গোপনীয়তা। তিনি বলেন, আমার তৈরী এই চায়ে কোন ক্যামিকেল নেই। রমেশ বলেন, অামার চায়ের সাতটা রং এবং দশটা লেয়ার পরিস্কার বুঝা যায়, আর বাহিরে যে কয়েকজন নকল করে বিক্রি করছে তাদেরটা স্বাধ এবং দেখতে অবশ্যই আমার তৈরী চায়ের মতো হবে না। নকলতো নকলই। পর্যটকরা না বুঝে ধোঁকা খেয়ে নকল সাত রঙা চা খেলেও যখন জানতে পারে তখন ঠিকই আমার কাছেই ফিরে আসে।

রমেশের বিস্ময়কর আবিষ্কারের এই সাত রঙের চায়ের স্বাদ নিতে হলে আপনাকে শ্রীমঙ্গল এসে শহর থেকে যেকোনো রিক্সা চালককে বললেই আপনাকে নীলকণ্ঠ চা কেবিন এ নিয়ে যাবে। তিনি জানান, আমাদের দুটি দোকান ছাড়া অন্য কোথাও আর কোনো শাখা নেই তাই পর্যটকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, ধোঁকা খাবেন না প্রকৃত সাত রঙা চায়ের স্বাধ নিতে হলে রমেশের সাত রঙা চা নীলকণ্ঠ চা কেবিন কালীঘাট রোডে আসতে হবে।

সূত্র : বিডি মরনিং

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ