প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কেন ইরান নিয়ে ট্রাম্পের কৌশল ব্যর্থ হবে?

ডেস্ক রিপোর্ট : গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফিল্মি জোশে ইরানের ওপর নিষেধাজ্ঞার আগাম বার্তা দেন একটি টুইটে। ‘গেম অফ থ্রোনস’র স্লোগানের আদলে এতে লেখা ছিল, ‘নিষেধাজ্ঞা আসছে’।

এরপর সোমবার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাইক পম্পেও এবং অর্থমন্ত্রী স্টিভ মনোশিনও নিশ্চিত করেন ইরানের জ্বালানি ও জাহাজ পরিবহনসহ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ খাতে অবরোধ আরোপ করা হচ্ছে।

ইরানের সাত শতাধিক ব্যক্তি, ব্যাংক, বিমান ও নৌ পরিবহনের ওপর এই অবরোধ আরোপ করা হয়।

ইরানের তেল রফতানি শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনতে এসব পদক্ষেপ নেয়া হয়। বিভিন্ন দেশের সরকার ও সংস্থা এসব নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করলে তারাও অবরোধের আওতায় পড়বে বলে হুঁশিয়ারি রয়েছে।

এ বছর একতরফাভাবে ইরানের সঙ্গে স্বাক্ষরিত পরমাণু চুক্তি থেকে বেরিয়ে যায় যুক্তরাষ্ট্র। ইরানকে ‘দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র’ হিসেবে অভিহিত করে দেশটির ওপর ‘সর্বোচ্চ চাপ’ প্রয়োগের জন্য তারা নতুন করে কর্মতৎপরতা শুরু করে। এতে করে ওই অঞ্চলে ইরানের আচরণ বদলে যাবে বলে বিশ্বাস করছেন হোয়াইট হাউজ ও ট্রাম্পের মন্ত্রিসভার শ্যেন দৃষ্টিধারীরা।

ইসরাইল ও পারস্য উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলোর উৎসাহী সমর্থনে এই কার্যক্রম শুরু করেছে যুক্তরাষ্ট্র। ওই অঞ্চলে ইরানের যেসব সশস্ত্র বিদ্রোহী সংগঠনগুলোকে যুদ্ধে সহায়তা করে যাচ্ছে, তা বন্ধ করতে চাইছে তারা।

‘ইরানের কাছে দুটি পথ খোলা রয়েছে। হয় তারা তাদের বেআইনি কর্মকাণ্ড থেকে ১৮০ ডিগ্রি উল্টো ঘুরে সাধারণ দেশের মতো আচরণ করবে অথবা তারা তাদের অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যেতে দেখবে,’ সোমবার বলেন পম্পেও।

কিন্তু, ট্রাম্পের বিরোধিরা বলছেন, তার কৌশল ইরানের সাধারণ জনগণের জন্য চরম ভোগান্তি তৈরি করলেও দেশটির শাসকদের মনোভাব এতে পরিবর্তিত হবে না। হোয়াইট হাউজ চুক্তি থেকে সরে যাওয়ার পর ইরানের অর্থনীতি মন্থর হয়ে পড়েছে এবং তাদের মুদ্রার মূল্যমান উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। বৃহৎ বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের শাস্তির ভয়ে সেখানে থেকে ব্যবসা গুটিয়ে নিয়েছে।

গবেষণা সংস্থা দ্য ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ ইরানের চার দশকের অর্থনীতির কর্মক্ষমতা বিশ্লেষণ করে দেখেছে, দেশটির প্রতিরক্ষা কৌশলের সঙ্গে তাদের অর্থনৈতিক দুর্দশার বিশেষ কোনো সম্পর্ক নেই।

‘ট্রাম্পের প্রশাসন আশা করছে, অবরোধের কারণে ইরান তাদের আঞ্চলিক কর্মকাণ্ড সংযত করবে। কিন্তু, তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে, এই ফলাফল লাভের বিষয়টি অনিশ্চিত। কারণ, ইরানের সম্পদের পরিমাণের পরিবর্তন দেশটির আঞ্চলিক কৌশল ও সক্ষমতাকে খুব সামান্যই প্রভাবিত করে।’

‘ট্রাম্পের বেশিরভাগ বৈদেশিক নীতি মতোই ইরানের সঙ্গে চুক্তি বাতিল করে অবরোধ আরোপ করাটা রাজনীতি হিসেবে ভালো, কৌশল হিসেবে নয়,’ এক টুইটে বলেন সাবেক মার্কিন কূটনীতিক আরন ডেভিড মিলার।

ইরানকে সাজা দিয়ে উত্তর কোরিয়ার সঙ্গে সুসম্পর্ক তোলার দিকে ট্রাম্পের ব্যাপক আগ্রহের প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।

‘ইরানের সরকার খারাপ। কিন্তু, শুধুমাত্র ট্রাম্পের পক্ষেই কিম জং উনের উত্তর কোরিয়ার মতো একটি স্বৈরাচারী ও ভীতিকর পরমাণু শক্তি সমৃদ্ধ রাষ্ট্রের প্রশংসা করা সম্ভব এবং এতে ইরানের ক্ষেত্রে নেয়া কৌশলের ভণ্ডামি উপেক্ষা করা ট্রাম্পের পক্ষেই সম্ভব,’ বলেন মিলার।

অন্যদিকে ইরানের নেতারা এই চুক্তি মেনে চলার বিষয়টির ওপর গুরুত্ত্ব দিচ্ছেন এবং আমেরিকার পদক্ষেপের ‘অবৈধতা’ তুলে ধরে এর সমালোচনা করছেন। চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী ইউরোপীয় সরকারগুলোও এর সমর্থনে বক্তব্য দিয়েছেন।

‘এই কাজ সম্পন্ন করার জন্য আমরা আমাদের মিলিত সংকল্পে অটল থাকব,’ একটি যৌথ বিবৃতিতে জানান ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির কূটনীতিকরা।

ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি সোমবার ‘গর্বের সঙ্গে এই অবরোধ ভাঙ্গার’ প্রত্যয় ঘোষণা করেছেন।

‘ইরান ওই অঞ্চলে শক্ত হয়ে বসছে। নিষেধাজ্ঞার কারণে এই অবস্থা উল্টে যাবে বলে আমার মনে হয় না,’ মার্কিন পত্রিকা ওয়াল স্ট্রিট জার্নালকে বলেন জেফ্রি ফেল্টম্যান। তিনি ওবামার স্টেট ডিপার্টমেন্টে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন।

প্রকৃতপক্ষে, এই অবরোধের কারণে সবচেয়ে বেশি লাভবান হবে ইরানের কট্টরপন্থীরা। বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের শাসনব্যবস্থা অর্থনৈতিক ডামাডোল থেকে বেশ ভালোভাবে সুরক্ষিত। দেশটির শক্তিশালী রেভ্যুলুশনারি গার্ড বাহিনী, যা ইরাক ও সিরিয়ায় ইরানে ‘ক্ষতিকারক কর্মকাণ্ড’ চালায়, অবরোধের কারণে তাদের কৌশল পরিবর্তন করবে না। বরং তারা আরও অবাধ্য হয়ে তাদের অস্তিত্ব জানান দিতে উৎসাহী হতে পারে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ বলছে, অবরোধের কারণে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের কট্টরপন্থীরা আরও শক্তিশালী হয়ে পাল্টা আঘাত করলে ওই অঞ্চলের উত্তেজনা বৃদ্ধি পেতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ইউরোপীয় সহযোগীরাও একই শঙ্কায় ভুগছে। দেশটির কট্টরপন্থীরা কখনই পশ্চিমা দেশগুলোর সঙ্গে ভালো সম্পর্ক তৈরি করতে চায়নি। তাদের আশঙ্কা রুহানি এই কট্টরপন্থীদের চাপের কাছে নতি স্বীকার করতে পারেন।

গত সপ্তাহে ডেনিস রস সাংবাদিকদের বলেন, ওবামার আমলে ইরানের ওপর আরোপিত অবরোধের সময় আন্তর্জাতিক জোটের বিশাল এক নেটওয়ার্ক ছিল। কেউ যেন এই নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটিয়ে যেতে না পারে, তা নিশ্চিত করত এই নেটওয়ার্ক। কিন্তু, এখন আর সেই অবস্থা নেই। ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইরানের সঙ্গে ইউরোপের ব্যবসা সুরক্ষিত করার বিভিন্ন উপায় পরীক্ষা করে দেখছে। ওয়াশিংটন নিজেই ভারত ও চীনসহ আটটি দেশকে এই নিষেধাজ্ঞা থেকে সাময়িক অব্যাহতি দিয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ট্রাম্প এখনো উত্তর কোরিয়ার নেতা কিমের সঙ্গে বৈঠকের আশা করতে পারেন। তবে ইরানের নেতারা এই মার্কিন প্রেসিডেন্টকে তোষামোদ করার কোনো লক্ষণই দেখাননি। বরং তারা চুপচাপ তার প্রেসিডেন্সির মেয়াদ শেষ হওয়ার অপেক্ষা করতে পারেন।

‘তেহরান নিয়ম মেনেই কাজ করেছে। কিন্তু, যুক্তরাষ্ট্র তার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে,’ একটি লেখায় মন্তব্য করেন মার্কিন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক ক্যাটো ইনস্টিটিউটের জন গ্লেসার।

তিনি বলেন, ‘তারা আবার অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার মুখে স্বেচ্ছায় বিব্রত হতে চাইবে না।’

এ সময় ইরানের সাধারণ জনগণ অবরোধের জন্য প্রতিদিন ভোগান্তি পোহাবে। জরুরি ঔষধের অভাব, নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের মূল্যবৃদ্ধির কারণে তাদের জীবনযাত্রার মান ক্রমেই কমতে থাকবে।
সূত্র : পরিবর্তন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ