প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নির্বাচনি কথাকৌতুক : নোট-ভোট-জোট-চোট ও গোট!

মাহফুজ জুয়েল : নোট আর ভোট ইংরেজি শব্দ। জোট আর চোট বাংলা শব্দ। নোট আর ভোট-এর অর্থ সবাই জানেন! তাই ওদিকে আর গেলাম না। কিন্তু বাংলা জোট আর চোট নিয়ে আসুন একটু হাসুন। আমার হাতের কাছেই আছে রাজ শেখর বসু সংকলিত ‘আধুনিক’ বঙ্গভাষার ‘পুরনো’ অভিধান চলন্তিকা: জ-এ জোট। জোট মানে হচ্ছে, মিলন; দল; জট, গাঁট; উদাহরণ: জোট বাঁধা, একজোট বা সম্মিলিত চেষ্টার আয়োজন। আর চ-এ চোট; চোট মানে হচ্ছে, আঘাত, ঘা, কোপ; জোর, শক্তি; দফা, বার; উদাহরণ আশা করি দরকার নেই। কারণ আমরা, মানে আম-রা, জনগণ-রা, ভোট-জোট যা-ই হোক, চির চোট-এরই লোক! আমাদের চোটের কপাল। চোট খেতে খেতেই কাটাই একাল-সেকাল!

বিচক্ষণ পাঠক নিশ্চয়ই জানেন, বাংলাদেশের ভোটের রাজনীতি এখন জোটের রাজনীতি! তাই হয়তো এখন আর ভোট হয় না; কেবলই জোট হয়! যেমন হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ১৪ দলীয় জোট; বিএনপির নেতৃত্বে ২০-দলীয় জোট, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) নেতৃত্বে ৮-দলীয় বাম গণতান্ত্রিক জোট এবং হু. মু এরশাদের মহা এছলামি ৫৮ দলীয় জোট। এই ৫৮’র মধ্যে আবার লুকিয়ে আছে ৩৪ দলীয় এছলামি মহাজোট এবং ২২ দলীয় বাংলাদেশ জাতীয় জোট (বিএনএ)! শুনেছি এর আগে, সেই ১৯৮৮ সালে, এক জাসদ নেতা নাকি ৭০টি দল নিয়ে জোট করেছিলেন! এবারের নির্বাচনে এই জোট শব্দের হাত থেকে জনগণকে নিস্তার দিতেই আবির্ভাব হয়েছে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, নিন্দুকেরা আড়ালে যাকে ঐক্যফ্রড বলছে। যদিও তাদের উদ্যাম-আর্তনাদ দেখে মনে হচ্ছে, জনগণের জন্য বুকে আগুন জ্বলছে এবং সে কারণেই ওদের প্রাণপণ সংলাপ আলাপ প্রলাপ চলছে!

এই যে এতো এতো জোট হচ্ছে, হয়, ভোট যে-ই পাক, কে বেশি চোট পায় জানেন? সাংবাদিক আর টকশোর উপস্থাপক-উপস্থাপিকা! হা হা! কারণ এত্তগুলো দলের নাম ওই জোট বা ফ্রন্টের ‘মালিক বা প্রধান’ নিজেও জানেন না। এমনকি ছাপার অক্ষরে ছেপে দিয়ে পড়তে বললেও অনেকে ঠিকভাবে পড়তে পারেন না। দাঁত চেপে মুখ ভেংচিয়ে উচ্চারণ করতে হয়। আর স্কুল মাস্টারের মতো মুখস্থ বলতে বললে তো, এক্কেবারে কম্ম সাবাড়! কার নাম কইতে কইছেন স্যার? আমার, না আমার বাবার বাবার! এই বিভ্রম দূর করতেই হয়তো প্রথম দফায় জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ২০ জন আর ক্ষমতাসীন জোট ২৩ জনের দল নিয়ে সংলাপে অংশ নেয়। পরে দ্বিতীয় দফায় দুই পক্ষই যার যার উইকেট কেটে-ছেঁটে ১১ জন করে ছোট পরিসরে সংলাপে বসে!

আরও মহা অলৌকিক রহস্যজনক ঘটনা হচ্ছে, জোটগুলোতে দলের সংখ্যা যতো বাড়ে, দলের সংখ্যা ততোই কমে! হা হা, বুঝলেন না? হি হি, বুঝবেন না! বোঝার কথাও নয়। রাজনীতিতে এরকমই হয়। কথায় আছে না, রাজনীতিতে নেই বলে কিছু নেই। এরকম ‘হয় না’ বলেও কিছুই হয় না! জোটে লেখা থাকে ১৪ দলীয়, ১৮ দলীয়,২০ দলীয়, ৫৮ দলীয়, কিন্তু খুঁজতে গেলে শেষ পর্যন্ত কার্যত একদলীয়! সব জোট-ই হয় ভোটের চোটে। ভোটের পর সব ছোটে, ছুটি পায় বা ছুটে যায়! তাই জোটের স্লোগান দাঁড়ায় যতোক্ষণ ভোট, ততোক্ষণ জোট, তারপর ফোট্, ছোট্; এভাবেই চোট। এবং দলছুট।

এদিকে জোট বাঁধা বা ঘোঁট পাকানোর আগেই বাগে চলে এসেছেন কওমিজনক মওলানা শফি ওরফে তেঁতুল হুজুর। কোনো ওজর-আপত্তির আগেই অসম্ভব দাবিদাওয়া বেসম্ভব দ্রুতগতিতে পাওয়ায় এবং ইসলামের হেফাজত করায় প্রধাননেত্রী পেয়েছেন কওমিজননী খেতাব; শোকরানা মাহফিলে শোকর জানিয়ে ঢেঁকুর তুলে হুজুরেরা আপাতত যে যার ঘরে ফিরেছেন। হয়তো দেশের দশের প্রয়োজনে একদিন এই ঘরফেরত হুজুরেরাও হাজির হবেন অন্য কোনো জোটের নাম ঠোঁটে করে! তারাও দাড়িপাল্লা বা চাঁন-তারা না হোক অন্য কোনো অলৌকিক মার্কা নিয়ে দাঁড়াবেন। আবার স্লোগান তুলবেন: ফিরিয়ে দাও পাকিস্তান; বাংলা হবে আফগান!

এর আগে আল্লামা এরশাদ যে ৫৮ দলীয় জোট নিয়ে জাতির দরবারে হাজির হয়েছিলেন, তাও ছিলো হুজুর বা ধর্মওলাদের জোট। ওই জোটের নোটেবল নোট, ওরা পাজামা-পাঞ্জাবি টুপি-দাড়িওলা, ওদের মুখে থাকে আমার আল্লা-নবিজির ‘কোট’! যদিও ওই জোটের নামের স্মৃতি এখনই জনমন থেকে ৫৮ আলোকবর্ষ দূরে চলে গেছে।

হা হা! ভোটের বাজার দরবেশের মাজার! সেখানে যে যা চায়, সে তা পায়! তাই, জোট দেখে কেউ পাবেন না চোট, আড়ালে তার নোট হাসে, গোট হাসে; আর দুর্যোগের ঘনঘটা ঘনিয়ে আসে আমার আপনার ভাগ্যের আকাশে!

লেখক : কবি, সাংবাদিক ও আন্দোলনকর্মী

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত