প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ঐক্যবদ্ধ থাকলে কেউ হারাতে পারবে না

সমকাল : আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আগামী নির্বাচন সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচনকে দলের জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিবেচনায় নিতে হবে। কোনো অবস্থায়ই অবহেলার চোখে দেখা যাবে না। ক্ষমতায় আছেন, তাই এমনিতেই ক্ষমতায় চলে আসবেন- এমনটা ভাববেন না। জনগণের কাছে যেতে হবে, তাদের মন জয় করতে হবে। ঘরে ঘরে গিয়ে নৌকার পক্ষে ভোট চাইতে হবে। কোনোরকম অবহেলা করলে ১৯৯১ ও ২০০১ সালের নির্বাচনের মতো হারতে হতে পারে। আর ঐক্যবদ্ধ থাকলে কেউ আওয়ামী লীগকে হারাতে পারবে না।

গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন গণভবনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশীরা তার সঙ্গে দেখা করতে এলে শেখ হাসিনা এ কথা বলেন। দলের ৪ হাজার ২৩ মনোনয়ন-প্রত্যাশীর সিংহভাগই সৌজন্য সাক্ষাতের সময় উপস্থিত ছিলেন। আগামী নির্বাচন সামনে রেখে তাদের উদ্দেশে নানা দিকনির্দেশনাও দেন তিনি। একাধিক মনোনয়নপ্রত্যাশী সূত্রে প্রধানমন্ত্রীর এসব দিকনির্দেশনার তথ্য পাওয়া গেছে। বিএনপি নির্বাচন থেকে সরেও দাঁড়াতে পারে- এমন আশঙ্কা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি নির্বাচনের তারিখ পেছানোর দাবি করায় নির্বাচন কমিশন সেটাই করেছে। তারা আবারও নির্বাচন পেছানোর দাবি তুলেছে। এটার পেছনে নিশ্চয়ই কোনো ষড়যন্ত্র রয়েছে। তারা কখন নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায়, তারও ঠিক নেই। এর আগেও এটি করেছে। তাই সাবধান থাকবেন, বিএনপি যেন আবারও জ্বালাওপোড়াও এবং দেশ ও মানুষের ক্ষতি করতে না পারে। নাশকতা ও সন্ত্রাসের চেষ্টা হলে প্রতিরোধ ও জনগণের পাশে থাকতে হবে।

শেখ হাসিনা আরও বলেন, তাদের (বিএনপি) সঙ্গে সংলাপ করেছি, কিছু বলতে পারি না। তবে ঈশান কোণে কালো মেঘ দেখতে পাচ্ছি। নিজেদের মধ্যে মতভেদ তৈরি করে কোনোভাবেই স্বাধীনতাবিরোধীদের ক্ষমতায় আসতে দেবেন না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আগামী নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য চ্যালেঞ্জিং। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষশক্তির বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াতসহ মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি এক হয়েছে। তাই আমাদেরও ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, সংগঠিত হতে হবে। দলের জন্য, দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে হবে।

এক্ষেত্রে নৌকা প্রতীকে যাকেই প্রার্থী করা হবে, দলীয় অনৈক্য ও দ্বন্দ্ব-কোন্দল ভুলে তার পক্ষেই কাজ করার জন্য সব মনোনয়নপ্রত্যাশীকে নির্দেশ দেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, এবার দলের মধ্যে প্রার্থী অনেক। কিন্তু আসন সংখ্যা সীমিত। একটি আসনে একজনকেই প্রার্থী করা যাবে, বাকিদের মনোনয়ন দেওয়া সম্ভব হবে না। তবে যাকেই মনোনয়ন দেওয়া হবে মতবিরোধ ভুলে বাকি সবাইকে তার পক্ষেই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

তিনি আক্ষেপ করে বলেন, একটি আসনে দল থেকে ৫২ জন প্রার্থী হয়েছেন। কোথাও ৩২ জন, আবার কোথাও ১০-১৫ জনও প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছেন। এটি অশুভ লক্ষণ। এটা নিশ্চয়ই ওইসব এলাকার নেতৃত্বের ব্যর্থতা।

দলীয় প্রার্থীর বাইরে কেউ প্রার্থী হলে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়ে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, দেখেশুনে দক্ষ ও যোগ্য প্রার্থী দেওয়া হবে। অনেক বড় নেতা, কিন্তু জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ততা নেই। জনগণ তাদের সঙ্গে নেই- এমন কাউকে দলীয় প্রার্থী করা হবে না। জনগণ যাদের সঙ্গে আছে তাদেরই মনোনয়ন দেওয়া হবে। যুদ্ধাপরাধীদের সন্তান এবং বিতর্কিত কেউ মনোনয়নও পাবেন না। যাচাই-বাছাই করে যাকেই প্রার্থী করা হবে তার পক্ষেই সবাইকে কাজ করতে হবে। কেউ বিরুদ্ধাচরণ করলে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নাম উল্লেখ না করে তিনি বলেন, অনেকেই আওয়ামী লীগ ছেড়ে বড় পদের আশায় অন্য জায়গায় চলে গেছেন। তারা কিন্তু কেউই ভালো নেই, কোনো ভালো জায়গায় টিকেও থাকতে পারেননি। কারণ একমাত্র আওয়ামী লীগই বঙ্গবন্ধুর আদর্শে ত্যাগের মনোভাব নিয়ে দেশের জন্য কাজ করে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকলেই যে দেশের উন্নয়ন হয় আমরা তা প্রমাণ করেছি। তাই ত্যাগের মানসিকতায় মানুষের জন্য কিছু করার লক্ষ্য নিয়েই রাজনীতি করতে হবে। দেশ ও মানুষের কল্যাণে অনেক কিছু ছাড়ও দিতে হবে।

আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট-মহাজোটের প্রার্থীদের প্রতিও ছাড় দেওয়ার মনোভাব দেখানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, আমাদের জোট-মহাজোট রয়েছে। জয়লাভের স্বার্থে তাদেরও অনেক আসনে ছাড় দিতে হবে। যারা আমাদের দলের মনোনয়ন চেয়েছেন তাদের সবাই প্রার্থী হওয়ার যোগ্য ও ত্যাগী নেতা। কিন্তু জোটকেও ছাড় দেওয়ায় অনেক যোগ্য প্রার্থী হয়তোবা বাদ পড়ে যাবেন। এক্ষেত্রে ওইসব আসনে দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী যারা থাকবেন, তাদের দলের বৃহত্তর স্বার্থে সরে দাঁড়াতে হবে। মহাজোট প্রার্থীদের পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।

আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, এবার দেখেশুনে যোগ্য, জনপ্রিয় ও জিততে সক্ষম প্রার্থীদেরই দলের মনোনয়ন দেওয়া হবে। এ-সংক্রান্ত দল ও দেশি-বিদেশি বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে জরিপ প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ও যাচাই-বাছাই করেই প্রার্থী করা হবে। জোট-মহাজোটের প্রার্থীদেরও একই প্রক্রিয়ায় মনোনয়ন দেওয়া হবে। যাকে প্রার্থী করা হবে, তার পক্ষেই দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী সবাইকে ছাড় দিতে হবে।

আবেগতাড়িত কণ্ঠে বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, আমার চাওয়া-পাওয়ার কিছু নেই। আপনাদের কাছে কখনও কিছু চাইনি। আজ চাইবো। সীমাবদ্ধতা থাকায় সবাইকে মনোনয়ন দিতে পারব না। তাই যাদের মনোনয়ন দিতে পারব না, তাদের ব্যক্তিগত লাভের হিসাব ভুলে দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে হবে, এটাই চাই। আপনারা আমার সিদ্ধান্ত না মানলে আমি আর থাকব না।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আপনারা সবাই যদি ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ না করেন, তাহলে বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচনে সবার দায়িত্ব নিতে পারব না। এবার নেত্রীকে বেটে খাওয়ালেও কাজ হবে না। মনে রাখতে হবে, আমরা আগামী নির্বাচন নিয়ে কাজ করছি না, কাজ করছি আগামী প্রজন্ম নিয়ে। তাই সেভাবেই কাজ করতে হবে।

এ সময় শেখ হাসিনা যাকেই প্রার্থী করা হোক না কেন, তা মেনে নিয়ে তার পক্ষেই কাজ করবেন কি-না, সেটিও জানতে চান দলীয় মনোয়নপ্রত্যাশীদের কাছে। সব মনোনয়নপ্রত্যাশী সমস্বরে দলীয় প্রধানের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার অঙ্গীকার করেন। একইসঙ্গে এ বিষয়ে তাদের কাছে ওয়াদা চাওয়া হলে সবাই দুই হাত তুলে আশ্বস্ত করেন প্রধানমন্ত্রীকে।

টানা দুই মেয়াদে তার সরকারের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিবরণ তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার অনেক মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এগুলো শেষ করতে ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে আওয়ামী লীগকে আবারও ক্ষমতায় আসতে হবে। কারণ বিএনপি-জামায়াত জোট আবার ক্ষমতায় আসতে পারলে এগুলো বন্ধ করে দেবে। দেশ আবারও ২০০১-০৬ এর মতো অন্ধকারে চলে যাবে। হত্যা-সন্ত্রাস-দুর্নীতি-দুঃশাসন আবার ফিরে আসবে। তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধ্বংস করে দেবে।

স্বাগত বক্তব্যে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, দল থেকে যাকেই প্রার্থী করা হবে, তার পক্ষে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে। দলীয় প্রার্থীর কেউ বিরোধিতা করলে, তিনি যত বড় নেতাই হোন না কেন, সঙ্গে সঙ্গে দল থেকে আজীবন বহিস্কার করা হবে। তাদের আর কোনোদিন দলে ঢোকার সুযোগ দেওয়া হবে না।

এর আগে সকাল থেকেই সারাদেশের নেতাকর্মীরা দলীয় প্রধানের সঙ্গে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে গণভবনে আসতে শুরু করেন। বিপুল সংখ্যক মনোনয়নপ্রত্যাশীর উপস্থিতিতে গণভবন চত্বর মুখর হয়ে ওঠে। এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রী তাদের উদ্দেশে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য রাখলে মুহুর্মুহু করতালিতে তার প্রতি সমর্থন জানান তারা। পরে সবাইকে মধ্যাহ্নভোজে আপ্যায়িত করেন প্রধানমন্ত্রী।

আজ সংসদীয় বোর্ডের বৈঠক :আওয়ামী লীগের সংসদীয় বোর্ডের বৈঠক আজ বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টায় দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার ধানমণ্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত হবে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করবেন আওয়ামী লীগ ও সংসদীয় বোর্ডের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ