প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অ্যা জার্নি বাই সুনেরাহ

প্রিয়.কম : লক্ষ্য ছিল চলচ্চিত্রের নায়িকা হওয়ার। চলাটা কঠিন হবে জেনেই সে পথেই এগিয়েছেন মন্থর গতিতে, ধৈর্য্য নিয়ে। বেশ কিছু বাধা পেরিয়ে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যেও পৌঁছেছেন মডেল থেকে অভিনেত্রী হতে যাওয়া সুনেরাহ বিনতে কামাল। অভিনয় করছেন সার্ফিং নিয়ে নির্মিত ‘ফ্রি’ ছবিতে। আর এর মধ্য দিয়েই চলচ্চিত্রে অভিষেক হয়েছে তার।

সম্প্রতি রাজধানীর ধানমন্ডির একটি রেস্তারাঁয় মুখোমুখি হয়েছিলেন এই মডেল ও অভিনেত্রী। সে সময় প্রায় দুই ঘণ্টার আলাপে তিনি শৈশব, কৈশোর, পেশাজীবন ও ছবিতে অভিনয়ে আগ্রহী হওয়াসহ প্রাসঙ্গিক বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন।

আলাপের শুরুতে সুনেরাহ জানান, তার বয়স যখন আড়াই, তখন থেকেই নাচ শিখতে শুরু করেন। সেটা ধ্রুপদী নৃত্য। এরপর বুলবুল একাডেমি অব ফাইন আর্টসের (বাফা) খিলগাঁও শাখাতে ভর্তি হন। পাশাপাশি থিয়েটারও করেছেন। সে অভিজ্ঞতাটা তার জন্য বেশ দারুণ ছিল।

সুনেরাহর মা গান গাইতেন। এ কারণে সাংস্কৃতিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের প্রতি তার বরাবরই আগ্রহ বেশি ছিল। মা চেয়েছেন, সুনেরাহও যেন তার মতোই হয়। এ ছাড়া সুনেরাহর বাবাও তাকে সবসময় সমর্থন দিয়েছেন।

‘আমি স্কলাসটিকায় পড়েছি। ওই জীবনটা বেশ সুন্দর ছিল। আমি এর বাইরে কিছু বুঝতাম না, কাউকে চিনতাম না। ওটা আমার আলাদা একটা জগৎ ছিল’, বলেন সুনেরাহ।

পড়াশোনার পাশাপাশি একটা সময় গিয়ে শখ থেকেই মডেলিং শুরু করেন সুনেরাহ। এরপর বিরতি। পড়াশোনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। সে সময় তিনি আর কোনো কাজ করেননি। এ নিয়ে সুনেরাহর ভাষ্য, ‘নিজের কাছেই মনে হয়েছিল একটা বিরতিতে যাওয়া দরকার।’

অনেকটা সময় পর ফের মডেলিংয়ে ফিরেন সুনেরাহ। তখন বেশ ভালো করছিলেন তিনি। একটা সময় গিয়ে দেখলেন, বাংলাদেশে সব দামি প্রতিষ্ঠানের মডেল হিসেবেও কাজ করা শেষ। এ নিয়ে তিনি বলেন, ‘এটা আমার জীবনের বড় একটা অ্যাচিভমেন্ট বলে মনে করি।’

সুনেরাহ পেশাগত জীবনে ফ্যাশন ব্র্যান্ড এক্সটেসিতে ইন হাউজ স্টাইল অ্যাপারেল ম্যানেজার হিসেবে কাজ শুরু করেন। সেখানকার গণমাধ্যমসংক্রান্ত বিষয়গুলোও দেখতেন তিনি। কোনো শুটের থিম, মডেল সিলেকশন, ফ্যাশন ডিরেকশন ছাড়াও উইমেন সেকশনের ডিজাইনিং থেকে শুরু করে প্রোডাকশনটাও তিনি দেখতেন।

‘সম্প্রতি আমি চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি। আমি আমার প্রতিষ্ঠানের কাছে ছবিটি করার জন্য দুই মাসের সময় চেয়েছিলাম। শুটিং শুরু করি করি করে সাত মাস চলে গেছে। আমি আমার প্রতিষ্ঠানের সাথে অপেশাদার আচারণ করতে পারব না।’

‘আমার জন্য কোম্পানি কেন সাফার করবে? আমি যদি ঠিকমতো কাজ না করি, আমি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কেন টাকা নেব? তারপরও প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার আমাকে আরও সময় দিতে চেয়েছিলেন’, বলেন সুনেরাহ।

‘কিন্তু আমার কাছেই এভাবে চলাটা ভালো লাগছিল না। আমি যখন যে কাজটা করি, সেটা আমি দায়িত্ব নিয়েই করি। এটা আমার অভ্যাস। আমি যেখানে ঠিকমতো কাজ করতে পারছি না, বেতন ঠিকই নিচ্ছি, অফিসে থেকে কাজ করা আর দূরে থেকে করা ভিন্ন বিষয়’, যোগ করেন তিনি।

চলতি বছরের মার্চের দিকে হঠাৎ করেই একটি মাধ্যমে ‘ফ্রি’ ছবির নির্মাতা তানিম রহমান অংশুর সঙ্গে সুনেরাহর পরিচয় হয়। এরপর চলচ্চিত্রে অভিনয়ের বিষয়ে আলাপ-আলোচনা হয়। একটা সময় গিয়ে মনস্থির করেন, তিনি ছবিটিতে অভিনয় করবেন। পরে এতে চুক্তিবদ্ধ হন।

‘ছবিটিতে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার কিছুদিন পরেই আমাকে কক্সবাজার পাঠিয়ে দেওয়া হয়। আড়াই মাস ছিলাম। মাঝখানে এক মাসের মাথায় ঢাকা আসছিলাম। এই অভিজ্ঞতাটা আমার জীবনকে নতুন করে দেখতে ও বুঝতে শিখিয়েছে’, বলেন সুনেরাহ।
মুক্তি প্রতীক্ষিত ছবির গল্পে দেশের প্রথম নারী সার্ফার নাসিমার জীবনের কিছু অংশ থাকবে। এই নাসিমার চরিত্রেই দেখা যাবে সুনেরাহকে।

তিনি বলেন, ‘সে যখন রেগে যায়, তখন সে অনেক রুড। আর যখন নরম সে অনেক নরম। চিত্রনাট্য পড়ার পর মনে হচ্ছে চরিত্রটা তো আমি। ডায়লগ থ্রো থেকে শুরু করে সবকিছুতেই মনে হয়েছে ওই চরিত্রটাই আমি। চিত্রনাট্যটা ধরার পর আমার মনে হইছে আমি ওটা ছাড়ব না।’

চলচ্চিত্রে অভিনয়ের আগ্রহ নিয়ে সুনেরাহ বলেন, ‘আমি যখন ম্যাচিউর হয়েছি, তখন থেকেই সিনেমায় অভিনয়ের প্রতি আমার আগ্রহ ছিল। কিন্তু এ ছবিতে অভিনয়ের আগে আমি কোনো নাটক কিংবা ফিল্মে অভিনয় করিনি। কারণ আমার মনে হয়েছে আমাকে যদি দর্শক রেগুলার টিভিতে দেখতেই পায়, তাহলে তারা কেন প্রেক্ষাগৃহে গিয়ে আমাকে দেখবে?’

সুনেরাহর পছন্দের অভিনয়শিল্পী হলেন বলিউড অভিনেত্রী প্রিয়াঙ্কা চোপড়া। তার অভিনয় ও ব্যক্তিত্ব তাকে মুগ্ধ করে।

‘যতই দিন যাচ্ছে আমি ইমপ্রেসড হচ্ছি। ওর প্রতি না, অদ্ভুত একটা ভালো লাগা তৈরি হয়েছে, নিজেও বিস্মিত’, বলেন সুনেরাহ।

কয়েকটি ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব পেলেও সেগুলো করা হয়নি বলে আলাপে জানান সুনেরাহ। কারণ চিত্রনাট্য তার পছন্দ হচ্ছিল না। ‘আমি সবসময় চেয়েছি, আমি এমন একটা ফিল্মে অভিনয় করব যেটা দর্শকের হৃদয়কে স্পর্শ করে যাবে’, বলেন মুক্তি প্রতীক্ষিত ছবির নায়িকা।

তিনি আরও বলেন, ‘আমার এ ছবির চিত্রনাট্যটা অনেকটা কমার্শিয়াল টাইপের। অংশু (ছবির নির্মাতা তানিম রহমান অংশু) ভাই যাই নির্মাণ করুক না কেন, তা ডিফরেন্ট হয়; যার কারণে কাজটি করার প্রতি এক ধরনের আগ্রহ ছিল। যে কেউ বানালেই করতাম, এটাও একটা কারণ।’

‘অভিনয়ের জার্নিটা কঠিন’

লক্ষ্যের যখন কাছাকাছি পৌঁছেছেন সুনেরাহ, তখনই বুঝতে পারেন তাকে আরও বন্ধুর পথ পাড়ি দিতে হবে। এ নিয়ে তিনি বলেন,‘আমার জন্য ছবিতে অভিনয়ের জার্নিটা বেশ কঠিন ছিল। কারণ আমি বাসার রুম আর অফিস থেকে খুব বেশি দূরে থাকতে পারি না।’

‘আমি দেশের বাইরে যাওয়ার আগেও এতটা কাঁদি নাই। আমি দেশের বাইরে গেলেও সাত কিংবা ১০ দিন থেকেছি। তারপরও আমি পারি না। দেশ জানি না, তবে ঢাকা ছাড়া আমি বাঁচতে পারি না।’

সার্ফিং বিষয়ে প্রশিক্ষণের জন্য কক্সবাজারে গিয়ে প্রায় আড়াই মাস সময় নিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। সার্ফাররা কীভাবে চুল বাঁধে, ড্রেস পরে, সব ওইভাবেই করছেন। প্রথম, দ্বিতীয় কিংবা তৃতীয় নয়, চতুর্থবারে গিয়ে স্ট্যান্ডের ওপর দাঁড়াতে পেরেছেন সুনেরাহ।

প্রথমে বেশ কিছুদিন কষ্ট হলেও একটা সময় গিয়ে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছেন মন্তব্য করে সুনেরাহ বলেন, ‘সমুদ্রে গেলে পরিবার, বন্ধু কিছুই মনে থাকে না। ওইটা আরেকটা হ্যাভেন (স্বর্গ)। কিন্তু সমস্যা যেটা হয়েছে, আমি কয়েকটা দিন যাওয়ার পর অনেক কালো হয়ে গিয়েছিলাম। প্রতিদিন সার্ফিং করতাম যদি ওয়েদার খারাপ না থাকত।’

ছবির চিত্রনাট্য লিখেছেন কলকাতার শ্যামল সেনগুপ্ত, যার কলম ঘুরে উঠে এসেছে ‘বুনোহাঁস’ ও ‘পিঙ্ক’ চলচ্চিত্রের মতো গল্প।

সুনেরাহ জানান, এর মধ্যে একদিন তার ট্রেইনার সিলেট ঘুরতে গিয়েছেন। তিনি তার সহশিল্পী রাজের ট্রেইনারকে বললেন, তাকে সমুদ্রে নিয়ে গিয়ে দিক নির্দেশনা দেওয়ার জন্য। কিন্তু তিনি শুরুতেই তাকে না বলে দিয়েছেন। এরপর বোট নিয়ে তিনি একা একা চলে গেছেন, অনেকটা দূরে। বিপদ যে সন্নিকটে, সেটা শুরুতেই বুঝতে পারেননি তিনি।

‘হঠাৎ করেই একটা ঢেউ আসছে। আমি পিছন ঘুরে ছিলাম। খেয়ালে করিনি। আমার বোটটা উল্টে গেল। বোটের সাথে তো একটা লিস থাকে, ওটা পায়ে বাঁধা থাকে, যাতে লিসটা টেনে বোটে ওঠা যায়। আমি ভাবলাম রিপ কারেন্টটা যাক, এরপর আমি লিসটা টেনে উঠে যাব। তারপর যখন দেখছি শ্বাস টানতে পারছি না, তখন যখন লিসটা ধরতে গেছি, দেখি বোট নাই’, বলেন সুনেরাহ।

‘এরপর দেখি বোট কিনারের দিকে চলে যাচ্ছে। আমার শ্বাস নিতে যে কষ্ট হচ্ছে, রাজ সেটা দূর থেকে দেখতে পাইছে। ও দেখে নূর মোহাম্মদকে বলছে। ওরা কিন্তু ওখানকার লাইফ গার্ডও। ওখানে সেখান থেকেই সাঁতরিয়ে এসেছে। এরপর যখন দেখছিল আমি আর পারতেছি না, তখন ও ওর বোটটা ছুঁড়ে মারছে। সেটা আমার মাথায় এসে বাড়ি খায়, ব্যথাও পেয়েছি’, যোগ করেন সুনেরাহ।

চলচ্চিত্রটির শুটিং শেষ হওয়ার পর যদি সুনেরাহর মনে হয় ফের মডেলিংয়ে ফেরা উচিত, তাহলে তিনি তার আগের প্রতিষ্ঠানেই ফিরে যাবেন, মডেল হিসেবে কাজ শুরু করবেন। আর চাকরি যদি খণ্ডকালীন হয়, তাতেও তার কোনো সমস্যা নাই। কারণ তিনি প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধারকে এ কথা বলেছেন পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার সময়।

অবসরে গান শুনতে ও সিনেমা দেখতে পছন্দ করেন সুনেরাহ। কিছুদিন ধরে র‌্যাপ সং শোনা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছে।

সুনেরাহ বলেন, ‘আমি মানুষ অবজারভ করতে পছন্দ করি। আমি যেভাবে দেখি, ওভাবে আরেকজন দেখে না। আমার ওটা দেখতেই ভালো লাগে যে, আরেকজন কীভাবে দেখে। আমার হিউমেন নেচার স্টাডি করতে ভালো লাগে।’

কখনো যদি চাওয়া-পাওয়ায় ব্যঘাত ঘটে তাতে মন খারাপ হয় না সুনেরাহ। এ নিয়ে তার বক্তব্য, ‘আমি কখনো কারো কাছ থেকে কিছু এক্সপেক্ট (আশা) করি না। আমার যদি কোনো চাওয়া পূরণ হয়, তাহলে আমি হ্যাপি হই; না হলে কষ্ট লাগে না। এটা আমার ভালো একটা গুণ।’