প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সেনাবাহিনীকে ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব প্রদানের আইনসিদ্ধতা

ইকতেদার আহমেদ : বর্তমানে বাংলাদেশে বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেট, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেট নামক তিন ধরনের ম্যাজিস্ট্রেট রয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট নামক স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বিশিষ্ট কোনো পদ নেই। বিচার বিভাগের অতিরিক্ত জেলা জজ, যুগ্ম জেলা জজ, সিনিয়র সহকারি জজ ও সহকারি জজ পদে নিয়োজিত বিচারকদের বিচারিক ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন) ক্যাডারের বিভাগীয় কমিশনার, অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার, ডেপুটি কমিশনার, অতিরিক্ত ডেপুটি কমিশনার ও সহকারি কমিশনার পদে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব প্রদান করা হয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের যে সকল ক্ষমতা অর্পণ করা যায় তার সকল অথবা যেকোনো ক্ষমতা অর্পণপূর্বক যেকোনো ব্যক্তিকে বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে সরকার নিয়োগ প্রদান করতে পারে।

ফৌজদারি কার্যবিধির ধারা নং ৬৪, ৬৫, ৮৩, ৮৪, ৮৬, ৯৫(২), ১০০, ১০৫, ১০৭, ১০৯, ১১০, ১২৬ক, ১২৭, ১২৮, ১৩০, ১৩৩ এবং ১৪২ এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটিত হলে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার এবং অপরাধ দমনের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারেন। উপরোক্ত যে সকল ক্ষমতা একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট প্রয়োগ করতে পারেন এর সকল ক্ষমতা একজন বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেটও প্রয়োগ করতে পারেন। তাছাড়া একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯-এর তফসিলে উল্লেখিত ১১০টি আইনের অধীনকৃত অপরাধ বিচারের ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোবাইল কোর্ট আইনের তফসিলে উল্লিখিত যে সকল আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধ বিচারের জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত অনুরূপ ক্ষমতা একজন বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেটকেও প্রদান করা যায়।

বাংলাদেশের সংবিধানে শৃঙ্খলা বাহিনীর যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে এর মধ্যে সেনাবাহিনী অন্তর্ভুক্ত। বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। নির্বাচন কমিশনকে সংসদ সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠানসহ অপরাপর নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। সংবিধানে বলা আছে সংসদ সদস্যদের নির্বাচন অনুষ্ঠান পরিচালনায় বা অপর যেকোনো নির্বাচন অনুষ্ঠান পরিচালনায় নির্বাচন কমিশনের যেরূপ কর্মচারির প্রয়োজন হবে নির্বাচন কমিশন অনুরোধ করলে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনকে সেরূপ কর্মচারি প্রদানের ব্যবস্থা করবেন। তাছাড়া সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ রয়েছে- নির্বাচন কমিশনের নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সকল ধরনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য।

গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২- এ শৃঙ্খলা বাহিনীর যে সংজ্ঞা দেয়া আছে তাতে একদা সেনাবাহিনী অন্তর্ভুক্ত ছিলো। পরবর্তী সময়ে আইনটি সংশোধনের মাধ্যমে সংজ্ঞা হতে সেনাবাহিনীকে বাদ দেয়া হলেও তা নির্বাচনকালীন সময়ে সেনাবাহিনী নিয়োগে অথবা বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী নিয়োগে অন্তরায় কি-না এমন প্রশ্নের উদ্ভাবনে কেউ কেউ এটিকে অন্তরায় হিসেবে দাবি করেন। সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের কর্ম বিষয়ে বলা হয়েছেÑ ‘প্রজাতন্ত্রের কর্ম’ অর্থ অসামরিক বা সামরিক ক্ষমতায় বাংলাদেশ সরকার সংক্রান্ত যেকোনো কর্ম, চাকরি বা পদ এবং আইনের দ্বারা প্রজাতন্ত্রের কর্ম বলে ঘোষিত হতে পারে এরূপ অন্য কোনো কর্ম।

নির্বাচন কমিশন প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত সামরিক বা বেসামরিক যেকোনো ব্যক্তির সেবা নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কাজে গ্রহণ করতে চাইলে সংবিধান এ ক্ষেত্রে কোনো ধরনের অন্তরায় নয়। সুতরাং গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সংজ্ঞায় সেনাবাহিনী অন্তর্ভুক্ত নয় এমন দাবিতে সেনাবাহিনীকে নির্বাচনকালীন ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্বে অথবা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব হতে বিরত রাখার দাবি সংবিধানের বিধানাবলির আলোকে কোনোভাবেই যৌক্তিক মর্মে বিবেচিত হয় না।

ইতোপূর্বে বিভিন্ন সময়ে জাতীয় সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠানকালীন সেনাবাহিনীকে স্ট্রাইকিং ফোর্স এবং নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব দিয়ে নিয়োগ করা হয়েছিল। বিভিন্ন নির্বাচনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে দেখা যায় সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে দায়িত্ব পালনে সেনাবাহিনী যতোটা না সফল তার চেয়ে অনেক অধিক সফল যদি সে দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে তাদের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের ক্ষমতা অর্পণ করা হয়। এ বাস্তবতায় জাতীয় সংসদ নির্বাচনকালীন সেনাবাহিনীকে বিশেষ ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের দায়িত্ব অর্পণ সংবিধান ও ফৌজদারি কার্যবিধির বিধান অনুযায়ী সম্পূর্ণরূপে আইনসিদ্ধ।

লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

iktederahmed@yahoo.com

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ