প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নির্বাচনে ‘জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট’ : খ্যাদা নাকে নাক ডেঙা ডেং, ড্যাং!

ব্যারিস্টার তুরিন আফরোজ : সাত দফা পূরণ না হলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে যাবে না বলে এক ঐতিহাসিক ঘোষণা দিয়েছিলো। অতিউত্তম। এ ধরনের কঠোর অবস্থান নিতে না পারলে কি আর রাজনীতিতে গুণগত মান আসবে, বলুন? তো দেখা যাক, সাত দফা পূরণে কতোটুকু সার্থক হলো আমাদের জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। নাকি সাত দফা জলাঞ্জলি দিয়ে ‘নাক ডেঙ্গা ডেং ড্যাং’ করতে করতে আমাদের জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনী নৌকায় উঠে বসলো?

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ঘোষিত প্রথম দফার দাবি অনুযায়ী সরকার আজ পর্যন্ত পদত্যাগ করেনি। জাতীয় সংসদকে বাতিল করা হয়নি। নির্বাচনকালীন নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার গঠনের কোনো আভাস পাচ্ছি না। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির সম্ভাবনা দেখছি না ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে। কিন্তু তবুও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে যাচ্ছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ঘোষিত দ্বিতীয় দফার দাবি অনুযায়ী নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠিত হয়নি। একই নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে। সীমিত আকারে হলেও নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহৃত হচ্ছে। কিন্তু তবুও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে যাচ্ছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ঘোষিত তৃতীয় দফার দাবি অনুযায়ী বাক, ব্যক্তি, সংবাদপত্র, টেলিভিশন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সকল রাজনৈতিক দলের সভা সমাবেশের স্বাধীনতা এগুলো চলে গিয়েছিলো কবে যে এদেরকে ফিরিয়ে আনতে হবে? ক্রমাগত জীবন দানকারী মাহমুদুর রহমান মান্না ক্যাম্পাসে লাশ ফেলে দিচ্ছেন কথায় কথায়। বেগম খালেদা জিয়ার জন্য আবারও জীবন দেওয়ার জন্য মান্না উতলা হচ্ছেন, কান্না করছেন, থামানোই যাচ্ছে না! ওদিকে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী গণকের ভূমিকায় বলে ফেলছেন এই মুহূর্তে নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ ১৮টি নয়, ১১৯টিও নয়, গুণে গুণে ঠিক ১৯টি সিট পাবে! আবার অতি বিপ্লবী কণ্ঠে আওয়াজ তুলছেন, চাইলে কারা যেন তিন দিনেই বর্তমান সরকারের পতন ঘটাতে পারে। এতো বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা কোথায় রাখি?

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ঘোষিত চতুর্থ দফার দাবি অনুযায়ী আমি ঠিক জানি না জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মতে হয়রানিমূলক মামলা কাকে বলে। আমি এটাও জানি না যে কোন গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তিদের মুক্তির নিশ্চয়তা চেয়েছিলো জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট? জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের দাবি অনুযায়ী ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন অথবা অন্য কোনো সাদা-কালো বা রঙ্গীন আইন এরই মাঝে বাতিল হয়েছে কিনা জানি না! এসব নিয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আরও রংবাজি করবে বলে ভেবে নিয়েছিলাম। কিন্তু না, কিছুই হলো না। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তবুও নির্বাচনে যাচ্ছে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ঘোষিত পঞ্চম দফার দাবি অনুযায়ী নির্বাচনে সেনাবাহিনীকে নিয়ে টানাটানি কেন করা হচ্ছে বুঝি না? আর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিয়োজিত ও নিয়ন্ত্রণের পূর্ণ ক্ষমতা সংবিধান অনুযায়ী তো নির্বাচন কমিশনের ওপরই ন্যস্ত আছে। কেন তবে এই কুফা দফা?

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ঘোষিত ষষ্ঠ দফার দাবি একেবারেই অর্থহীন। আমাদের দেশের নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে দেশি ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের উপস্থিতি সব সময়েই ছিলো। এটা নিয়ে নতুন করে দাবি উঠানোর কি আছে? নাকি দাবির সংখ্যা বাড়ালে দাবি জোড়ালো মনে হয় তা-ই বলা? এছাড়া, নির্বাচনকালীন সময়ে গণমাধ্যমকর্মীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ করা হলে আমরা নির্বাচনের এতো এতো ফুটেজ কি করে দেখতে পাই গণমাধ্যমে? তারপরও যদি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট মনে করে এসব হচ্ছে না, তাহলে কি বুঝে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট তবুও নির্বাচনে যাচ্ছে?

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ঘোষিত সপ্তম দফার দাবি অনুযায়ী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আমাদের জানায়নি যে, ‘রাজনৈতিক মামলা কি ও কাহাকে বলে’? আদালত অবমাননার মামলা কি ‘রাজনৈতিক মামলা? এতিমখানার টাকা চুরি কি রাজনৈতিক মামলা? ট্রাস্টের টাকা নয়-ছয় করা কি রাজনৈতিক মামলা? নারী সাংবাদিককে গণমাধ্যমে মানহানি করা কি রাজনৈতিক মামলা? দশ ট্রাক অস্ত্র মামলা কি রাজনৈতিক মামলা? ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মামলা কি রাজনৈতিক মামলা? আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর আক্রমণ কি রাজনৈতিক মামলা? পেট্রলবোমা আক্রমণের মামলা কি রাজনৈতিক মামলা? হাজারো প্রশ্ন মনে ঘুরছে। কী করি?

আবার জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ঘোষিত সপ্তম দফার দাবি অনুযায়ী এই প্রশ্নও মাথায় আসছে যে, নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার তারিখ থেকে নির্বাচনের ফলাফল চূড়ান্তভাবে প্রকাশিত না হওয়া পর্যন্ত কোনো ধরনের নতুন মামলা কেন দেয়া যাবে না? কেউ যদি এই সময়ে খুন করে, ধর্ষণ করে, সংখ্যা লঘু নির্যাতন করে, চুরি-ডাকাতি করে তবে কি তাদের বিরুদ্ধে কোনো আইনি পদক্ষেপ নেয়া যাবে না? জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মাথা খারাপ হয়ে গেছে, যা বুঝলাম।

শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে না বলে পুড়লো বাস, মরলো মানুষ, হলো হরতাল, হলো অবরোধ। বেগম খালেদা জিয়াও বলেছিলেন বিজয় অর্জন না করে ঘরে ফিরবেন না। কেউ কথা রাখেনি কিন্তু তিনি রেখেছেন। কারণ যা-ই থাকুক না কেন, বেগম খালেদা জিয়া এখন আর তার ঘরে থাকেন না এটাই নির্মম সত্য। তো যাই হোক, ‘সাত খণ্ড রামায়ণ’ পড়ে এখন আমাদের জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট আসন্ন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে খ্যাদা নাক নিয়ে নাক ডেঙ্গা ডেং ড্যাং করতে করতে বিপুল বিজয়ের আশায় সামনে এগোচ্ছে

লেখক : আইনজীবী ও আইনের শিক্ষক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ