প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘দ্য ইকোনমিস্টে’র উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যাচার

বাংলা ট্রিবিউন : ‘নির্বাচনকে সামনে রেখে নমনীয় হচ্ছে বাংলাদেশের ক্ষমতাসীন দল’ শিরোনামে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর এশিয়া সংস্করণে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়েছে গত ৮ নভেম্বর। এই প্রতিবেদনের একটি অংশে বলা হয়েছে— ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধুমাত্র তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধেই চড়াও হননি, বরং আরও অনেক শত্রু তৈরি করেছেন। শেখ হাসিনা তার নৈতিক অবস্থান হারিয়েছেন।’ প্রতিবেদনের আরেকটি অংশে বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার দশক পর আওয়ামী লীগ সংবিধান পরিবর্তন করে শেখ হাসিনার বাবার বিরোধিতা করা ব্যক্তিদের বিচার করছে।’

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনের এই দুটি অংশসহ পুরো বিষয়ের প্রতিক্রিয়ায় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রতিবেদনটিতে যদিও আওয়ামী লীগের উন্নয়নের কথা বলা হয়েছে, কিন্তু এর কিছু অংশে দেওয়া তথ্য সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যমূলক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিক বলেন, ‘যেকোনও হত্যাকাণ্ডের বিচার হবে। এটা সংবিধানের মৌলিক বিষয়। সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করা। সেখানে যদি সাধারণ কাউকেও হত্যা করা হয়, সেটারও বিচার হতে হবে। আর জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হত্যার বিচার করা যাবে না, এই যে ইনডেমনিটি নামে কালো আইন করা হয়েছিল, সেটা ছিল সংবিধানবিরোধী। এটা সংবিধানকে কলঙ্কিত করেছে।’ তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসে সেই সংবিধানকে কলঙ্কমুক্ত করেছেন। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের বিচারের মাধ্যমে দেশে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার একটা সংস্কৃতি চালু করেছেন। বিচারহীনতার অপসংস্কৃতি দমন করেছেন। সংবিধানকে সমুন্নত রেখেই তিনি এটা করেছেন। বিদেশি পত্র-পত্রিকায় কী লিখলো সেটাতো বড় কথা নয়, আমরা এই দেশের নাগরিক হিসেবে কীভাবে দেখছি, সেটা হচ্ছে বিষয়। অন্যায় করলে বিচার হবে। তারা আবার এটাও বলেছে যে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশের অগ্রগতি অভাবনীয় এবং পুরো এশিয়া অঞ্চলে বাংলাদেশ উন্নয়নের সূচকে এগিয়ে আছে।’

জানতে চাইলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর (ভিসি) অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর বিরোধীতাকারীদের বিচার করা হয়নি। বিচার করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের। এজন্য সংবিধানও পরিবর্তন করা হয়নি। কোনও ট্রাইবুনালও করা হয়নি। দেশের প্রচলিত আইনেই তাদের বিচার করা হয়েছে। এসব রিপোর্ট আমাদের দেশের কিছু সংস্থা ও সুশীল নামের ব্যক্তি আছেন যারা তৈরি করে তাদের দেন। যে রিপোর্টের সঙ্গে বাস্তবের কোনও মিল নেই। এসব রিপোর্ট উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই করা হয়েছে বলে আমি মনে করি।’

দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনের বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, ‘এই রিপোর্ট যিনি লিখেছেন তিনি হয়তো আসল বিষয়টি জানেন না। এসব তথ্যের কোনও সত্যতা নেই। যারা এই তথ্য দিয়েছে তারা ভুল তথ্য দিয়েছে। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার করা যাবে না বলে যে আইন করা হয়েছিল সেটা ছিল সংবিধানপরিপন্থী। ইনডেমনিটি আইন করে হত্যাকারীদের বিচার রহিত করেছিল, সেই আইন বাতিল করে বিচারকাজ শুরু করা হয়েছিল।’

তিনি বলেন, ‘হত্যাকাণ্ডের ঘটনার বিচার করা যাবে না— বিশ্বের কোনও দেশেই এমন আইন করার নজির নেই। এটা তো চরম একটা অসভ্যতা ও বর্বরতার কাজ করা হয়েছিল। যে জাতির পিতার হত্যাকারীদের বিচারের আওতায় না এনে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। আইন করে বিচার বন্ধ করা হয়েছিল। এই বিচারকাজ করে জাতিকে কলঙ্গমুক্ত করা হয়েছে। জাতিকে দায়মুক্ত করা হয়েছে।’

আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় এই নেতা বলেন, ‘যারা এ ধরনের রিপোর্ট লিখে থাকেন তারা হয়তো না বুঝে করেন, না হয় কারও পক্ষ হয়ে উদ্দেশ্যমূলকভাবে লেখেন।’ এ ধরনের প্রতিবেদন সাংবাদিকতার নীতিতে পড়ে কিনা, সেটাও ভাবার বিষয় বলে মন্তব্য করেন মাহবুবউল আলম হানিফ।

ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনের শেষ অংশে বলা হয়, “প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শুধুমাত্র তার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীর বিরুদ্ধেই চড়াও হননি, বরং আরও অনেক শত্রু তৈরি করেছেন। একটি জনবহুল রেস্তোরাঁয় ফিসফিস করে মধ্যবয়সী এক লেখক বলেন, ‘শেখ হাসিনা তার নৈতিক অবস্থান হারিয়েছেন।’ এতে করে বোঝা যায় সমাজে বিষয়টি নিয়ে কী পরিমাণ আতঙ্ক বিরাজ করছে।

‘বাংলাদেশের স্বাধীনতার চার দশক পর আওয়ামী লীগ সংবিধান পরিবর্তন করে তার বাবা বঙ্গবন্ধুর বিরোধিতাকারীদের বিচার করছে। মে মাস থেকে মাদকচক্রের সদস্যদের ওপর সরাসরি গুলি করার অনুমতি দেওয় হয়েছে পুলিশকে। বিচারবহির্ভূত এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন এখন পর্যন্ত ২৬৪ জন। আগস্টে যখন নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীরা রাজপথে আন্দোলন করছিল, তখন তাদের দমনে দলীয় ‘গুণ্ডাদের পাঠিয়েছিল আওয়ামী লীগ। যখন একজন বিশিষ্ট ফটোসাংবাদিক তাদের পক্ষ নিয়ে কথা বলেন তখন তাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় সন্ত্রাসবিরোধী বাহিনী।

“শেখ হাসিনা সেই আলোকচিত্রীকে মানসিকভাবে অসুস্থ বলে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ওই আলোকচিত্রীর চাচা একজন পাকিস্তানি মন্ত্রী ছিলেন। ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কখনও রক্ত কথা বলে, বুঝতেই পারছেন।’

‘তবে আওয়ামী লীগের শুধু এই দমন-পীড়নের ওপর ভরসা না করলেও হতো। তার সময়কালে অর্থনীতির অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। গত বছর জিডিপি ছিল ৭ দশমিক ৩ শতাংশ যা ভারত ও পাকিস্তানের চেয়েও দ্রুতগামী। মতামত জরিপে সরকারের প্রতি সস্তোষজনক ফলাফলই পাওয়া গেছে। একদশকের এই সময়ে আনুগত্য এসেছে পুলিশ ও সেনা কর্মকর্তাদের মাঝেও। আর ৭১ বছর বয়স হলেও এখনও নেতৃত্বে সক্ষম শেখ হাসিনা। পরিবর্তন আনতেও পিছপা হন না তিনি। নিজেদের সেক্যুলার ভাবধারা থেকে বেরিয়ে এসে হেফাজতে ইসলামের সমর্থন পেয়েছে দলটি।

‘প্রশ্ন হচ্ছে তিনি কি এখন এসব সুবিধাকে পক্ষে নিয়ে গণতন্ত্রকে সাধারণ প্রবাহে চলতে দিবেন, নাকি এই ধারাকে পরিবর্তন করতে চান তিনি।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত