প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নির্বাচনী উৎসবে খরচ হবে কতো প্রাণ?

নুসরাত শরমীন : জনপ্রতীক্ষার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন খুললো সহিংসতার খাতা। প্রথমবার তফসিল ঘোষণার পরপরই নির্বাচনী সহিংসতার প্রথম বলি হলেন দুই তরুণ। রাজধানীর আদাবরে আওয়ামী লীগের দু’পক্ষের কর্মীদের মধ্যে সংঘাতের জেরে পিকআপের ধাক্কায় নির্মাণ শ্রমিক সুজন ও আরিফ প্রাণ হারান। নির্বাচনী সহিংসতা এদেশে নতুন কিছু নয়। গণতন্ত্রে ভোটের মাধ্যমে জনগণ তার পছন্দের প্রার্থীকে নির্বাচন করেন, যিনি হন জনগণের মুখপাত্র। তিনি রক্ষক, তার নেতৃত্বে জনগনের আশা আকাঙ্খা বাস্তবে রূপ পায়। তিনি যেহেতু রক্ষকের ভূমিকায়, জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধান তার প্রধানতম দায়িত্ব। কিন্তু কার্যত আমরা কি দেখছি ? আমরা ভোটের মাধ্যমে সুশাসক নয়, শোষক নির্বাচিত করছি। যারা ক্ষমতায় যেতে জনগণের প্রাণ খরচ করতেও দ্বিধা করেন না। নির্বাচনে খুন হবে, লুটপাট হবে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায় নির্যাতিত হবেন, এই সংস্কৃতি এদেশে বহুদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত। জনগণ এখানে সহিংসতাকেই নির্বাচনের অনিবার্য পরিণতি হিসেবে মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। নির্বাচনের পর আমরা এখন পরিসংখ্যানে ব্যস্ত থাকি আগের বারের চেয়ে মৃতের সংখ্যা কত বাড়লো। গত কয়েকটি নির্বাচনের দিকে তাকালেই এই হিসেব আরও স্পষ্ট হবে।

দেশি বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষণ সংস্থা ও গণমাধ্যমের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫৭ জন সাধারণ মানুষ নিহত হন। পাঁচ শতাধিক ভোটকেন্দ্রে নির্বাচন স্থগিত করা হয়, পুড়িয়ে দেয়া হয় প্রায় ১৫০টিরও বেশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ভোট কেন্দ্রে অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও ব্যালট পেপার ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে।

২০০৮ সালের ২৫ নভেম্বর নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর বিরোধী দলের ২৭ দিনের হরতাল-অবরোধে প্রায় ১৫০জন প্রাণ হারান।

২০০১ সালের অক্টোবরে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণের এক সপ্তাহ আগে সহিংসতায় অন্তত ৩৮জন নিহত হন। আহত কমপক্ষে ১হাজার ৬৭২জন।

১৯৯৬ সালের ৩ মার্চ ‘সংবাদ’ পত্রিকার প্রতিবেদনে দেখা যায়, ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বিএনপির এক তরফা নির্বাচনে সহিংসতায় প্রাণ হারান ৪১জন। আন্তর্জাতিক বার্তাসংস্থা রয়টার্সের হিসাবে, ১৯৯৬ সালের ১ থেকে ১৫ ফেব্রুযারি পর্যন্ত নির্বাচনকালীন সহিংসতায় ২৮জন নিহত হন।

এবারের নির্বাচনে ঐক্যফ্রন্টের সাতদফা দাবির অন্যতম হচ্ছে, দেশি বিদেশি পর্যবেক্ষকদের নির্বাচনে পর্যবেক্ষণের অবাধ সুযোগ নিশ্চিত করা এবং বিচারিক ক্ষমতায় সেনাবাহিনী মোতায়েন। এখানে প্রশ্ন হচ্ছে ঐক্যফ্রন্টের এই দাবির উদ্দেশ্য কি ? উত্তরও পরিস্কার। দলগুলো তাদের ভোটের নিরাপত্তা চায়, ভোটার চুলায় যাক। ভোটারের নিরাপত্তা কখনোই এদের কাছে মুখ্য বিবেচ্য বিষয় নয়। এ যাবৎ কোন নির্বাচনে মানুষের জানমালের নিরাপত্তা অগ্রাধিকার পায়নি। যদিও ২০১৪ সালে নির্বাচন বাজেটের ৭৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে নিরাপত্তার জন্য ! শাসক শুধু চান তার ভোটের নিরাপত্তা, যা তাকে ক্ষমতায় বসাবে। ভোটের রাজনীতিতে জনগণ তার পছন্দের নেতা নির্বাচিত করবেন ভোটের মাধ্যমে। নির্বাচিত নেতার প্রধান দায়িত্ব হচ্ছে, যারা তাকে ভোট দিয়েছেন বা যারা দেননি, সকলের নিরাপত্তা বিধান করা । কিন্তু বাস্তবতা হাঁটছে উল্টো পথে। আমাদের নেতারা নির্বাচনে ক্যাডার বাহিনী পোষেন, পেশীশক্তির জোরে বুথ দখল করেন, নির্বাচনে জিততে মরিয়া হয়ে ওঠেন, সংঘর্ষ হয়ে ওঠে অনিবার্য। মানুষের নিরাপত্তা সেখানে অতি তুচ্ছ বিষয়।

২০১৪ সালের অভিজ্ঞতা খুবই তিক্ত আমাদের। জনগণ ক্ষমতাপ্রত্যাশী দলগুলোর সাংঘর্ষিক অবস্থান চায় না। সেক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ বলছে, জ্বালাও পোড়াও জনগণ মানবে না। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, জনগণ বিতর্কিত নির্বাচন মানবে না। কথা হচ্ছে, এই জনগণ কারা ? তাদের নিরাপত্তার প্রশ্নে দলগুলোর ভূমিকা কি হবে এ বিষয়ে কোন জোরালো পদক্ষেপ বর্তমান পরিস্থিতিতে একেবারেই অনুপস্থিত।

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে সারাদেশে ৪০হাজার কেন্দ্রে ভোটার আছেন ১০ কোটিরও বেশি। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়সহ সকলের জানমালের নিরাপত্তা বিধান করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন লোকবল ও আইনি সুরক্ষার দিক দিয়ে অনেক শক্ত অবস্থানে আছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে তারা সেই ক্ষমতা প্রয়োগ করতে প্রস্তুত কি না। শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য প্রয়োজন দলগুলোর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। সেটা কি আদৌ সম্ভব ? জনগণ আর কতদিন নির্বাচনী সহিংসতার বলি হবেন ? রাজনীতি যাদের মারছে তারা সংখ্যাগোনার লাশে পরিণত হচ্ছেন। নির্বাচনের নামে সহিংসতার মোড়কে এমন রক্তাক্ত গণতন্ত্র জনগণ চায় কি ?

লেখক : সহ সম্পাদক, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ