প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

এইম ইন লাইফ যখন এমপি হওয়া!

ডা. মো. তাজুল ইসলাম : অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তিপরীক্ষার জন্য গ্রাম থেকে মফস্বল শহর চাঁদপুরে যাই। বাংলা পরীক্ষায় রচনা এসেছে তোমার জীবনের লক্ষ্য। আমি সাধারণত পরীক্ষায় তাৎক্ষণিকভাবে বানিয়ে নিজ থেকে উত্তর লিখতাম। মুখস্থ করার ও লেখার অভ্যস ছিলো না। ওই রচনায় লিখেছিলাম- আমি জাতিসংঘের মহাসচিব হতে চাই (তখন মহাসচিব ছিলেন উথান্ট)। কারণ হিসেবে লিখেছিলাম, জাতিসংঘ হচ্ছে পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রের যৌথ সংস্থা। এর মহাসচিব হওয়া মানে সারা পৃথিবীতে ‘শান্তি’ আনার চেষ্টায় নিজকে নিয়োজিত রাখার অপূর্ব সুযোগ। কোনো একটি দেশের রাষ্ট্রপ্রধান হওয়ার চেয়ে পৃথিবীর সকল রাষ্ট্রের সম্মিলিত সঙ্গের মহাসচিব হওয়া অনেক বেশি গৌরবের ও ক্ষমতার। তখন কি জানতাম এটি একটি শিখন্ডি,মাকাল ফল? এরপর রবীন্দ্রনাথ হবো,আইনস্টাইন হবো ইত্যাদি কতোকিছু হওয়ার সাধ জাগতো। কিন্তু কস্মিনকালেও এমপি হবো এ চিন্তা এই বোকার মাথায় আসেনি।

বুদ্ধি দুই ধরনের : এক. সরল বুদ্ধি: এরা জ্ঞান আহরণ করে, জ্ঞান বিতরণ করে ও জ্ঞান সৃজন করে। দুই. কৌশলী বুদ্ধি বা কুটবুদ্ধি এরা পরিস্থিতি, পরিবেশকে নিজ প্রয়োজন, স্বার্থে ব্যবহার করে ও বুদ্ধিকে ‘কৌশলের’ হাতিয়ার হিসেবে বিনিয়োগ করে থাকেন। প্রথম শ্রেণির বোকাবুদ্ধির লোক এখন সমাজে খুঁজে পাওয়া মুশকিল। সবাই বুঝে গেছে (বিশেষ করে যাদের চোঙ্গা বুদ্ধি বেশি) যে বুদ্ধি হচ্ছে সেরা পুঁজি, যার কুশলী ব্যবহার আখের ঘোচাতে সাহায্য করে। আমাদের দেশে বহুদিন যাবৎ ছাত্র-ছাত্রীরা স্কুলের পরীক্ষায় রচনার খাতায় ‘এইম ইন লাইফ’ হিসেবে ‘ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, পাইলট’ ইত্যাদি হতে চাইতো। তবে বর্তমানে তরুণ-তরুণীদের প্রধান স্বপ্ন ‘বিসিএস’ ক্যাডার হওয়া। সাম্প্রতিককালে নির্বাচনকে ঘিরে ‘তারকা’খ্যাত খেলোয়াড়, নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকা, বুদ্ধিজীবী, অর্থনীতিবিদ, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ভিসি, বড় বড় ব্যবসায়ী কে নেই যারা এমপি ইলেশনের নমিনেশন পেপার সাবমিট করছেন না? কিন্তু আমার সরল বুদ্ধিতে বুঝতে পারছি না- কী মধু ওই এমপিগিরিতে?

তারা জীবনে কী পাননি? টাকাপয়সা, মান-সম্মান, খ্যাতি, প্রতিষ্ঠা সবই পেয়েছেন। যে কোনো এমপির চেয়ে এদের অনেকের পরিচিত, খ্যাতি অনেক বেশি। এমনকি টাকা উপার্জনের দিক থেকে তাদের কারো কারো অবস্থান ঈর্ষণীয়। তারা চাইলে পছন্দের দলকে পরামর্শ দিয়ে, গাইড দিয়ে, প্রচার দিয়ে সাহায্য করতে পারতেন। কিন্তু নিজে এমপি হয়ে নিজের,দলের, এলাকার এমন কী বাড়তি উপকার করবেন? (এলাকার উন্নয়নের বুলি খুবই মধুর। বাস্তবতা কি আমরা সবাই জানি)। বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এর আগে যারা এসেছেন তাদের কে কি করতে পেরেছেন জাতি তা দেখেছে। এমনকি এদের কয়েকজনের করুণ পরিণতি আমাদের মনকে আহত করে। (সর্বোপরি মনোনয়ন পাওয়া এবং সুষ্ঠু নির্বাচনে জিতে আসার সম্ভাবনাই বা কতোটুকু? সবাই কি আর মাশরাফি?)

আমি শঙ্কিত অন্য কথা ভেবে। তরুণ-তরুণীরা সাধারণত স্বনামধন্য লেখক, সাহিত্যিক, কবি, বুদ্ধিজীবী,শিক্ষক, খেলোয়াড়, নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকাদের ‘মডেল’ হিসেবে কল্পনা করে থাকে। এরা তাদের আইডল। তারা এদের মতন হতে চায়। এখন থেকে আমাদের তরুণ-তরুণীদের ‘মডেল’ হবেন কারা? যদি সত্যিকার সুস্থ রাজনীতিতে তারা আগ্রহী হন তাহলে ভিন্ন কথা। সে ক্ষেত্রে দেশের রুগ্ন রাজনীতি আরোগ্য লাভ হতে পারে। আমি নিজও মনে করি নষ্ট, ভ্রষ্ট রাজনীতিকে পরিবর্তন করতে, রাষ্ট্রের যথাযথ ‘মেরামতের’ জন্য প্রতিভাবান, মেধাবী লোকদের রাজনীতিতে আসা উচিত। কেননা রাজনীতি সবার জন্য এতো গুরুত্বপূর্ণ যে এর ভার অযোগ্য, দুর্জনের হাতে ছেড়ে দেয়া যায় না। তাই একে অপরাজনীতি থেকে মুক্ত করা দরকার। কিন্তু নষ্ট রাজনীতির ক্রীড়নক হলে দেশ,জাতি তো ডুববেই, নিজেরা ও না ডুবে যায়!

লেখক : অধ্যাপক, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত