প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সিলেট-১ আসনের গুরুত্ব ও প্রার্থী নির্বাচন

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু, স্টকহোম : সিলেট আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে একসময়ে নেতৃত্বদানকারী ছিলেন আব্দুস সামাদ আজাদ, ফরিদ গাজী ও সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত। এই তিন জন নেতাই বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ ভূমিকা রাখেন, তবে স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সিলেট জেলার নেতৃত্ব নিয়ে ফরিদ গাজী ও আব্দুস সামাদ আজাদ দ্বন্দে জড়িয়ে পড়েন। এই সময় অবশ্য সুরঞ্জিত গুপ্ত সিলেট মোজাফ্ফরপন্থী ন্যাপের নেতা ছিলেন এবং ১৯৭৩ নির্বাচনে ন্যাপের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। ফরিদ গাজী ছিলেন সিলেট শহরের নেতা আর সামাদ আজাদ ছিলেন সুনামগঞ্জের নেতা। এই দুইজনের দ্বন্ধের কথা বঙ্গবন্ধু শুরু থেকেই অবগত ছিলেন। পরবর্তীতে সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত আওয়ামী লীগে যোগদান করলে সামাদ আজাদের সাথে তারও মতানৈক্যে সৃষ্টি হয় কারণ সুরঞ্জিত সেনও ছিলেন সুনামগঞ্জের বাসিন্দা। সামাদ আজাদ ও সুরঞ্জিত গুপ্তের সাথে আমার কোনোদিন দেখা হয়নি তবে ফরিদ গাজী যখন বঙ্গবন্ধু সরকারের বাণিজ্য প্রতিমন্ত্রী ছিলেন তখন একদিন সকালে তার বাসায় গিয়েছিলাম। আমি তখন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগর কমিটির সমাজকল্যান সম্পাদক। মন্ত্রীর বাসায় প্রবেশ করতেই দেখি মাঠে একটি সাধারণ চেয়ারে লুঙ্গি আর শার্ট পরে আরেকটি চেয়ারে আয়না রেখে নিজের দাড়ি শেভ করছেন। আমাকে দেখে বসতে বললেন। মন্ত্রী ফরিদ গাজীর কাছে আমার যাওয়ার প্রধান কারণ ছিল ঢাকা আইডিয়াল কলেজে শহীদ মিনার নির্মাণে সরকারি মূল্যে সিমেন্ট ক্রয়ের ছাড়পত্র। সেদিন তিনি আমার কাজ করে দিয়েছিলেন এবং পরবর্তীতে আইডিয়াল কলেজে শহীদ মিনার তৈরী করা হয়েছিল যার উদ্বোধন করেন আজকের মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। সেদিনের একান্ত আলোচনায় সিলেটের সার্বিক উন্নতির লক্ষে তার পরিকল্পনার অনেক কথা শুনেছিলাম। সিলেটের প্রতি তার ভালোবাসা ও একটি সহজ সাধারণ জীবন ধারণের প্রমাণ সেদিন পেয়েছিলাম।

বঙ্গবন্ধুর পরে শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগের হাত ধরলেও এই তিন নেতার দ্বন্ধ মেটানো সম্ভব হয়নি। ‘৯৬ আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে আব্দুস সামাদ আজাদকে তিনি পররাষ্ট্র মন্ত্রী করেছিলেন ফলে সিলেটের রাজনীতিতে ফরিদ গাজী ও সুরঞ্জিত সেন কিছুটা হলেও কর্নার হয়ে পড়েন। এভাবেই সময়ের স্রোতে একদিন সামাদ আজাদ ও ফরিদ গাজীর মৃত্যু হলে সুরঞ্জিত সেন সিলেট আওয়ামী লীগের একক নেতা হিসেবে নিজেকে খুব সহজেই প্রতিষ্ঠিত করেন। যদিও সিলেট শহরে ফরিদ গাজী ও সুনামগঞ্জে সামাদ আজাদের সমর্থকেরা কখনো তাকে সহজভাবে গ্রহণ করেনি।

এইসময় অনেকে ধারণা করেছিলেন সিলেটে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নেতা হিসেবে সামনে আসছেন সাবেক ডাকসুর সভাপতি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সুলতান মোহাম্মদ মনসুর কিন্তু হঠাৎ করেই ডক্টর ফকরুদ্দিন আহমেদের অস্থায়ী সরকারের সময় তার ভূমিকা নিয়ে নানা প্রশ্ন আসে। পরবর্তীতে তিনি আওয়ামী লীগ থেকে ছিটকে পড়েন। বার বার চেষ্টা করেও সুলতান মনসুর আওয়ামী লিগে আর ফিরে আসতে পারেননি। এখন আর সেই সম্ভাবনা একেবারেই নেই। তাই তিনি ডক্টর কামাল হোসেনের ঐক্যজোট যোগ দিয়েছেন, রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে সিলেট তথা বাংলাদেশের রাজনীতিতে সুলতান মনসুরের চ্যাপ্টার এখন শেষ প্রায়।

এদিকে সরকারি আমলা ও পরবর্তীতে মন্ত্রী হয়ে একসময় সিলেট আওয়ামী লীগের কর্ণধার হয়ে আসেন এম এ মুহিত। পর পর দুইবার শেখ হাসিনা সরকারের একজন সফল অর্থমন্ত্রী হিসেবে তার অগ্রযাত্রাকে কেউ আটকাতে পারেনি। বার বার মিডিয়ায় এম এ মুহিতের বক্তব্য নিয়ে সমালোচনা হলেও তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে একজন প্রিয় মন্ত্রী হিসেবে এখনো বহাল আছেন। একটি সূত্রে জানা যায় একসময় নাকি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমাকে তাহলে আরেকজন মুহিত এনে দেন অর্থাৎ অর্থমন্ত্রী মুহিতের কাজে কর্মে শেখ হাসিনা এতই সন্তুষ্ট যে তার স্থান পূরণ করার মতো বর্তমানে আর কোনো উপযুক্ত ব্যক্তির নাম তার কাছে নেই। বয়সের কারণে কখনো কখনো এম এ মুহিত কিছু কথা বললেও অন্যদিক দিয়ে তার যোগ্যতার সীমা নেই। তাই হয়তো দলের মন্ত্রী ও কেন্দ্রীয় নেতারা তার পদত্যাগ দাবি করা সত্ত্বেও প্রধানমন্ত্রী কারো কোথায় কর্ণপাত করেননি। মুহিত মুহিতের জায়গায় আছেন কিন্তু আসছে নির্বাচনে তিনি প্রার্থী না হওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন তাহলে কে আসছে সিলেট ১ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে?

সিলেট ১ আসনের গুরুত্ব অনেক কারণ অতীতে এই আসন থেকে যে দলের প্রার্থী নির্বাচিত হয়েছে তারাই সরকার গঠন করেছে। এম এ মুহিতের পূর্বে বিএনপি সরকারের অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান মৌলভীবাজারের বাসিন্দা হওয়া সত্ত্বেও সিলেট ১ আসনে প্রার্থী হয়ে বার বার জয়লাভ করেন। গুরুত্বপূর্ণ এই আসন নিয়ে আওয়ামী লীগ বিএনপি থেকে শিক্ষিত ও গুরুত্বপূর্ণ প্রার্থীর নাম আসার সম্ভাবনা রয়েছে। আসছে নির্বাচনে সিলেট ১ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির প্রার্থী হিসেবে কে মনোনয়ন পেতে পারেন এনিয়ে সিলেটে চলছে জল্পনা কল্পনা। জানা যায়, এপর্যন্ত অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাস উদ্দিন, জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ড. মোমেন ছাড়াও দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনেছেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ, দলের কেন্দ্রীয় সদস্য ও মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান এবং সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. ছহুল হোসাইন।

বাংলাদেশের ইতিহাসে অনেকদিন থেকেই সরকারের অর্থমন্ত্রী পদটি ধরে রেখেছে সিলেট। প্রথমে সাইফুর রহমান ও পরবর্তীতে এম এ মুহিত রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে এবার সিলেট ১ আসনের মনোনয়ন নিয়ে মূলত দুইজন প্রার্থীর মধ্যে লড়াই হবে। এদের একজন হলেন বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাস উদ্দিন ও জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ড.মোমেন। এই দুইজনের মধ্যে মনোনয়ন পাবেন একজন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি,সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান সম্ভবত ড. মোমেনের সমর্থনে তাদের প্রার্থীপদ থেকে সরে দাঁড়াবেন। আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক অ্যাডভোকেট মিসবাহ উদ্দিন সিরাজ এবং সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. ছহুল হোসাইন ১ আসনে মনোনয়ন পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই তবে সিলেটের অন্য কোনো আসন থেকে তাদের মনোনয়ন পাওয়ার সম্ভাবনা থাকতে পারে।

একসময় মিডিয়ায় আবুল মাল আব্দুল মুহিতকে সরিয়ে দিয়ে ড. ফরাস উদ্দিনকে অর্থমন্ত্রী করার কথা প্রকাশিত হয়। অনেকেই তখন মনে করেছিলেন এবার হয়তো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অর্থমন্ত্রী পদে পরিবর্তন আনবেন, কিন্তু তিনি তা না করে মুহিতের প্রতি তার বিশ্বাস ও আস্থা প্রকাশ করেছেন। এদিকে জাতিসংঘে বাংলাদেশের সাবেক স্থায়ী প্রতিনিধি ড. মোমেন দেশে ফিরে আসলে মুহিতের আসনে প্রার্থী হওয়ার উৎসাহ প্রকাশ করেন। আন্তর্জাতিক দিক থেকে বিবেচনা করলে ডক্টর মোমিন ও ড ফরাস উদ্দিন দুইজনই নিজ নিজ অভিজ্ঞতায় সুপরিচিত। ড. ফরাস উদ্দিন বঙ্গবন্ধুর প্রাইভেট সেক্রেটারী হিসেবে ১৯৭৩-১৯৭৫ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীতে শেখ হাসিনার সরকারে ১৯৯৮-২০০১ বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ছিলেন। পর্যবেক্ষক মহলের মতে এই দুইজনের মধ্যে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হবে তিনি নির্বাচিত হলে হতে পারেন শেখ হাসিনার আগামী দিনের সরকারের অর্থমন্ত্রী।
সম্পাদনা : ইকবাল খান

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ