প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মধ্যবিত্ত মেয়েদের জীবনবৃত্তান্ত এবং অশুভ চোখ

নাদিরা সুলতানা নদী, মেলবোর্ন, অস্ট্রেলিয়া থেকে: কিশোরী বয়েস… আমার মা-বাবা আমাকে অন্য রকম এক শাসনে রেখেছেন। সেটা হচ্ছে যা ইচ্ছে পড়ো, যা ইচ্ছে খাও, দাও… কিন্তু সেই রকম আদব কায়দা নিয়ে চলতে হবে। আদব কায়দা মানে, শ্রেণিমতে আদর-স্নেহ-মায়া-মমতা সালাম দিতে হবে। বাসায় যে কাপড় পরে থাকবো, স্কুলে যাওয়ার সময় তা না, ফিটফাট এবং শোভন উইথ জুতামোজা। এবং বড় কাজিন বিশেষ করে ভাই ব্রাদার বা দূরের কিশোর তরুণ যুবা আত্মীয় কেউ বাসায় এলে একদমই ‘চুপচুপ’। মানে এমন অনেকদিন হয়েছে, সবাই মিলে গল্প করছে, আমি হাসতে হাসতে গড়াগড়ি হওয়ার আগেই আম্মার দিকে চোখ যেতেই আমার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া। সেই থেকে চেপে যাওয়া শেখা (কেন যে তা তো বুঝলাম জীবনের অনেক বসন্ত বৃথা চলে যাওয়ার পর )। এমনই চেপে যাওয়া যে একটা প্রেম করবো, বিয়ের আগে সেটাই হয়ে ওঠেনি। না, মা শাসনে রেখেছেন, আগলে রেখেছেন, তারপরও বাসার বাইরে পড়তে বের হয়ে দেখেছি, স্কুল, কলেজ, রাস্তা, হাঁট-বাজার, ট্রেন, বাস সবখানেই আছে অনেক অনেক অশুভ চোখ, কালো হাত। ছোটখাট অনাকাক্সিক্ষত অভিজ্ঞতা হয়েছে, শিখে নিয়েছি নিজেই কোথায় কীভাবে তা সামলাতে হবে। তবে অভিজ্ঞতার ভান্ডার আমার একটু বেশিই বর্ণিল এবং তেতো। নিজের এবং কাছের অনেক অনেক পরিচিত মেয়ে বন্ধুর অনেক বেদনার গল্প আমি জানি…। জীবন চলার পথে ফেরেস্তারূপি দেবতা মানুষ পেয়েছি, পেয়েছি শয়তানরূপি অসুর।

ছোটবেলা বা কিশোরী বেলাটা আমাদের মেয়েদের যেভাবে বড় করা হয়, কলেজ যাওয়ার পথে অনাকাক্সিক্ষত একটা ছেলে মানুষের হাতের সাথে হাতের স্পর্শও মানসিকভাবে অসুস্থ করে দেয় আমাদের। সব মেয়েদের পারসোনালিটিতেই ঘুরে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করার সাহসটা থাকে না।

আমাদেও, বিশেষ করে নিম্নবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়েদের তো চিন্তার বাইরে সব অভিজ্ঞতা নিয়ে বড় হতে হয়। পরিবারের কাছের কেউ বা রাস্তা-ঘাটে অফিসে কোন না কোনোভাবে অনাকাক্সিক্ষত শারীরিক হেনস্থা হতেই হয় এবং আমরা বেশির ভাগ মেয়েই চেপে যাই এটা। পরিবার, সমাজ আমাদের এটাই শেখায়!

একটা স্কুল কলেজ পড়া মেয়ের মানসিক স্বাস্থের একটা বিশাল ক্ষত হয়ে যায় শুধু এই কারণেই। আমি নিজেও হয়েছি… সামলেও নিয়েছি! আজ যে সময় দাঁড়িয়ে আমি নিজেকে সাহসী মনে করি বা অন্যদের সাহসী হতে বলি, সেটা অর্জন করা খুব বেশি কঠিন। তারপরও বলবো, metoo#- তে সাহস করে দুই একজনই বলবে হয়তো জীবনের খুব খারাপ একটা সময়ের কথা। যারা বলবে, বলাই বাহুল্য তাদের সেই খারাপ সময়টুকু অল্প কিছু মানুষকেই কেবল ছুঁয়ে যাবে। আমি ব্যক্তিগতভাবে চাই :

এক. যে বা যারা এই অসুস্থতা নিয়ে কারো না কারও জীবনের কিছু সময় বিষময় করেছে তারা বুঝুক এটা অন্যায় অনেক বড় অন্যায়… দিনের পর দিন পার পেলেও সময়ের মুখোমুখি সবটুকু ঘেন্না তাদের প্রাপ্য।

দুই. যে বা যাদের জীবনে এমন ঘটেছে, যদি সেই সময়টুকুর প্রভাব কাটিয়ে উঠে থাকেন, ঘুরে দাঁড়ানোর গল্পটাও বলেন… একটা মানুষের কালো হাত, কুৎসিত হাতের স্পর্শ যে আপনাকে জীবন থেকে ছিটকে দেয়নি, দিতে পাওে না, সেই গল্পও বলেন। আমাদের বলতে হবে… কাটিয়ে উঠতে হবে, যুগ যুগ ধরে ঘটে যাওয়া অসভ্যতা, সুস্থ সুন্দর আবহে একটা জীবন কাটানোর জন্যে নিজের দেশে, নিজের মতো করে।

লেখক : সাংস্কৃতিক কর্মী ও ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ