প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পুরুষের পৃথিবী চাই না, আমি ‘পুরুষ মানুষ’ চাই : আসমা আক্তার

মো: মারুফুল আলম: নাট্যকার ও নির্দেশক আসমা আক্তার লিজা বলেছেন, ‘পুরুষ মানুষ’, যে আমার প্রতিদ্ব›দ্বী না, যে আমার প্রতিবেশি, যে আমার সহযাত্রি, সহকর্মী, সহমর্মী। যে আমার কষ্টে কষ্ট পায়। যে আমাকে মানুষ ভাবে। এটা ভাবে না যে, মেয়ে মানুষ একটি শরীর ভোগের বস্তু। ‘পুরুষ’ এবং ‘পুরুষ মানুষ’ সম্পর্কে নাটকে বলেছি, আমি পুরুষের এ সমাজে পৃথিবী চাই না, আমি ‘পুরুষ মানুষ’ চাই। বুধবার বিবিসির সঙ্গে এক সাক্ষাতকারে তিনি এ কথা বলেন।

তিনি বলেন, পুরুষ হচ্ছে কাম বোঝে কিন্তু প্রেম বোঝে না, নারীর শরীর বোঝে কিন্তু মন বোঝে না। আর ‘পুরুষ মানুষ’, “সত্যতো! পুরুষের ভেতর মানুষ আছেতো! পুরুষ মানুষ তারে আমার বড় মনে চায়, সে স্বপনেতে আসে আমার স্বপনেতে যায়, সে আমারে পবনে ভাসায়, আমারে ছোঁয়ে যখন ছায়ায় কায়ায় বোঝা বড় দায়, শিমুল তুলা নাকি পাখির পালক, ভাসতে থাকি আমি হাওয়ায় হাওয়ায়”।

প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের নারীরা যখন ‘মি ট’ু আন্দোলনে শরীক হয়ে তাদের উপর একের পর এক যৌন নিপীড়নের কাহিনী প্রকাশ করতে শুরু করেছেন, তখন বাংলাদেশেরই একটি নাট্যগোষ্ঠী লন্ডনে এক উৎসবে মঞ্চস্থ করেছে একই ধরণের বার্তা নিয়ে নাটক ‘নারী ও রাক্ষসী’।
‘মি টু’ মুভমেন্টের সাথে এই নাটকের মিল রেখে সচেতনভাবেই নাটকের চরিত্রগুলো আনা হয়েছে’ এ প্রসঙ্গে লিজা বলেন, এটাই ‘মি টু’ মুভমেন্ট। আমি ধর্ষিতা হবো, আমিই চুপ থাকবো; আমিই নির্যাতিতা হবো, আমিই চুপ থাকবো। নাটকে একটি ডায়লগ আছে, ‘ধর্ষিতা হবি, পুইড়া মরবি, মরণের পর আবার মরবি, আর কত মরবি তোরা? আর কত কাটবি? আয়, আমার লগে আয়। মরতে মরতে বাঁচতে শিখি, কাটতে কাটতে হাঁসতে শিখি, আমার লগে আয়। কোন ভয় নাই, তুই মানেইতো আমি, আমি মানে তুই।’ নাট্যকার লিজা বলেন, আমি সেই ধর্ষিতা নির্যাযিতা মেয়েদেরকে বলতে চাচ্ছি, তোমরা নির্যাতিত হয়ে সুইসাইড করো না, মরে যেও না। তুমি কেন মরে যাবে? তুমিতো কিছু করোনি, তোমার কোন অপরাধ নেই। আসো আমরা নতুন করে বাঁচি, আমরা বাঁচতে শিখি।

‘নাটকের চরিত্রগুলো কাল্পনিক নাকি আপনার জীবনে বাস্তব দেখা চরিত্র’? এর উত্তরে লিজা বলেন, ‘আসলে আমি চ্যারিটির সঙ্গে জড়িত, ‘কালার ও প্যারাডাইস’ নামে ফেইসবুক ভিত্তিক আমাদের একটি অরগনাইজেশন আছে। ওখানে চ্যারিটির কাজ করতে গিয়ে অনেক ভিকটিমের সাথে পরিচয় হয় এবং এদের প্রত্যেকের ইন্টারভিউ নিয়েছি। প্রতিটি চরিত্র একদম বাস্তব। ওদের জীবন থেকে গল্পগুলো শুনেই নাটকটি বানিয়েছি। লিখতে গেলে আমি একটি কথা বলি, যে নাটক জীবনের কথা বলেনা সে নাটক করে কী লাভ?

এ নাটকের এক পর্যায়ে আমরা দেখি যে, এক সাংবাদিক একজন ধর্ষিতা নারীর সাক্ষাতকার নিচ্ছেন, সাক্ষাতকারের প্রশ্নের ধরণটা এমন যে, সেখানে নির্যাতিতার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার চাইতে ধর্ষণের রগরগে বর্ণনা দিয়ে গণমাধ্যমের কাটতি বাড়ানোর ব্যাপারটাই যেন মুখ্য। এ প্রসঙ্গে নাট্যকার লিজা বলেন, ‘হ্যাঁ, আপনি যা বুঝেছেন সেটাই সত্য। একজন গণমাধ্যমের কর্মী যখন একজন নির্যাতিতার কাছে সাক্ষাতকার বা প্রশ্ন করতে যায়, কখনও কি আমরা বলি যে, ‘আসো, আমরা নতুনভাবে বাঁচতে শিখি’। কখনও বলি না। বরং এভাবে প্রশ্ন করি, ধর্ষণের সময় কতজন ছিলো? কতক্ষণ ধরে ধর্ষণ করেছে? আপনি কি ওদেরকে চিনতে পেরেছেন? আপনি কি বলতে পারবেন, ধর্ষক কোন উত্তেজক ঔষধ সেবন করেছিলো কি না?’ আমাকে একজন ভিক্টিম ইন্টরভিউতে বলেছে, তাকে এভাবেই প্রশ্ন করা হয়েছে। তখন তার উত্তরটা শুনে আমার কাছে মনে হয়েছে, ‘মরতে মরতে হাজার মরণ, তোমাকে প্রশ্নবানে আবার মরণ, শেষ মরণের পর আবার মরি আমি লাশ কাটা ঘরে, ছিন্ন বিচ্ছিন্ন শরীর, কলিজা, গোর্দা, মাথার খুলি, সব রাখিছো তুমি হিমঘরে তুলি, মরা মানুষটারে আর কতবার মারো তোমরা! শতকোটি বার মৃত্যু হয় যার, নতুন করে মরণের ডর কিসের আবার?’ এখানে আমার কথা হচ্ছে, আমিতো আসলে ধর্ষিতা হবার পর আর হারিয়ে যাবার কী থাকে আমার? আমার আর মৃত্যুরও ভয় নেই। মৃত্যুকে জয় করে মৃত্যুর উপরে উঠে গেছি।

ঢাকায় এই নাটকের অনেক শো হয়েছে, সেখানে দর্শকদের কাছ থেকে আপনারা কী রকম প্রতিক্রিয়া পেয়েছেন জানতে চাইলে লিজা বলেন, মিশ্র প্রতিক্রিয়া থাকে। আমি কিন্তু গড়পড়তা সবাইকে বলিনি, বলতে চাইনি। আমাদের নাটকে আপনি দেখে থাকবেন, আমি এখানে বলতে চেয়েছি, ‘পুরুষ’ এবং ‘পুরুষ মানুষ’। আমি পুরুষের এ সমাজে পৃথিবী চাই না। আমি ‘পুরুষ মানুষ চাই’।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ