প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘ঐক্যবদ্ধ’ আওয়ামী লীগ ‘অভিভাবকহীন’ বিএনপি

ডেস্ক রিপোর্ট : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই সাংগঠনিক কর্মসূচি পালনের মাধ্যমে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম নগর চট্টগ্রামে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো সরব। তফসিল ঘোষণার পরও সংগঠনটি ধারাবাহিক সভা-সমাবেশ করছে। নির্বাচন ঘিরে সংগঠনের শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের মধ্যে দূরত্ব কমতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিন পরস্পর বিরোধে জড়িয়ে থাকা নেতাদের অনেককে একসঙ্গে বিভিন্ন কর্মসূচিতে দেখা যাচ্ছে।

অন্যদিকে তফসিল ঘোষণার এক দিন আগে বুধবার ঢাকায় গ্রেপ্তার হন চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন। এর আগে একই কমিটির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাসেম বক্কর, বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম, নগর কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল ইসলামসহ বেশ কিছু নেতা বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে এখন কারাগারে। তার আগে মহানগর বিএনপির সাবেক সভাপতি বর্তমানে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী গ্রেপ্তার হন। এ ছাড়া বিএনপির কেন্দ্রীয়, নগর, থানা ও ওয়ার্ড পর্যায়ের আরো অনেক নেতাকর্মী বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছে।

এ অবস্থায় মামলা-গ্রেপ্তার আতঙ্কে তফসিল ঘোষণার পর থেকেই নগর বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা আত্মগোপনে রয়েছেন। অধিকাংশ নেতার ফোন এখন বন্ধ। আবার অনেকে উচ্চ আদালত থেকে জামিনের চেষ্টায় রয়েছেন বলে বিএনপি সূত্রে জানা গেছে।

সব মিলিয়ে চট্টগ্রামে আগামী নির্বাচন ঘিরে ‘ঐক্যবদ্ধ’ আওয়ামী লীগের বিপরীতে সরকারবিরোধী অবস্থানে থাকা মহানগর বিএনপি এখন কার্যত ‘অভিভাবকহীন’। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের চট্টগ্রামের নেতাদের দেখা যাচ্ছে না রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচিতে। তবে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের অন্যতম শরিক জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির নগরের বিভিন্ন এলাকায় সরকারবিরোধী প্রচারণা চালাচ্ছে বলে খবর রয়েছে। কয়েক দিন আগে নগরে জামায়াত-ছাত্রশিবির কার্যালয়ে বোমা বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটেছে।

আওয়ামী লীগ : বিভিন্ন ইস্যুতে দীর্ঘদিন ধরেই বিরোধ ছিল চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষপর্যায়ের নেতাদের মধ্যে। নির্বাচন সামনে রেখে নেতাদের সেই বিরোধ অনেকটাই মিটেছে বলে দলীয় সূত্রগুলো দাবি করছে। ইতিমধ্যে সংগঠনের কর্মসূচিগুলোতে নগর আওয়ামী লীগের সভাপতি, সাধারণ সম্পাদক, কোষাধ্যক্ষসহ অনেক নেতাকে দেখা গেছে। গত ২৭ অক্টোবর নগর বিএনপি কার্যালয়ের সামনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সমাবেশের দিন নগর আওয়ামী লীগও মাঠে ছিল। ওই দিন নগরের ইপিজেড চত্বরে আওয়ামী লীগ আয়োজিত সমাবেশে মেয়র ও সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দীন, সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন ও আলতাফ হোসেন চৌধুরীসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা ছিলেন।

এরপর রবিবার বিকেলে আগ্রাবাদ বাদামতলী এলাকায় মহানগর আওয়ামী লীগ আয়োজিত সমাবেশেও শীর্ষপর্যায়ের নেতারা ছিলেন। শনিবার চট্টগ্রাম কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরে মহানগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে জেলহত্যা দিবস উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশেও অনেক নেতাকে একসঙ্গে দেখা গেছে। বর্ধিত ও কার্যনির্বাহী কমিটির সভাগুলোতেও অধিকাংশ নেতা আসছেন বলে প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ফারুক জানান। সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার ইপিজেড মোড়ে মহিলা সমাবেশ হয়েছে। তাতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ছিলেন।

নির্বাচন সামনে রেখে নগরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করছেন আ জ ম নাছির উদ্দীন।

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নগর আওয়ামী লীগ এখন অনেক বেশি চাঙ্গা। সরকারের উন্নয়নকাণ্ড আমরা সাংগঠনিক কর্মসূচিগুলোতে তুলে ধরছি। দলে এখন কোনো বিরোধ নেই। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে দলীয় কর্মসূচি পালন করছি। আগামী নির্বাচনে দল যাকে মনোনয়ন দেবে আমরা তাকে বিজয়ী করতে কাজ করব।’

একই কমিটির প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক শফিকুল ইসলাম ফারুক বলেন, ‘মহানগর আওয়ামী লীগের ধারাবাহিক কর্মসূচির অংশ হিসেবে দলকে সাংগঠনিকভাবে আরো শক্তিশালী করতে আমরা বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছি। প্রতিদিনই কোনো না কোনো সাংগঠনিক কর্মসূচি থাকছে। দলীয় সাবেক ও বর্তমান এমপিরা ছাড়া কমিটির অন্যরা কর্মসূচিগুলোতে আসছেন।’

আওয়ামী লীগ নেতারা জানান, সাংগঠনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি নগরের উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সমন্বয় করার উদ্যোগ নিয়েছেন দলীয় নেতারা। এ লক্ষ্যে ৬ নভেম্বর মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের সঙ্গে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান আবদুচ ছালামের বৈঠক হয়। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি, বিভিন্ন রাজনৈতিক জোট নিয়েও তাদের মধ্যে কথা হয়।

বিএনপি : তথ্য-প্রযুক্তি আইনে দায়ের হওয়া মামলায় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সাবেক সভাপতি আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীকে ২১ অক্টোবর চট্টগ্রাম কারাগারে পাঠান আদালত। ওই দিন আদালত প্রাঙ্গণে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে চট্টগ্রামে বিএনপির ১৫০ নেতাকর্মীর নামে কোতোয়ালি থানায় মামলা হয়। এই মামলায় ২৭ অক্টোবর জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাবেশ সফল করার লক্ষ্যে গত ২২ অক্টোবর প্রস্তুতি সভা থেকে ফেরার পথে গ্রেপ্তার হন বিএনপির চট্টগ্রাম বিভাগীয় সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবুর রহমান শামীম ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর।

দলীয় সূত্রে জানা যায়, একই মামলায় আসামি হওয়ার পর থেকে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে কম উপস্থিত ছিলেন মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন। তবে ২৭ অক্টোবর নগর বিএনপির কার্যালয়ের সামনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের চট্টগ্রামের সমাবেশে ছিলেন তিনি। এদিকে পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন নিতে গিয়ে গত ৪ নভেম্বর ঢাকায় গ্রেপ্তার হন চট্টগ্রাম নগর বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল ইসলাম, কোতোয়ালি থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক জাকির হোসেন, নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সাংগঠনিক সম্পাদক জিয়াউর রহমান জিয়া ও ছাত্রদলের যুগ্ম সম্পাদক জমির উদ্দীন নাহিদ। এ ছাড়া গত বুধবার ঢাকায় গ্রেপ্তার হন ডা. শাহাদাত হোসেন ও যুবদল নেতা শামসুল হক।

দলীয় নেতাদের অভিযোগ, ঐক্যফ্রন্টের চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমাবেশের আগে-পরে তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের সংখ্যা বেড়ে গেছে। নেতাকর্মীদের মধ্যে হামলা-মামলা আর গ্রেপ্তার আতঙ্ক বিরাজ করছে। অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছেন। অনেকের ব্যক্তিগত মোবাইল ফোনও বন্ধ। নগরের দলীয় কার্যালয়ের সামনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ছাড়া কোনো নেতাকর্মীকে দেখা যাচ্ছে না।

এসব বিষয়ে জানতে ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করা নগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া গেছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক এস এম সাইফুল আলম গতকাল বিকেলে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা কেন্দ্রীয় কর্মসূচির দিকে তাকিয়ে আছি। ইতিমধ্যে নগর কমিটির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকসহ ৩৫ জনকে গায়েবি মামলায় গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন থানা ও ওয়ার্ডে শীর্ষ পর্যায়ের নেতা থেকে শুরু করে তিন শতাধিক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। প্রত্যেক ওয়ার্ডে ১৫ থেকে ২০টি করে মামলা দেওয়া হচ্ছে। আমাদেরকে সাংগঠনিক কর্মসূচি পালন করতে দিচ্ছে না।’

নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেনের একান্ত সহকারী মোহাম্মদ মারুফ বলেন, ‘স্যারের বিরুদ্ধে ৩৮টি মামলা দেওয়া হয়েছে। প্রায় মামলায়ই তিনি জামিনে রয়েছেন। তার পরও তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের কর্মসূচির পর থেকে বেশি মামলা দেওয়া হচ্ছে।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ