প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দুর্ধর্ষ এক ভাড়াটে খুনির থানায় যাতায়াত!

সমকাল :  দক্ষ রাজমিস্ত্রি হিসেবেই মিরপুর, ভাসানটেক ও কাফরুল এলাকার মানুষজন চিনতেন তাকে। নতুন বাসাবাড়ি তৈরির কাজ হলেই ডাক পড়ত তার। গত পাঁচ বছরে রাজমিস্ত্রি হিসেবে নিয়মিত যাতায়াত ছিল তার কাফরুল থানায়ও। থানার ভবনসহ সেখানকার নানা স্থাপনা তৈরির কাজে অংশ নেয় সে। তবে এই পরিচয়ের আড়ালে তার ছিল আরও এক ভয়ঙ্কর পরিচয়- দুর্ধর্ষ ভাড়াটে কিলার সে!

গত এক মাসে মিরপুরে পরপর দুই ব্যবসায়ীসহ তিনজনকে হত্যা ও আরও দু’জনকে চাকু দিয়ে হত্যাচেষ্টার পর প্রযুক্তিগত তদন্তে এ চক্রের সাত সদস্যকে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের একজন হলো রাজমিস্ত্রির আড়ালে ভয়ঙ্কর কিলার ইয়াকুব আলী বাবু (২৭)। এ হত্যা চক্রে তার জড়িত থাকার তথ্য উঠে আসার পর বিস্মিত হন তদন্ত সংশ্নিষ্ট পুলিশ সদস্যরা- কীভাবে একজন ভাড়াটে খুনি সব জায়গায় স্বাভাবিকভাবে যাতায়াত করত, এমনকি থানায়ও!

দীর্ঘদিন ধরে কাফরুলের দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী শাহিন শিকদারের সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে কাজ করত বাবু। ব্যবসায়ীদের কাছে ফোনে চাঁদা দাবি করত সে ও তার সাঙ্গোপাঙ্গরা। চাঁদা না দিলে ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে হত্যা করত তারা। এরই মধ্যে ইনটেরিয়র ব্যবসায়ী মিজানুর রহমান ও শাহজাহান রুবেল হত্যার সঙ্গে বাবুর সরাসরি জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। ওই এলাকার মোট চার ব্যবসায়ীকে হত্যা করতে ৮০ হাজার চুক্তি হয় শাহিন শিকদারের সঙ্গে। গত রোববার বাবুকে পাবনার আটঘরিয়া ও তার সহযোগী রুবেলকে মিরপুর থেকে গ্রেফতার করা হয়। এরপর দুই ব্যবসায়ীকে হত্যার দায় স্বীকার করে বাবু-রুবেলসহ সাতজন। ১৬৪ ধারায় তারা জবানবন্দি দেয় আদালতে।

মিরপুর বিভাগের পুলিশের এক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, মূলত মিরপুর, কাফরুল ও ভাষানটেক এলাকার বিভিন্ন ব্যবসায়ীর মোবাইল নম্বর সংগ্রহ করে রাজমিস্ত্রি বাবুর হাতে দিত মো. রুবেল। এরপর টার্গেট করা ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কত টাকা চ?াঁদা দাবি করা যায়, তা নিয়ে পরামর্শ করত সন্ত্রাসী শাহিন শিকদারের সঙ্গে। গ্রিন সিগন্যাল পাওয়ার পর কখনও শাহিনের পরিচয়ে, আবার কখনও ভিন্ন ভিন্ন নামে চাঁদা দাবি করত বাবু। চাঁদা না দিলে ব্যবসায়ীদের কাছে কাফনের কাপড় পাঠানোর কথা বলে হুমকিও দিত। আবার চাঁদা দিতে রাজি হলে তা নিজেই সংগ্রহ করত।

তদন্ত সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, ১৩ অক্টোবর রাতে কাফরুলে নিজ বাসার সামনে পিঠে চাকু মেরে হত্যা করা হয় ইনটেরিয়র ব্যবসায়ী মিজানুর রহমানকে। ওই ঘটনার তদন্ত করতে গিয়ে সিসিটিভির ফুটেজ পরীক্ষার মধ্য দিয়ে প্রথম বেরিয়ে আসে- ঘটনাস্থলের অদূরে ফোনে কথা বলছে এক যুবক। হত্যাকাণ্ডের কিছু সময় আগে ওই যুবকসহ তিনজন তাড়াহুড়ো করে একটি যানবাহন থেকে নামতে থাকে। এরপর টার্গেট করা ব্যক্তির বাসার অদূরে গিয়ে তাদের মধ্যে একজনকে দেওয়া হয় একটি চাকু। ওই চাকু দিয়েই হত্যা করা হয় ব্যবসায়ী মিজানুরকে। এরপর ৩১ অক্টোবর রাতে কাফরুলের ইব্রাহিমপুর এলাকায় শাহজাহান রুবেল নামে আরেক ব্যবসায়ীকে চাকু দিয়ে হত্যা করে একই চক্র। এ দুই হত্যা মিশনে জড়িত ছিল বাবু, মো. রুবেল, সুমন, হাবিব, সুরুজ, হামিদ ও মিশু রুবেল।

তদন্ত সূত্রে জানা গেছে, দুই ব্যবসায়ীকে হত্যা ছাড়াও কচুক্ষেত এলাকার আরেক ব্যবসায়ী তাজুল ইসলাম ও মোস্তাফিজুর রহমানকে চাকু মেরে হত্যার চেষ্টা চালায় তারা। তাদের টার্গেটে ছিলেন স্থানীয় আরও একজন জুয়েলারি ব্যবসায়ী ও চালের আড়তের মালিক। ওই দু’জনকে হত্যার করতে তারা একাধিকবার রেকি করে। তাদের ছবি সংগ্রহ করে মোবাইলে রাখা হয়। এরই মধ্যে টার্গেট করা দুই ব্যবসায়ীকে সতর্কও করে পুলিশ।

মিরপুর বিভাগের ডিসি মাসুদ আহম্মেদ বলেন, ‘চাঁদাবাজ চক্রের যারা মিরপুরে সক্রিয়, তাদের প্রায় সবাইকে এরই মধ্যে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। যারা বাকি আছে, তাদেরও শিগগিরই গ্রেফতার করা হবে।’

পুলিশের মিরপুর জোনের সহকারী কমিশনার সৈয়দ মামুন মোস্তফা বলেন, ‘পেশায় রাজমিস্ত্রি হলেও বাবু একজন পেশাদার চাঁদাবাজ। দুই ব্যবসায়ী হত্যায় সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল সে।’

পুলিশের অন্য এক কর্মকর্তা জানান, মিরপুরে চাঁদাবাজ এ চক্রের অনেক সদস্যের বাহ্যিক পেশা রাজমিস্ত্রি, স্যানিটারি ও ইলেকট্রিক মিস্ত্রি। তারা প্রায় সবাই নেশাগ্রস্ত। এক হাজার টাকায়ও মানুষ খুন করতে দ্বিধা করবে না তারা। তাই খুব পরিচিত ও ভালোভাবে চেনাজানা ছাড়া কাউকে কাজের জন্য ফ্ল্যাটে ঢোকানো ঠিক হবে না।  সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ