Skip to main content

প্রত্যাশিত সিদ্ধান্তই নিয়েছে বিএনপি

বিভুরঞ্জন সরকার : অবশেষে আন্দোলনের অংশ হিসেবেই নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০-দলীয় জোট এবং বিএনপি প্রভাবিত জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। গত কয়দিনের নাটকীয়তার চূড়ান্ত ফল এটাই যে, বিএনপি শেষপর্যন্ত নির্বাচনে আসছে। বিএনপির এই নির্বাচন-অনুকূল সিদ্ধান্ত খুব একটা অপ্রত্যাশিত ছিলো না। কিছু গোলযোগপ্রিয় মানুষ, কিছু অপরিণামদর্শী রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং চরম আওয়ামী লীগ-বিদ্বেষী ব্যক্তি ছাড়া দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ বুঝতে পারছিলেন যে, নির্বাচনে অংশ না নিয়ে বিএনপির সামনে আর কোনো ভালো বিকল্প নেই। বিএনপি এমন কিছু দাবি সামনে নিয়ে আন্দোলনের কথা বলছিলো, যেগুলো আদায়যোগ্য বলে অনেকেই মনে করেননি। আন্দোলন করে ‘গণবিরোধী’ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার অনেক বাগাড়ম্বর বিএনপি নেতারা করেছেন। বিএনপিপন্থি বুদ্ধিজীবী-সাংবাদিকরাও তাতে তাল দিয়েছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকারকে সত্যিকার অর্থে ‘গণবিরোধী’ বলে সাধারণ মানুষ মনে করে কিনা, সেটা গভীরে গিয়ে কেউ ভেবে দেখেননি। আইয়ুব-ইয়াহিয়া-জিয়া-এরশাদের কাতারে শেখ হাসিনাকে ফেলে যারা সরকার পতনের ছক কষেন, তাদের ভাবনার গোড়ায় গলদের কথাটা তারা বিবেচনায় নেননি বা নেন না। সামরিক শাসকদের সঙ্গে শেখ হাসিনাকে গুলিয়ে ফেলার খেসারত এখন দিতে হচ্ছে বিএনপি এবং তার সহযোগী দলগুলোকে। আওয়ামী লীগ এ দেশের মানুষের প্রয়োজনে, মানুষের মধ্য থেকে গড়ে ওঠা দল। এই দলের নেতৃত্ব দিয়েছেন মওলানা ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ছিলেন এই দলের প্রাণপুরুষ। এই দলকে বিএনপি- জাতীয় পার্টির পরিণতির ভয় দেখিয়ে এক প্রকার মানসিক প্রশান্তি কেউ কেউ অনুভব করতে পারেন কিন্তু তারা মাঠের বাস্তবতা বা তৃণমূলের মানুষের হৃদ্স্পন্দন ধরতে পারেন না। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সময় বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়াকে ‘আপসহীন’ নেত্রীর অভিধা দেয়া হলেও পরবর্তী সময়ে তিনি কার্যত ‘ব্যর্থ নেত্রী’র ইমেজ গড়ে তুলেছেন। তার একটি নির্দিষ্ট সমর্থকগোষ্ঠী আছে, কিন্তু ব্যাপক জনসমর্থনপুষ্ট গণআন্দোলন গড়ে তোলার নেতৃত্ব দেয়ার সক্ষমতা যে খালেদা জিয়ার নেই, সেটাও একাধিকবার প্রমাণিত হয়েছে। আওয়ামী লীগকে ‘জনবিচ্ছিন্ন ও ক্ষমতাহীন’ ভেবে ‘দেখে নেয়ার’ চিন্তা থেকে বিএনপি বারবার ভুল রাজনৈতিক কৌশল নিয়েছে, যা কার্যত দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশের পথকেই বাধাগ্রস্ত করেছে। বিএনপিতে ভেতরে ভেতরে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছে। যতো সমর্থকই বিএনপির থাক না কেন, বাস্তবতা এখন এটাই যে, বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা এখন এক কথায় ‘ছ্যাড়াব্যাড়া’। রাজনীতিতে অবস্থান ধরে রাখার জন্য বিএনপিকে ছোট দলের আধিপত্য মেনে নিয়ে ঐক্য করতে হচ্ছে। যৌথভাবে নির্বাচন করতে গিয়ে বিএনপিকে কতোটা ছাড় দিতে হয়, কতোজনের হাতে ‘ধানের শীষ’ তুলে দিয়ে ঐক্য টেকাতে হয়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। বিএনপি রাজপথের আন্দোলনে আওয়ামী লীগ সরকারকে কাবু করতে না পেরে মনস্তাত্ত্বিক লড়াইয়ে কাবু করার কৌশল নিয়েও খুব সফল হতে পারেনি। নানা রকম গুজব ও আজগুবি কথা প্রচার করে সরকার বা আওয়ামী লীগকে ফাঁদে ফেলতে গিয়েও বিএনপিই উল্টো ফাঁদে পড়েছে। অনেক বড় বড় আওয়াজ দিয়ে শেষে প্রায় শূন্যহাতেই নির্বাচনে যেতে হচ্ছে দলটিকে। বিএনপি ও তার মিত্রদের সাত দফা এখন এক দফায় এসে ঠেকেছে নির্বাচন এক মাস পিছাতে হবে। এই দাবির প্রতি নির্বাচন কমিশন যদি ইতিবাচক সাড়া না-ও দেয়, তাহলেও বিএনপির খুব কিছু করার থাকবে না। নির্বাচন কমিশন ঘেরাও করে দাবি আদায় করার চিন্তা বাতুলতা মাত্র। এক বোকা লোক এক টাকার একটি নোট খুচরা করতে গেলে চতুর দোকানদার তাকে তিন সিকি বা বারো আনা দিয়ে বিদায় করেছিলো। এক টাকার বদলে তিন সিকি পেয়েও বোকা লোকটির খুশির সীমা ছিলো না। দিলো একটা নোট, পেলো তিনটি সিকি। লাভে লাভ। বিএনপির অবস্থা এখন অনেকটা সেই রকমই। এতো বছর অপেক্ষা করলো শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচন নয়, জেদ ধরে। আর এতো কিছুর পর, দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে ‘আন্দোলনের অংশ হিসেবে’ নির্বাচনে যেতে হচ্ছে রাজনীতিতে কিছু ‘এতিমের’ ওপর ভরসা করে। আম-ছালা হারিয়ে আওয়ামী লীগের সঙ্গে শক্তিপরীক্ষায় নেমে বিএনপিকে এখন অধিক সতর্ক থাকতে হবে। আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংঘাতে জড়াতে ছোট শরিকরা উস্কাতে পারে। সে রকম কিছু করা বিএনপির জন্য আত্মঘাতী হবে। নানা দুঃসময় ও ক্রান্তিকাল অতিক্রম এবং অশুভ শক্তিকে পরাভূত করার অভিজ্ঞতা বাঙালি জাতির আছে। সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব

অন্যান্য সংবাদ