প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অবহেলিত পথশিশুদের জীবন ও আমাদের বোধ

মাহফুজা অনন্যা : মতিঝিলে বাসা হওয়ায় প্রায়ই স্টেশনের পাশ দিয়ে যাতায়াত করা হয়। কখনও রিকশায়, কখনও হেঁটে যাওয়া-আসা করি। অফিস থেকে ফেরার পথে প্রতিদিনই রিকশায় বসে দেখতে পাই পথশিশুদের। কেউ রাস্তায় কুকুরের সাথে গাঁ ঘেষাঘেষি করে শুয়ে আছে, কেউ কেউ দল বেঁধে খুনসুটি করছে, প্রতিদিনই ভাবি ওদের জন্য কিছু করা দরকার। ওদের নিয়ে কিছু লিখবো, লেখা দরকার। গত জানুয়ারির এক পড়ন্ত বিকেলে বাসায় ফেরার পথে কি মনে হলো দুই পা এগিয়ে গেলাম স্টেশনের দিকে। কিছুদূর এগোলাম। যেতেই চোখে পড়লো নয় দশ বছরের কয়েকজন ছেলেমেয়ে খুনসুটিতে মেতে আছে। গাঁয়ে পাতলা গোছের একটা করে কাপড় আছে, শীত যতটা পড়ছে ততটা ভারী কাপড় কারোরই গায়ে নেই। তবুও নিজেরা বেশ আমুদে মেজাজেই যেন ছিলো।

আমাকে কাছে যেতে দেখেই এ ওর মুখে চেয়ে কি যেন ভাবতে লাগলো। ফিসফিস করে কি যেন বললোও কেউ কেউ। আমি একটা মুচকি হাসি টেনে খানিকটা এগিয়ে গেলাম। আমি কি তোমাদের একটা ছবি তুলতে পারি? এই কথাটির উত্তরে আমি কোনো শব্দ পেলাম না! পেলাম একরাশ অবজ্ঞা, ভর্ৎসনার দৃষ্টি! যেন এটা খুব পরিচিত অপছন্দ ওদের কাছে! একজন তো বলেই বসলো- ক্যান, ফডো উডাইয়া কি করবেন? আমগো কি বিস্কুট দিবেন? আগেও তো কতজন ফডো তুল্যা লইয়া গ্যাছে,কিছু দেয় নাই! তাই তো, আমিও তো কিছু আনি নাই। কী বলি, কী করি!

আমি রীতিমতো ভড়কে গেলাম! লজ্জাও লাগছিলো ওতোটুকু একটা ছেলের কথার তেজে! তবু আমাদের লজ্জা হয় না! আমরা ভুল করি, একই ভুল বারবার করি। এটা কখনও ভাবি না যে, আমাদের কাছেও ওদের ছোট ছোট প্রত্যাশা থাকে। আমরা কি তা ভাবি? আমরা কি তা বুঝি? আমরা বুঝি এক প্লেট খাবার দিলে তা ছবি তুলে ফেসবুকে তাৎখণিক আপলোড দিতে হয়! অসম্ভব আড়ম্বরে মেতে উঠি ছবি তুলতে। খাবার বিতরণের চেয়ে মুখ্য বিষয় হয়ে ওঠে ছবি তোলা এবং তা কতো তাড়াতাড়ি ফেসবুকে আপলোড দিতে পারি। ততোক্ষণে ভুখা শিশুটি হয়তো মরোমরো অবস্থা! কিছুদিন আগে বন্যার্ত এক শিশুকে খাবার বিতরণের ভাইরাল ছবিটি আমাদের আজো লজ্জা দেয়! চোখেমুখে ভর্ৎসনা তার চেয়ে বরং আমাদের চোখ উপড়ে নিয়ে যাও, আমাদের চোখের আলোটুকু নিয়ে তোমরা আরো আলোকিত হও, আমাদের খাবারের থালাগুলো উদোম পড়ে থাক, তোমরা তোমাদের দামী দামী নষ্ট খাবারগুলো ফেলবার জন্য ‘বড় ডাস্টবিন চাই’ আন্দোলনে নামো। সর্বনিম্ন তাপে একখানি গরম কাপড় নাই মায়ের শরীরে জড়ানো, হোক সে পাতলা কাপড়, মুখ গুঁজে ওম নেবো মাকে ধরে ঠাসাঠাসি করে ভাইবোন, জানি না কে মা! কারা ভাইবোন! তার চেয়ে আমাদেরকে তোমরা বধির করে দাও, মা, মা বলে আর ডাকবো না কোনোদিন!

আমাদের শরীরের হাড়গুলো গুনেগুনে ছবি তুলতে এসো না আর ভুখা,নাঙ্গা শরীরগুলো তুলে ধরতে বলো না, তার চেয়ে ঠুস করে একটা শব্দে উড়িয়ে দাও, খুলি। খবরের কাগজের ভেতরের খবর হওয়ার চেয়ে একবারে হেডলাইন হবো। সকালে নাস্তার টেবিলে তোমাদের চায়ের চুমুকের সাথে খবরের পাতায় চমক হবো। আমরা ঘুমাতে পারি না ব্যথার পাশে কুয়াশা, ঝড়, কিংবা শীতের রাতে তার চেয়ে আমাদের চিরতরের ঘুম দাও বুক পেতে রেখেছি হৃদপি- খুলে দিতে, তোমাদের হাতে আধপেটা খেয়ে ঘুমানোর অছিলায় ভান করে শুয়ে থাকার চেয়ে আমাদের চিরতরের ঘুম এনে দাও।

লেখক : কবি ও শিক্ষাবিদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ