প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

একাদশ জাতীয় সংসদ নিবার্চন
বিএনপির বিবাদেই আওয়ামী লীগের জয়!

যায়যায়দিন  : আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নিবার্চনকে ঘিরে রংবেরঙের ডিজিটাল ব্যানার, ফেস্টুন, পোস্টার, ডিজিটাল উন্নয়ন মঞ্চ, সভা-সমাবেশ, পথসভা, মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা, গণসংযোগ, শুভেচ্ছা বিনিময় আর সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার লিফলেট বিতরণের মাধ্যমেই নিবার্চনী উত্তাপ ছড়িয়েছে পাবনা-৪ (ঈশ্বরদী-আটঘরিয়া) নিবার্চনী এলাকায়। দুই উপজেলা মিলে দুই পৌরসভা, ১২ ইউনিয়ন। ২৯৯ ভোটার এলাকায় ১২৯টি ভোট কেন্দ্রে ৬৮৩টি ভোট কক্ষ রয়েছে। দুই উপজেলা মিলে মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৬১ হাজার ৯৮৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৮২ হাজার ৩২৬ জন এবং নারী ভোটার সংখ্যা এক লাখ ৭৯ হাজার ৬৬৩ জন।

এই আসন থেকে বতর্মান সাংসদ শামসুর রহমান শরীফ ডিলু আওয়ামী লীগের মনোনয়ন চেয়ে নিবার্চনী মাঠে রয়েছেন। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার লক্ষ্যে মাঠ গরম রেখেছেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের উপ-কমিটির সদস্য, মেগা গ্রæপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বিশিষ্ট শিল্পপতি প্রকৌশলী আব্দুল আলীম, সাবেক এমপি পাঞ্জাব বিশ্বাস, সুপ্রিম কোটের্র আইনজীবী রবিউল আলম বুদু, কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক লীগের মুক্তিযোদ্ধা-বিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম লিটন ও ডিজিএফআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) আলহাজ এএসএম নজরুল ইসলাম রবি।

এই আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন চাইবেন সাবেক সাংসদ, জেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি সিরাজুল ইসলাম সরদার, ঈশ্বরদী উপজেলা বিএনপির সভাপতি শামসুদ্দিন মালিথা, বিএনপি নেতা ও শিল্পপতি আকরাম আলী খান সঞ্জু, পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাকারিয়া পিন্টু প্রমুখ। আর জাতীয় পাটির মনোনয়নপ্রত্যাশী ঈশ্বরদী উপজেলা কমিটির সভাপতি মো. হায়দার আলী। নিবন্ধন হারানো জামায়াতে ইসলামীর পূবের্ঘাষিত প্রাথীর্ জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর আবু তালেব মÐলের নাম শোনা যাচ্ছে।

তথ্যমতে, ঈশ্বরদী ও আটঘরিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত পাবনা-৪ সংসদীয় আসন। ১৯৯১ সালে আওয়ামী লীগের হাবিবুর রহমান হাবিব ও জামায়াতের মাওলানা নাসির উদ্দিনকে হারিয়ে সংসদ সদস্য নিবাির্চত হয়েছিলেন বিএনপির সিরাজুল ইসলাম সরদার। ১৯৯৬ সালে আসনটি দখল করে আওয়ামী লীগের শামসুর রহমান শরীফ ডিলু। সেবার বিএনপির সিরাজুল ইসলাম সরদার ও জামায়াতের মাওলানা নাসির উদ্দিনকে পরাজিত করেন তিনি। এরপর একাধারে ২০০১, ২০০৮ ও ২০১৪ সালে সংসদ নিবাির্চত হন বষীর্য়ান এই রাজনীতিবিদ শামসুর রহমান শরীফ। ২০১৪ সালে অবশ্য বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় নিবাির্চত হন তিনি। বতর্মানে তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ভূমি মন্ত্রণায়ের মন্ত্রী।

স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনের অভিজ্ঞজনেরা বলছেন, শামসুর রহমান শরীফ ডিলু যে চারবার সংসদ নিবার্চনে জয়ী হয়েছেন তার জন্য দায়ী ‘বিএনপির গ্রæপ রাজনীতি’। ১৯৯৬ সালের নিবার্চনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী ছাত্রনেতা ও ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব যোগ দেন বিএনপিতে। হাবিবের যোগদানের পর থেকে হাবিব-সিরাজ দুই গ্রæপে ভাগ হয়ে যায় বিএনপি। ২০০১ সালে সিরাজ সরদার মনোনয়ন পেলে বিদ্রোহী প্রাথীর্ হন হাবিব। সেইবার হাবিব-সিরাজের দ্ব›েদ্ব গোল দেন আওয়ামী লীগের শরীফ ডিলু। ২০০৮ সালেও দল থেকে মনোনয়ন পান সিরাজ। এবার হাবিব মাঠে বিদ্রোহী না হলেও ভোটে বিদ্রোহী হয়ে দঁাড়ায় সিরাজের বিরুদ্ধে। তাতেই বাজিমাত করেন সাংসদ ডিলু।

বতর্মান সাংসদ শামসুর রহমান শরীফ ডিলুর বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে এলাকার সাধারণ মানুষ ও ত্যাগী নেতাকমীের্দর। তাদের অভিযোগ, মন্ত্রী হওয়ার পর ঈশ্বরদীতে নিজ দলের মধ্যে বিভক্তি তৈরির পেছনে তার ভূমিকা রয়েছে। পরিবারকেন্দ্রিক রাজনীতি করার চেষ্টা করছেন, দলের নেতাকমীের্দর মূল্যায়ন করতে পারেননি। সবের্শষ নিজ জামাতা ও ছেলের মধ্যে বিভাজন, হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা নিয়ে তুমুল বিতকর্ ওঠে নিজ দলের মধ্যেই। সম্প্রতি সাংসদের নিবার্চনী এলাকা ঘুরে গেছেন আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনা। এ সময় প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে মন্ত্রীর ছেলে শিরহান শরীফ তমালসহ তার ক্যাডারদের হামলার শিকার হন চারজন গণমাধ্যম কমীর্। দলের ত্যাগী নেতাদের দাবি, বয়সজনিত কারণেই তার আর নিবার্চনে না আসাই ভালো। সে লক্ষ্যেই তৃণমূল নেতারা আসনটি ধরে রাখতে নতুন প্রাথীর্, নতুন নেতৃত্ব দেখতে চাইছেন।

প্রসঙ্গ, ১৯৯১ ও ১৯৯৬ সালের নিবার্চনে শক্ত প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেছিলেন জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা নাসির উদ্দিন। পরবতীর্ ২০০১ ও ২০০৮ সালে জোটকে ছাড় দিয়ে এ আসনে জামায়াতের প্রাথীর্ প্রতিদ্ব›িদ্বতা করেননি। জামায়াতের দাবি, জয়ী হওয়ার মতো ভোট ব্যাংক থাকতেও জোটের স্বাথের্ দুইবার আসনটি ছেড়ে দিয়েছিল বিএনপিকে। কিন্তু বিএনপির ঘরোয়া দ্ব›েদ্ব মাসুল গুনতে হয়েছে জামায়াত ও জোটকে। তাই এবার আসনটি ফিরে চায় তারা। সেই লক্ষ্যে মাঠপযাের্য় প্রচারণা চালাচ্ছে জামায়াত। মাঠপযার্য় ভালো পরিচিতি ও জনপ্রিয় থাকায় এখানে জেলা জামায়াতের আমির অধ্যাপক আবু তালেব মÐল পূবের্ঘাষিত প্রাথীর্ হিসেবে প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছেন। সচেতন ভোটারদের অভিমত, নিবার্চন কমিশন ইতোমধ্যে জামায়াতে ইসলামীর নিবন্ধন বাতিল করেছেন। তবে জামায়াতে ইসলামীর ভোটগুলো বিএনপির পাত্রেই যাবে এবং আওয়ামী লীগের বিজয়ের ক্ষেত্রে ফ্যাক্টর হয়ে দঁাড়াতে পারে।

আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী বিশিষ্ট শিল্পপতি প্রকৌশলী আব্দুল আলীম বলেন, জননেত্রীর নিদেির্শত শতর্গুলো পুরোপুরি পূরণ করতে সক্ষম হয়েছেন। দলীয় সকল কমর্কাÐ চালিয়ে যাচ্ছেন। ইতোমধ্যে সহস্রাধিক উঠান বৈঠক করেছেন। গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ, পথসভা, সরকারের উন্নয়ন অগ্রযাত্রার প্রচারপত্র বিলিসহ নিবার্চনী মাঠে সক্রিয় অবস্থানে রয়েছেন। সেক্ষেত্রে এ আসনে তিনি মনোনয়নপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে শতভাগ আশাবাদী। এমপি নিবাির্চত হলে তিনি এ অঞ্চলে চলমান উন্নয়ন ধারা অব্যাহত রাখা, ঈশ্বরদীতে ইকোপাকর্ ও খেলার মাঠ তৈরি করা, বেকার সমস্যা সমাধানে নতুন নতুন শিল্প-কলকারখানা স্থাপনে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি উদ্যোগীদের উৎসাহিত করবেন।

সাবেক সাংসদ পাঞ্জাব আলী বলেন, দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশা করছেন। এ লক্ষ্য নিয়েই নিবার্চনী এলাকার পাড়া- মহল্লায় গণসংযোগ, উঠান বৈঠক, সভা-সমাবেশ করছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের ১০ বছরের উন্নয়ন অগ্রযাত্রা জনসন্মুখে উপস্থাপন করছেন। নৌকার ভোট চেয়ে নিবার্চনী সকল কাযর্ক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। দল তাকে মনোনয়ন দিলে জনগণের স্বতঃস্ফূতর্ ভোটে নৌকা প্রতীকের বিজয় নিশ্চিত। তিনি বলেন, আসন্ন নিবার্চনে তাকে দল মনোনয়ন যদি না দেয়, সেক্ষেত্রে দল যাকে দেবে, তার হয়েই নৌকার বিজয়ে কাজ করে যাবেন। জনগণকে ভালোবাসেন। জনগণের সাথেই থাকবেন। তাই দল তার আওয়ামী লীগ, প্রতীক তার নৌকা। ভোট হবে ব্যক্তি নয়, প্রতীকে।

ঈশ্বরদী উপজেলা বিএনপির সভাপতি শামসুদ্দিন মালিথা বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী। তিনি বলেন, তার প্রচার দলীয় কমর্সূচির মধ্যে। ব্যক্তিগত নয়। তিনি বিশ্বাস করেন যারা উপর উপর গণসংযোগ করছেন, তারা কেউ দলকে ভালোবাসেন না। বিগত দিনগুলোয় বুক পেতে দিয়ে দলের নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। সবসময় পুলিশ প্রশাসনের বাধা উপেক্ষা করে জীবনবাজি রেখে দলীয় কমর্কাÐ পরিচালিত করছেন। নিবার্চনী এলাকাতে শান্তিপূণর্ভাবে ২০ দলীয় সমন্বয়ক হিসেবে কাজ করছেন। দাশুড়িয়া মোড়ে বেগম খালেদা জিয়ার সফল জনসভা করেছেন। সবদিক বিবেচনা করে দল তাকে মনোনয়ন দেবেন এমন শতভাগ আশাবাদী তিনি। স্থানীয় নেতাকমীর্রা তারা সবাই ঐক্যবদ্ধ। তবে যারা এলাকায় না থেকে মনোনয়ন দাবি করেন তাদের সাথে দলের ত্যাগী নেতাদের মতপাথর্ক্য থাকতেই পারে। সে দিকেও কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ দৃষ্টি দেবেন এমন বিশ্বাস রয়েছে।

ঈশ্বরদী পৌর বিএনপির সম্পাদক মো. জাকারিয়া পিন্টু বলেন, দল তৃণমূলের সিদ্ধান্ত প্রাধান্য দিলে দলীয় মনোনয়ন তার প্রাপ্য। ১০ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে সবসময় সামনে থেকে রাজনীতি করছেন। বিগত উপজেলা নিবার্চনে দল তাকে মনোনয়ন দেয়নি। নিজের গ্রহণযোগ্যতায় তিনি স্বতন্ত্র প্রাথীর্ হয়ে দলীয় প্রাথীর্র চেয়ে দ্বিগুণ ভোট পেয়েছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার তার বিজয় ছিনিয়ে নিয়েছে। এবারের নিবার্চনে শান্তিপূণর্ ভোট হলে ধানের শীষের বিজয় হবে নিশ্চিত।

বিশিষ্ট শিল্পপতি আকরাম আলী খান সঞ্জু আসন্ন নিবার্চনে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী। দীঘির্দন ধরেই তিনি এলাকায় সাংগঠনিক কমর্কাÐ চালিয়ে যাচ্ছেন। যোগ্য ও দলের জন্য নিবেদিতপ্রাণ হিসেবে এবং বিএনপির ঘঁাটি খ্যাত এই আসনটি পুনরুদ্ধারে মনোনয়নের ক্ষেত্রে তাকেই বিবেচনায় রাখবেন এমন কথাই মুঠোফোনে জানান। তিনি বলেন, দলীয় মনোনয়ন পেয়ে সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় যদি এমপি হতে পারেন, তাহলে এই আসন হবে যুগোপযোগী মডেল। শিক্ষা, চিকিৎসা, কমর্সংস্থানসহ সব ক্ষেত্রে থাকবে একধাপ এগিয়ে। সাধারণ মানুষের যে সকল চাহিদা, যা এই আসনকেন্দ্রিক নেই, সেসকল দাবি অবশ্যই পূরণ করা হবে, এটা তার নৈতিক দায়িত্ব।

এ আসন থেকে ঈশ্বরদী উপজেলা জাতীয় পাটির সভাপতি মো. হায়দার আলী দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশার কথা জানিয়ে বলেন, জাতীয় পাটির চেয়ারম্যান আলহাজ হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ তাকে এই আসনে তিনবার মনোনয়ন দিয়েছেন। কিন্তু মহাজোটের সিদ্ধান্তের বাইরে যেতে পারেনি তার দল বা তিনি। আসন্ন নিবার্চনেও মনোনয়ন প্রাপ্তি নিশ্চিত বলতে পারেন। তিনি বলেন, মনোনয়ন পেয়ে জোটগতভাবে নিবার্চন করে এলাকার উন্নয়ন, শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিতসহ সাবির্ক উন্নয়নের অংশীদার হতে চান।

চারদলীয় মহাজোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামীর প্রাথীর্ আবু তালেব মÐলের সাথে তার মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি। ফলে তাদের প্রাথীর্র কোনো মতামত নেয়া সম্ভব হয়নি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত