প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘উজান’, রাজশাহী

শাশ্বত জামান :

বাবা-মায়ের সঙ্গে জীবনের প্রথমবার ট্রেনে চড়েছিলাম সেই ১৯৯৩ সালে। সেবারই প্রথম রাজশাহীতে যাওয়া। তখন আমার বয়স পাঁচ। মেজো চাচা ছিলেন রাজশাহীর ডিসি। খুব একটা বেশি মনে নেই সেই ভ্রমণের কথা। শুধু মনে আছে চাচার সরকারি বাসভবনের আমবাগানে প্রচুর আম ধরতো। আর ট্রেনের একটা ঘটনা মনে আছে। তা বেশ মজার। বাবা আমার জন্যে পানি কিনতে নিচে নেমেছিলেন। কিন্তু উনি কামরায় উঠতে উঠতে ট্রেন ছেড়ে দেয়। আমি এটা দেখে কেঁদেছিলাম। কারণ আমি ভেবেছিলাম বাবা মনে হয় স্টেশনে থেকে গেলেন। কিন্তু আমি জানতাম না ট্রেনে যে কোনো একটা বগিতে উঠলেই নিজের কামরায় চলে আসা যায়। বাবা যখন আমাদের কাছে চলে এলেন তখন এটাকে ম্যাজিকের মতো মনে হলো!

এরপরে আরেকবার রাজশাহীতে গিয়েছিলাম ২০১০ সালে। খুলনা থেকে মোটর বাইকে চেপে। কিন্তু রাজশাহী শহরে অবস্থান করিনি। শহরের উপর দিয়ে বাইক চালিয়ে চলে গিয়েছিলাম চাপাই নবাবগঞ্জের সোনামসজিদ বন্দরে।

এরপর তৃতীয়বার রাজশাহীতে যাওয়ার সুযোগ ঘটলো ২০১৮ সালের মার্চে। কলকাতা থেকে সুশীল দাদা এসেছিলেন খুলনায়। উনি আগেই আমাকে বলেছিলেন রাজশাহীতে যাবেন হাসান আজিজুল হক স্যারের বাড়িতে। আমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবেন। আমি সানন্দে রাজি হয়ে গেলাম। কারণ হাসান স্যারের সঙ্গে কথা বলা এবং ওঁনার একটা সাক্ষাৎকার নেয়ার ইচ্ছে ছিলো অনেকদিন থেকে। সেই সুযোগটা আচমকাই এসে গেলো। তাছাড়া স্যারের বাড়িতে একদিনের অতিথি হবো ভেবে ভালো লাগছিলো।

খুলনা থেকে রাজশাহীর উদ্দেশে রওনা হলাম ভোর ছয়টার ‘কপোতাক্ষ এক্সপ্রেস’ ট্রেনে। ট্রেন ভ্রমণটা আমি বেশ উপভোগ করি। বাংলার রূপ দেখতে হলে ট্রেন এবং নৌকাভ্রমণই সবচেয়ে উত্তম। একদম ভেতর থেকে প্রত্যক্ষ করা যায়। রাজশাহীতে এসে পৌঁছলাম বেলা একটায়। রেল স্টেশন থেকে সোজা চলে গেলাম বিহাস বিনোদপুরের ‘উজান’-এ। হাসান স্যারের বাড়ি। গিয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে হাসান স্যারের সঙ্গে খেতে বসলাম আমরা। স্যারের সঙ্গে সুশীল দা’র আড্ডা জমে গেলো। আমি শুধু শুনছি আর খাচ্ছি, মাঝে মাঝে টুকটাক কথা বলছি। প্রায় ঘণ্টাখানেক লাগলো খাবার টেবিলে। এরপর আবার দোতলায় আমাদের নির্দিষ্ট কক্ষে গেলাম। ইচ্ছে ছিলো ঘণ্টা দুয়েক ঘুমিয়ে রাজশাহী শহর দেখতে যাবো। কিন্তু ঘুম থেকে উঠতেই দেখলাম সন্ধ্যে সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। এখন আর ঘুরতে যাওয়া ঠিক হবে না। কারণ এই শহর আমার চেনা নয়। তবে আশে-পাশের এলাকা ঘুরে এলাম।

রাত আটটার দিকে হাসান স্যার আমাকে সময় দিলেন সাক্ষাৎকারের জন্যে। প্রথমেই আমাদের রূপসা লিটল-ম্যাগের দুটো কপি দিলাম। অনেক সময় নিয়ে পড়লেন। এরপর ওঁনার খুলনার জীবনের কিছু কিছু ঘটনা বললেন। মুক্তিযুদ্ধের সময়কার কথা বললেন। লিখালিখির বিভিন্ন উপাদান নিয়ে আলোচনা হলো। প্রায় সাড়ে দশটা পর্যন্ত হাসান স্যারের কথা শুনলাম। সুশীল দা’ এই সময়ে গিয়েছিলেন শহীদ ইকবাল ভাইয়ের বাড়িতে। দাদা সেখান থেকে ফিরলে আমরা রাতের খাবার খেয়ে নিলাম। এরপর ঘুম।

খুব ভোরে উঠলাম ঘুম থেকে। দারুণ পরিবেশ! বিশেষ করে বাড়ির ছাদটি চমৎকার! ছাদে দাঁড়ালাম অনেক সময়। সেখানে একটি বিড়ালের ঘর আছে। আর আছে ঝাপটানো আমগাছ। আমের মুকুল এসে পড়েছে ছাদে। আজ আমাকে চলে যেতে হবে ঢাকায়। ট্রেনের টিকিট কাটা রয়েছে। তাই ভাবলাম রাজশাহী শহরটা দেখে আসি যতোটা পারি। সেই হিসেবে সকালের খাবার খেয়ে বেরলাম। তালাইমারি-সাহেব বাজার হয়ে পদ্মা গার্ডেনে গেলাম। চমৎকারভাবে পদ্মার পাড় জুড়ে বিনোদন কেন্দ্র বানিয়েছে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশন। অনেক ছবি তুললাম। এরপর গেলাম পদ্মার তীরে। ওপারে ভারতের মুর্শিদাবাদের লালগোলা এলাকা। নদীতে অনেক নৌকা আর পানি বেশ স্বচ্ছ। তবে সামনে নদীর মাঝে ধূধূ বালুচর।

পদ্মা গার্ডেন থেকে ফেরার পথে গেলাম রুয়েট এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ঘুরে দেখলাম দেশের ঐতিহ্যবাহী দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ মুগ্ধ করলো। এরপর ফিরলাম স্যারের বাসায়। এসে দেখলাম হাসান স্যারের সঙ্গে আড্ডায় বসেছেন আরো কয়েকজন। আমিও পরিচিত হয়ে বসে পড়লাম। ঘণ্টা দুয়েক কেটে গেলো কিন্তু আড্ডা আর শেষ হয় না। এদিকে আমার ট্রেন বেলা তিনটেয়। আমাকে তৈরি হতে হবে। আমি উঠে পড়লাম। কিছুক্ষণ পরে সুশীল দা’ও উপরে এলেন দেখে বুঝলাম আড্ডা এবেলার মতো শেষ হয়েছে।

দুপুরে খাবার পরে আমি আর দেরি করতে চাইলাম না। সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম রেল স্টেশনের উদ্দেশে। এবারে ‘পদ্মা এক্সপ্রেস’ ট্রেন। ট্রেনে উঠে নিজের আসনে গা এলিয়ে দিয়ে ভাবতে লাগলাম, চব্বিশ ঘণ্টার এই রাজশাহী ভ্রমণ জীবনের অনেক প্রাপ্তি নিয়ে এলো। আগামীতে রাজশাহী ভ্রমণে এটা সুখস্মৃতি হয়ে থাকবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত