প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএনপি কি বদলে যাবে?

বিভুরঞ্জন সরকার : বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়ায় দেশের রাজনৈতিক দৃশ্যপট বদলে যেতে শুরু করেছে। বিএনপি নির্বাচনে আসছে ২০-দলীয় জোট এবং ঐক্যফ্রন্টকে সঙ্গে নিয়ে। বিএনপিতে নির্বাচনে অংশ নেয়ার বিরুদ্ধ-গ্রুপ ছিলো। তারা চেষ্টা করেছে বিএনপিকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে। কিন্তু দলের অভ্যন্তরে নির্বাচনপন্থিরা শেষ পযন্ত জয়যুক্ত হয়েছেন। বিএনপির নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তে একদিকে যেমন দেশের রাজনীতিতে স্বস্তি ফিরে এসেছে, অন্যদিকে বিএনপিও অস্তিত্ব-সংকটে পড়ার আশঙ্কামুক্ত হয়েছে। অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের পথ প্রশস্ত হয়েছে। দেশের রাজনীতিতে একটি পরিবর্তনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। ২০-দলীয় জোট নিয়ে নির্বাচনে গিয়ে বিএনপি যে সুবিধা পেতো তারচেয়ে অনেক বেশি সুবিধা পাবে সঙ্গে ড. কামাল হোসেনের ঐক্যফ্রন্ট থাকায়।

এটা ঠিক যে, ঐক্যফ্রন্টে বিএনপিই হলো মূল তথা নিয়ামক শক্তি। বিএনপি ছাড়া আর যাদের নিয়ে ঐক্যফ্রন্ট গঠিত তাদের সবারই সাংগঠনিক শক্তি কিংবা জনসমর্থন একেবারে তলানিতে। কিন্তু বিএনপি যে ইমেজ সংকটে ভুগছিলো সেটা অনেকটাই দূর হয়েছে ড. কামালকে পাশে পাওয়ায়। দেশে কিংবা দেশের বাইরে যারা শেখ হাসিনা কিংবা আওয়ামী লীগকে অপছন্দ করেন, তারাও বিএনপির খালেদা-তারেক নেতৃত্ব পছন্দ করেন না। কামাল হোসেনকে পরিকল্পিতভাবেই রাজনীতিতে সক্রিয় করা হয়েছে। এর পেছনেও কোনো না কোনো পক্ষ বা শক্তি কাজ করেছে বলে মনে হয়। এখন নানা বাস্তব কারণে খালেদা-তারেক নেতৃত্ব বিএনপির জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিদেশি মরুব্বিরাও হয়তো বিএনপির মধ্যে একটি পরিবর্তন আশা করেন। ড. কামাল তাদের সবার কাছেই ‘ত্রাতা’ হিসেবে হাজির হয়েছেন।

বড় দলের অহমিকা ভুলে বিএনপি ড. কামালের নেতৃত্ব মেনে নিয়েছে, এটা খুব ছোট ঘটনা নয়। বিএনপি বর্তমানে যে গভীর সংকটে নিপতিত তা থেকে উদ্ধার পেতে হলে তাদের একটি ‘সেফ স্পেস’ দরকার ছিলো। সরকার তাদের সেই স্পেসটা দিতে চায় না বলেই অনেক সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এখন বলা যায়, ড. কামাল হোসেনের মধ্যস্থতায় বিএনপি কিছুটা স্বস্তির পরিবেশ পেয়েছে। বিএনপি এটা জানে যে, নির্বাচনে জেতা ছাড়া খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ‘বাঁচার’ উপায় কম। নির্বাচনে জেতার জন্য বিএনপির যতোটা তাড়া আছে, অন্যদের তেমন বা ততোটা নেই। আওয়ামী লীগকে পরাজিত করার জন্য বিএনপি সব উপায়ে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে শেষে কামাল হোসেনের ওপর ভর করেছে। দেশে বা দেশের বাইরে কামাল হোসেনের একটি আলাদা ভাবমূর্তি আছে। অন্যদিকে বিএনপি আছে পুরো ভাবমূতি- সংকটে। জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষক এবং হাওয়া ভবনের বদনাম গা থেকে মুছে ফেলতে না পারলে বিএনপির পক্ষে ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব হবে না।

বিএনপি এতোদিন চেয়েছে ২০০১ সালের মতো একটি নির্বাচনের পুনরাবৃত্তি ঘটাতে। তাই তারা সংসদ ভাঙা এবং শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে অনড় ছিলো। কিন্তু সংবিধানের বাইরে না যাওয়ার ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় অবস্থান বিএনপির মনোবাঞ্ছা পূরণে বাধা হয়েছে। সাত-দফা না মানলে, খালেদা জিয়াকে মুক্তি না দিলে বিএনপি নির্বাচনে না যাওয়ার যে গোঁ ধরেছিলো, সেখান থেকে বিএনপির সরে আসা ইতিবাচক লক্ষণ। সব কিছুতে ‘না’ বলা থেকে সরে এসে ‘হ্যাঁ’ বলতে পারা একটি ভালো পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের ধারা অব্যাহত থাকবে কিনা, দেখার বিষয় সেটা।

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর একটি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন, যেটাকে অনেকে কিছুটা ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করার সুযোগ পাচ্ছেন। মির্জা আলমগীর বলেছেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ না হলে, নেতা-কর্মীদের গ্রেপ্তার বন্ধ না হলে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা হবে। বিএনপি মহাসচিবের এই হুমকি পুরনো ধারা অর্থাৎ নির্বাচন বর্জনের ধারায় ফিরে যাওয়ার পূর্বাভাস হলে তা বিএনপি এবং তার মিত্র ও সহযোগীদের জন্য ভালো হবে না। বিএনপিকে এটা বুঝতে হবে যে, তারা সরকারের সঙ্গে লড়ার জন্য সমান সমান অবস্থানে নেই। প্রার্থী বাছাই নিয়েও জোট এবং ফ্রন্ট নিয়ে ঝামেলায় পড়তে হবে। কাজেই বিরোধের জন্য ক্ষেত্র বিস্তৃত না করে নির্বাচনমুখী তৎপরতাই বাড়ানো উচিত।

বিএনপিকে নিজেদের নিশ্চিত বিজয়ী পক্ষ ভেবে বসে না থেকে আওয়ামী লীগও যে নির্বাচনে জিততে পারে সেটাও মনে রাখতে হবে। মানুষ বিএনপিকে ভোট দেওয়ার জন্য উন্মুখ হয়ে আছে, অমুক রাষ্ট্র, তমুক রাষ্ট্র চাইছে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনÑ এই সব উপরভাসা তথ্যের ওপর নির্ভর করে রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ করা একেবারেই ঠিক হবে না। মানুষ যে আওয়ামী লীগকে আর ক্ষমতায় দেখতে চায় না, কোন ঘটনা থেকে তার প্রমাণ পাওয়া গেছে? সরকারবিরোধী গণঅসন্তোষের কোন পূর্বলক্ষণ দেখে বিএনপি ধরে নিচ্ছে যে ভোটের হাওয়া তাদের অনুকূলে?

এবারের নির্বাচনে বিএনপিকে প্রমাণ করতে হবে যে, তারা আর গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক বা ক্ষতিকর কোনো কাজে জড়াবে না। সন্ত্রাস-সহিংসতাকে কোনোভাবেই প্রশ্রয় দেবে না। জঙ্গিবাদের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে তাদের যে বদনাম, সেটারও আর নবায়ন হবে না। মানুষ বিএনপিকে দেখতে চাইবে নতুন নীতি ও নেতৃত্বে। মানুষ যেন মান্না দে’র গানের সুরে বিএনপির কাছে জানতে চাইছে : ‘খুব জানতে ইচ্ছা করে, তুমি কি সেই আগের মতোই আছো ; নাকি অনেকখানি বদলে গেছো?’ বিএনপি যদি তার বদলে যাওয়া রূপ মানুষের কাছে স্পষ্ট করতে পারে তবে তাদের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হবে, এতে সংশয় প্রকাশের কোনো সুযোগ নেই। সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ