প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আদর্শ নির্বাচনী ব্যবস্থা যেন সোনার হরিণ

ডেস্ক রিপোর্ট : ৪৭ বছর বয়সী বাংলাদেশ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মুখোমুখি। সব ঠিক থাকলে আগামী ২৩ ডিসেম্বর হবে ভোট। নতুন বছরের শুরুতে গঠিত হবে নতুন সংসদ ও সরকার। কিন্তু কেমন ভোট হবে, কেমন সংসদ ও সরকার প্রাপ্তি ঘটবে—জনমনে জল্পনাকল্পনার রংধনু। অনেকের প্রশ্ন, প্রথম সংসদ নির্বাচন থেকে এ পর্যন্ত একটি আদর্শ নির্বাচনী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আমরা কতটা সক্ষম হয়েছি। বিষয়গুলোর ওপর আলোকপাত করতেই আজকের বিশেষ কালের কণ্ঠ। প্রতিবেদনগুলো লিখেছেন আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি কাজী হাফিজ

সাতচল্লিশ বছর বয়সী স্বাধীন বাংলাদেশে আজও নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা প্রশ্নের সম্মুখীন। সব পক্ষের মনঃপূত নির্বাচনী ব্যবস্থা যেন এক সোনার হরিণ। বিশেষ করে জাতীয় সংসদের নির্বাচনের সময় বিদ্যমান নির্বাচনী ব্যবস্থার বিরোধিতা দেশে প্রায় স্বাভাবিক ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের কারো মতে, নির্বাচনের কাঠামো বা পদ্ধতিতেই গলদ রয়েছে। আবার কেউ বলছেন, নির্বাচনী কাঠামো নিয়ে তেমন কোনো সমস্যা নেই, সমস্যা ব্যবস্থাপনায়। দেশে আদর্শ নির্বাচনী ব্যবস্থাপনা আজও গড়ে না ওঠার অন্যতম কারণ হচ্ছে সুষ্ঠু নির্বাচন করার জন্য রাজনৈতিক অঙ্গীকারের অভাব।

ড. এ টি এম শামসুল হুদার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন ২০১১ সালের এপ্রিলে কমিশনের যে পঞ্চবার্ষিক কৌশলগত পরিকল্পনাপত্র প্রকাশ করে তাতে বলা হয়, ‘পুরো নির্বাচনপ্রক্রিয়া চলাকালীন আমাদের দেশে সংঘর্ষপ্রবণ রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিভিন্ন ধরনের প্রকাশ ঘটে থাকে। পেশিশক্তি ও টাকার সাহায্যে প্রার্থীদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার সমতল মাঠের চরিত্র নষ্ট করে দেওয়া হয়। প্রতিযোগী প্রার্থীদেরকে শোভন-সুন্দর নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে বাধাগ্রস্ত করা হয়। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সদস্য ও নারীদের ভয়ভীতি দেখানো হয় কিংবা ভোট কিনে নেওয়া হয়। আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আরেকটি দিক হচ্ছে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার প্রতি শীর্ষ পর্যায়ের রাজনীতিকদের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। যত সুষ্ঠুভাবেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক না কেন, পরাজিত দল নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ করবেই। এই আচরণ সুষ্ঠু নির্বাচনপ্রক্রিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশের ক্ষেত্রে অন্তরায়।’

নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের মতে, নব্বইয়ের স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, তৎকালীন প্রধান বিচারপতিকে উপরাষ্ট্রপতি এবং পরে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব দিয়ে সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল দেশের নির্বাচনী ব্যবস্থার ক্ষেত্রে একটি বড় ধরনের চমক। এরপর নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচনের তীব্র বিরোধিতা হয় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। সে সময় নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের লক্ষ্যে দেশে ব্যাপক আন্দোলনের মাধ্যমে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু হয়। ১৩তম সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৯৬ সালের ২৮ মার্চ সংবিধানে এটি অন্তর্ভুক্ত হয়। কিন্তু অনির্বাচিত ব্যক্তিদের হাতে দেশের শাসনভার তুলে দেওয়ার এ বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক শুরু হতে বেশি সময় লাগেনি। ২০১১ সালের ১০ মে সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের রায় দেন। এরপর ২০১১ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশের সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এ সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয় এবং ফিরে আসে নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচন ব্যবস্থা। এ ব্যবস্থায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় দশম জাতীয় সংসদের একপক্ষীয় নির্বাচন।

একই ব্যবস্থায় একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও আসন্ন। এ নির্বাচন সামনে রেখে নির্বাচনী ব্যবস্থার পরিবর্তনে পক্ষে-বিপক্ষে সরব রাজনৈতিক অঙ্গন। আসন্ন এ নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক এবং নিরপেক্ষ হবে কি না, সে বিষয়েও সংশয় দূর হচ্ছে না। কারো মতে, বর্তমানে নির্বাচনের ব্যাপারে গণ-উদাসীনতা দেখা যাচ্ছে। দেশের বেশির ভাগ মানুষ মনে করে এখন সুষ্ঠু, অবাধ ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বিরাজ করছে না। নির্বাচনে ‘ক্ষমতাভীতি’ সর্বগ্রাসীরূপে দেখা দিয়েছে। গত ২৩ মার্চ সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশিষ্ট নাগরিকরা এমনই হতাশাজনক মত প্রকাশ করেন।

নির্বাচনী ব্যবস্থা সংস্কার নিয়ে যা হচ্ছে : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে গত বছরের ৩১ জুলাই নির্বাচন কমিশন (ইসি) আয়োজিত সংলাপে সুধীসমাজের প্রতিনিধিদের বেশির ভাগই নির্বাচনে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অংশ হিসেব সেনাবাহিনী মোতায়েনের ব্যবস্থা নিতে বলেন। ‘১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ও ২০১৩ সালের ৫ জানুয়ারির মতো একপক্ষীয় নির্বাচন দেখতে চাই না’ বলেও মন্তব্য করেন তাঁরা। ঢালাওভাবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচন প্রতিরোধে ‘না’ ভোটের বিধান পুনর্বহাল, ইসির নিজস্ব কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে রিটার্নিং অফিসার নিয়োগ, সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া, প্রার্থীদের হলফনামায় দেওয়া তথ্য যথাযথভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি করা, প্রশাসন ঢেলে সাজানো, মনোনয়ন বাণিজ্য নজরদারিতে রাখা, প্রবাসীদের ভোটার করার সুপারিশও করা হয় ওই সংলাপে। প্রস্তাব দেওয়া হয় নির্বাচনের সময় সংসদ ভেঙে দেওয়ার। এ প্রস্তাবের বিপক্ষেও মতামত আসে।

এরপর গত বছর ১৬ আগস্ট এক সংলাপে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে দেশের গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা নির্বাচন কমিশনকে তাদের সাংবিধানিক ক্ষমতা কঠোরভাবে প্রয়োগের আহ্বান জানিয়ে বলেন, ‘কমিশনকে রিয়াল রোল প্লে করতে হবে। সুষ্ঠু নির্বাচনের স্বার্থে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো যেভাবে চাইবে, সেভাবে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। ভোটারদের আস্থা অর্জনের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য এখন থেকেই লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরিতে পদক্ষেপ নিতে হবে।’ নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েন প্রশ্নে গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বরা ওই দিন তিন ধরনের মত প্রকাশ করেন। চারজন সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিপক্ষে মত দেন। পক্ষে বলেন ছয়জন। নির্বাচন কমিশন ও রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে সেনা মোতায়েন করা যেতে পারে বলে মত প্রকাশ করেন পাঁচজন। আর আটজন এ প্রসঙ্গে কোনো মন্তব্য করেননি। আগামী নির্বাচন কিভাবে করা হবে সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে বসা জরুরি বলেও মত দেন তাঁরা।

এরপর গত বছরের ২৪ আগস্ট থেকে ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপে নির্বাচনী ব্যবস্থাপনার সংস্কারে এমন অনেক প্রস্তাব দেওয়া হয়, যার বাস্তবায়ন ইসির এখতিয়ারের বাইরে। সংসদে নারী আসন বাড়িয়ে তাদের জন্য সরাসরি নির্বাচন দাবি করে কয়েকটি দল। বিশেষ ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েন চায় বিএনপিসহ ২৫টি দল। বিদ্যমান আইনের বাইরে সেনা মোতায়েনের বিপক্ষে মত দেয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ ৯টি দল। আর সেনা নিয়োগ বিষয়ে স্পষ্ট কোনো মতামত দেওয়া থেকে বিরত থাকে বা বিষয়টি নির্বাচন কমিশনের ওপর ছেড়ে দেয় ছয়টি দল। নির্বাচনে ইভিএম ব্যবহারের পক্ষে প্রস্তাব রাখে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগসহ ছয়টি দল। বিপক্ষে মত দেয় ১২টি দল আর বাকি ২০টি দল স্পষ্ট কোনো মতামত দেয়নি। সংসদ ভেঙে সহায়ক বা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন চায় ২০টি দল। এর বিপক্ষে বিদ্যমান সংবিধান অনুসারে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অধীনেই নির্বাচন চায় ৯টি দল। এ বিষয়ে ভিন্ন ধরনের প্রস্তাব রাখে বা স্পষ্ট কোনো মতামত দেয়নি ১১টি দল।

এরপর ওই বছরের ২৪ অক্টোবর দেশের সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের মধ্যে কয়েকজন বর্তমান কমিশনের সঙ্গে সংলাপে এই মত প্রকাশ করেন, দেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের সবচেয়ে বড় বাধা বিশৃঙ্খলা। একটি নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে করার চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সংলাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে অর্জিত আস্থা ধরে রাখতে হবে। নির্বাচন কমিশনের এখন থেকে এক বছরের মধ্যে এমন কিছু করা যাবে না, যাতে আস্থা বিনষ্ট হয়। অন্যদিকে বর্তমান পরিস্থিতি ও পরিবেশ মেনে নিয়েই সব রাজনৈতিক দলকে নির্বাচনে আসতে হবে। তাঁরা এ কথাও বলেন, সংবিধান মোতাবেক দলীয় সরকারের অধীনেই নির্বাচন কমিশনকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করতে হবে, তাই এটি অত্যন্ত জটিল হবে।

সংলাপ শেষে গত বছরের ২৬ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলনে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নূরুল হুদা সাংবাদিকদের জানিয়ে দেন, ‘সংসদ ভেঙে নির্বাচনের বিষয়ে সরকারকে আইন সংশোধনে বাধ্য করা বা চাপ সৃষ্টির কোনো সুযোগ নির্বাচন কমিশনের নেই। আর আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে বিবদমান ইস্যুতে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার কোনো উদ্যোগও নির্বাচন কমিশন নেবে না। আইনে পরিবর্তন আনার দরকার নেই। যে আইন রয়েছে তাই যথেষ্ট। আইন প্রয়োগ করতে হবে।’

কিন্তু আইনের প্রয়োগ যে হচ্ছে না, নির্বাচনে পুলিশ ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা পক্ষপাতমূলক আচরণ করেও পার পেয়ে যাচ্ছেন, তা সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনার মাহবুব তালুকদারের ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ, অংশীদারমূলক ও গ্রহণযোগ্য করার লক্ষ্যে কতিপয় প্রস্তাব’-এ উঠে আসে। গত ১৫ অক্টোবর তিনি নির্বাচন কমিশনের সভায় এ প্রস্তাব উত্থাপন করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু অন্য নির্বাচন কমিশনারদের বিরোধিতায় তা করতে পারেননি। এ কারণে তিনি নিজের বাক্স্বাধীনতা হরণের অভিযোগে নোট অব ডিসেন্ট দিয়ে সভা বর্জন করেন।
সূত্র : কালের কন্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত