প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

একটি প্রেমের কবিতার অপমৃত্যু

হাসান মীর : সব মানুষের জীবনেই কিছু সাফল্য থাকে, থাকে ব্যর্থতাও। আলো এবং অন্ধকারের মতো এই সব সাফল্য ও ব্যর্থতাকে ঘিরেই আমাদের জীবন। আমার সেই আলো-আঁধারি জীবনের ছোট একটা স্মৃতি পাঠকদের সামনে তুলে ধরছি। চার দশকেরও আগের ঘটনা, আমি তখন রাজশাহী বেতার কেন্দ্রের বার্তা বিভাগে কাজ করি।

তখন সারাদিনে একবার, বিকেল সাড়ে পাঁচটায় একটি মাত্র স্থানীয় সংবাদ প্রচারিত হতো (এখন তা সম্ভবত পাঁচটিতে উন্নীত হয়েছে) ফলে দিনের প্রথমভাগে সেই অর্থে খুব একটা ব্যস্ততা থাকতো না।  এই সময়টা আমার কাটতো সহকর্মীদের সাথে আড্ডা দিয়ে, রেডিওতে গান শুনে, পত্রিকা পড়ে অথবা একা একা রবীন্দ্রনাথের কবিতা আবৃত্তি করে। আমাদের বেশ কয়েকজন সংবাদ পাঠক-পাঠিকা ছিলেন, কেউ সপ্তাহে দুদিন কেউবা তিন দিন খবর পড়তেন। ধরা যাক এদেরই একজন মিসেস রহমান (প্রকৃত নাম নয় ) রাজশাহীতে কর্মরত এক পদস্থ কর্মকর্তার স্ত্রী, উচ্চ শিক্ষিতা, সংস্কৃতিমনা এবং সুন্দরী । খবর পড়া ছিল তার নিতান্তই শখ, কারণ একেতো সম্মানীর পরিমাণ ছিলো খুবই সামান্য এবং রাজশাহী বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠান দূরবর্তীস্থান থেকে শোনাও যেতো না। মিসেস রহমান একদিন খবর পড়তে এসে আমার টেবিলে সঞ্চয়িতা দেখে আগ্রহ প্রকাশ করলেনÑআপনি অফিসে বসে কবিতা আবৃত্তি করেন নাকি! বললাম, ঠিক আবৃত্তি নয়, অনেক সময় নিতান্তই বসে থাকি তখন সময় কাটাই। সেদিন কবিতা প্রসঙ্গে কথা হয়েছিল ওই পর্যন্তই। এর কয়েকদিন পর একদিন বেলা এগারোটার দিকে তার ফোন এলোÑকি করছেন, কবিতা পড়ছিলেন নাকি? আমি প্রসঙ্গ এড়াতে চাই, কী যে বলেন! এটা কি কবিতা পড়ার সময় হলো। আমার সামনে আর কেউ আছে কিনা তিনি জানতে চাইলে না সূচক জবাব দিলাম। এবার তিনি অনেকটা আবদারের সুরেই বললেন, তাহলে একটা কবিতা শোনান, আপনার পছন্দের যে কোন কবিতা। আমি অনেক ওজর-আপত্তি করে শেষ পর্যন্ত বাঁশি কবিতাটি শোনালাম। এ ভাবেই শুরু।  এরপর সাত দিন, দশ দিন অন্তর ওই বেলা এগারটা থেকে বারোটার মধ্যে বাংলো থেকে টেলিফোন করতেন আর আমি তার অনুরোধ রক্ষা করে সঞ্চয়িতার পাতা উলটে যেতাম। (বস্তুত ওই সময়টায় তার স্বামী অফিসে আর ছেলেটি স্কুলে থাকতো এবং একাকীত্ব কাটাতে তিনি আমার শরণাপন্ন হতেন )  তো সেই যে কথায় বলে, চোরের দশ দিন তো গৃহস্থের একদিন। আমার স্ত্রী একদিন দুপুরে জরুরি প্রয়োজনে বাসা থেকে ফোন করেছেন (বলে রাখা ভালো, সে আমলে মোবাইল ফোন ছিল না) কিন্তু বারবারই বিজি টোন অর্থাৎ টেলিফোন এনগেজড পাচ্ছেন।

এত দীর্ঘ সময় বিজি থাকার কথা নয়, তা হলে কি লাইন খারাপ, এই ভেবে তিনি টেলিফোন এক্সচেঞ্জে তার পরিচিত এক মহিলাকে বিষয়টি দেখতে বললেন। মহিলা লাইন টেস্ট করতে গিয়ে দেখলেন লাইনের কোন ত্রুটি নয়, বরং আমি কাউকে কবিতা পড়ে শোনাচ্ছি। তিনি আমার স্ত্রীকে কিছু না বলে আমাদের দু’জনের কথোপকথনের লাইনে আমার স্ত্রীর টেলিফোন লাইনের সংযোগ দিয়ে দিলেন। এরপর আর কী বাকি থাকে, তিনি নিজের কানেই শুনলেন আমি গলায় ঢেউ তুলে এক মহিলাকে প্রেমের কবিতা পড়ে শোনাচ্ছি। দুপুরে বাসায় খেতে গেলে তিনি কিছু বললেন না, তবে বিকেলে খবর প্রচারের সময় আবার যখন অফিসে যাচ্ছি তখন বললেন, তোমাদের অফিসে সঞ্চয়িতা থাকলে এনো তো। আমি কারণ জানতে চাইলে বললেন, শুনলাম তুমি নাকি ভালো আবৃত্তি করো, রাতে তোমার কাছে কবিতা শুনবো। তার কণ্ঠ স্বাভাবিক ছিল কিন্তু মেঘমুক্ত আকাশেও আমি ঝড়ের পূর্বাভাস লক্ষ্য করলাম। রাতে ঘটলোও তাই।

স্ত্রীর সেই এক কথা, তুমি ওই মহিলাকে টেলিফোনে যে কবিতাটি শোনাচ্ছিলে সেই কবিতাটি আমাকেও শোনাও। অন্যের স্ত্রীকে যে কবিতা শোনাতে পারো, নিজের স্ত্রীকে সেই একই কবিতা শোনাতে আপত্তি কেন! যাইহোক, নাকে-কানে খত দিয়ে বহু কষ্টে সেই বিপদ থেকে রক্ষা পেলাম। সেই থেকে টেলিফোনে কবিতা পড়া বাদ, আর মাস কয়েক পর মহিলার স্বামী অন্যত্র বদলী হয়ে যাওয়ায় তার সাথে যোগাযোগও নেই। এবার শেষ কথাটি বলি। সেদিন মহিলাকে যে কবিতাটি শোনাচ্ছিলাম সেটি মানসী কাব্যের অন্তর্গত অনন্ত প্রেম। আর একটি কথা, যদি বিশ্বাস করেন তো বলি, সেই ঘটনার পর আজ পর্যন্ত ওই কবিতাটি আর কখনও নিজেও পড়িনি, কাউকে পড়েও শোনাইনি। বি.দ্র. : উত্তমপুরুষে বর্ণিত এই গল্পের কাহিনীর সঙ্গে বাস্তব কোনো ঘটনা বা চরিত্রের মিল থাকলে তা হবে নিতান্তই কাকতালীয়। লেখক : সাংবাদিক। ফেসবুক থেকে। সম্পাদনা : রেআ