প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খেলাপির তালিকায় থাকা অনেকেই এমপি হতে চান

বণিক বার্তা : ঋণখেলাপির তালিকায় নাম আছে, তার পরও সংসদ সদস্য (এমপি) হতে চান তাদের অনেকে। এ লক্ষ্যে তারা দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। সংশোধিত গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে (আরপিও) ছাড়ের সুযোগ নিয়ে মনোনয়নপত্র জমার শেষ দিন পর্যন্ত খেলাপি ঋণ নিয়মিত করার চেষ্টা করছেন। এজন্য ব্যাংকগুলোর সঙ্গে যোগাযোগও বাড়িয়েছেন তারা।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও)-১৯৭২-এ নির্বাচনে প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র জমার সাতদিন আগে খেলাপি ঋণ পরিশোধের বাধ্যবাধকতা ছিল। গেজেট আকারে প্রকাশিত সংশোধিত আরপিওতে সাতদিনের বাধ্যবাধকতা তুলে দেয়া হয়েছে। মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার দিন পর্যন্ত ঋণ পরিশোধের সুযোগ রাখা হয়েছে। এ সুযোগে মনোনয়নপত্র কিনছেন অনেক ঋণখেলাপি।

বড় অংকের খেলাপি ঋণ থাকা সত্ত্বেও যারা প্রার্থী হতে চাইছেন, তাদের একজন মেসার্স ইলিয়াছ ব্রাদার্সের কর্ণধার মোহাম্মদ শামসুল আলম। হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়ে এ ব্যবসায়ী চট্টগ্রাম-৯ আসন (বাকলিয়া ও কোতোয়ালি) থেকে দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। এমইবি গ্রুপের এ কর্ণধারের বিরুদ্ধে ১৫ ব্যাংকের অর্ধশতাধিক মামলা রয়েছে। এসব মামলায় শামসুল আলমসহ গ্রুপটির অন্য কর্ণধারদের বিবাদী করা হয়েছে।

জাতীয় সংসদে ঘোষিত ১০০ ঋণখেলাপির তালিকায় নাম রয়েছে ঢাকা-১৪ আসনের (মিরপুর, শাহআলী ও দারুসসালাম) আওয়ামী লীগদলীয় সংসদ সদস্য আসলামুল হকের। একই আসন থেকে এবারো প্রার্থী হতে চান তিনি।

জানা গেছে, আসলামুল হকের মালিকানাধীন মাইশা গ্রুপের প্রতিষ্ঠান নর্থ পাওয়ার ইউটিলিটি স্থান পেয়েছে শীর্ষ ঋণখেলাপির তালিকায়। মাইশা গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ন্যাশনাল ব্যাংকের ঋণ রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। বিশাল অংকের এ ঋণের একটি অংশ খেলাপির খাতায় যুক্ত হয়েছে।

খেলাপি ব্যবসায়ী রাইজিং গ্রুপের কর্ণধার আসলাম চৌধুরীও মনোনয়ন চেয়েছেন চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) থেকে। বিএনপির এ যুগ্ম মহাসচিবের নামে দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহও করা হয়েছে। আসলাম চৌধুরীর প্রতিষ্ঠান রাইজিং গ্রুপের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে একাধিক ব্যাংকের খেলাপি ঋণ রয়েছে হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে শুধু রাইজিং স্টিল লিমিটেড ও লার্ক পেট্রোলিয়াম কোম্পানি লিমিটেডের কাছে ঋণের পরিমাণ ৫৮৮ কোটি টাকা।

বিএনপি সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও মুন্নু গ্রুপের কর্ণধার মরহুম হারুনার রশিদ খান মুন্নুর মেয়ে আফরোজা খানম রিতা বিএনপির পক্ষে মানিকগঞ্জ থেকে প্রার্থী হতে পারেন। তাদের প্রতিষ্ঠান মুন্নু ফ্যাব্রিকস সোনালী ব্যাংকের স্থানীয় কার্যালয়ে ঋণখেলাপি হিসেবে চিহ্নিত। তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ ২৩০ কোটি টাকা। গ্রুপের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে এ ঋণ নবায়নের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রার্থী হতে চান নীলফামারী-৪ আসনের জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য শওকত চৌধুরী। তার মালিকানাধীন যমুনা এগ্রো লিমিটেড বাংলাদেশ কমার্স ব্যাংকের বংশাল শাখায় একটি ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠান। খেলাপি ঋণটি নবায়নের জন্য তিনি ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে জানা গেছে।

রাজশাহী-৪ (বাগমারা) আসনের আওয়ামী লীগদলীয় সংসদ সদস্য এনামুল হক রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ব্যাংকের ঋণখেলাপি ছিলেন। জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী ঘোষিত শীর্ষ ১০০ ঋণখেলাপির তালিকায় উঠে এসেছিল এনামুল হকের মালিকানাধীন নর্দান পাওয়ার সলিউশন। নির্বাচনে প্রার্থী হতে হলে তাকে ঋণ পরিশোধ করে নিতে হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি সনদ। নর্দান পাওয়ার সলিউশনের কাছে জনতা ব্যাংকের পাওনা রয়েছে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা। তবে খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করার জন্য সম্প্রতি জনতা ব্যাংকে ডাউন পেমেন্ট দিয়েছেন এনামুল হক। তার ঋণটি পুনঃতফসিল করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন জনতা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আব্দুছ ছালাম আজাদ।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা এসএম ফজলুল হক চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নিতে দলীয় মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। পোশাক খাতের এ ব্যবসায়ী ও চয়েজ গ্রুপের কর্ণধারের কাছে জনতা ব্যাংক সিডিএ শাখার খেলাপি ঋণ রয়েছে ৭৬ কোটি টাকা। গত বছর প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেছে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক।

এর বাইরেও একাধিক ঋণখেলাপি আরপিওতে দেয়া সুযোগ কাজে লাগিয়ে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছেন। নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার আগ পর্যন্ত যাতে খেলাপি ঋণ নিয়মিত করা যায়, সেজন্য ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়িয়েছেন তারা।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ব্যাংকের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানান, ঋণখেলাপিরা এখন দলের প্রার্থিতা নিশ্চিত করার চেষ্টায় আছেন। খেলাপি ঋণ পরিশোধ করার পর যদি দলের মনোনয়ন না পান, তাহলে দুদিকেই লোকসান দেখছেন খেলাপিরা। দল থেকে মনোনয়ন পেলে তখন নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জমা দেয়ার জন্য খেলাপিরা ব্যাংকে আসবেন। তবে এরই মধ্যে অনেক ঋণখেলাপি নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার জন্য বিভিন্ন মাধ্যমে ব্যাংকের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

ঋণ পুনঃতফসিলের জন্য অনেক খেলাপিই বাংলাদেশ ব্যাংকের বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে ঋণখেলাপিদের তথ্য হালনাগাদ করার জন্য ব্যাংকগুলোকে চিঠি দেয়া হয়েছে। গত ৩১ অক্টোবর বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআইবি বিভাগ থেকে ব্যাংকগুলোকে খেলাপি ঋণসংক্রান্ত নির্দেশনা দেয়া হয়। মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটির আওতায় থাকা ক্ষুদ্র ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানের খেলাপি গ্রাহকদের তথ্যও চাওয়া হয়েছে।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পুনর্নির্ধারিত তফসিল অনুযায়ী, ২৮ নভেম্বর পর্যন্ত মনোনয়নপত্র জমা দেয়া যাবে। জমা দেয়া মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের তারিখ আগামী ২ ডিসেম্বর।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ