প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএনপি নির্বাচনে আসছে কি?

বিভুরঞ্জন সরকার : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিভিন্ন রাজনৈতিক জোট এবং দলের সঙ্গে আওয়ামী লীগের আলোচনা শেষ হয়েছে ৭ নভেম্বর। দেশের মানুষের আগ্রহ ছিল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও আওয়ামী লীগের আলোচনার প্রতি। ঐক্যফ্রন্টের প্রধান শরিক বিএনপি রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী এবং প্রতিপক্ষ। অন্য কোন দলের সঙ্গে সরকার বা সরকারি দলের কী সমঝোতা হলো না- হলো তা নিয়ে দেশের মানুষের খুব একটা মাথা ব্যথা আছে বলে মনে হয় না। তবে বিএনপির সঙ্গে সমঝোতা হওয়া নিয়ে অনেকেরই আগ্রহ এবং উৎসাহ আছে। কারণ বিএনপির মতো বড় একটি দল নির্বাচনে অংশ নেয়া না-নেয়ার ওপর রাজনীতির গতি-প্রকৃতি অনেকটা নির্ভর করে।

প্রথমে আলোচনার জন্য আনুষ্ঠানিকভাবে প্রধানমন্ত্রী বরাবর চিঠি দিয়ে ড. কামাল হোসেন একটি ভালো কাজ করেছেন। আর, চিঠি পাওয়ামাত্র প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্রুত ইতিবাচক সাড়া দিয়ে দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন, রাজনীতিতে নিজের নিয়ন্ত্রণ সংহত করেছেন। সংকট নিরসনে তার সদিচ্ছা ও আন্তরিকতার নিয়ে সন্দেহ পোষণকারীদের একটি উপযুক্ত জবাব দিয়েছেন। ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে দুই দফায় আলোচনায় বসায় এটাও স্পষ্ট হয়েছে যে নব গঠিত এই জোটকে সরকার হালকাভাবে দেখছে না, উপেক্ষা করছে না।

দুই দফায় প্রায় সাড়ে ছয় ঘণ্টার আলোচনার ফলাফল কি? আলোচনা কি সফল, না ব্যর্থ? এক কথায় এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন। তবে আলোচনায় অংশগ্রহণকারী কোনো পক্ষই আলোচনাকে এক কথায় সফল বা ব্যর্থ বলছেন না। সরকার পক্ষ আলোচনাকে সফল বলেই মনে করছে এবং এটা বলা হচ্ছে যে, সাত দফার বেশির ভাগ দাবিই সরকার পক্ষ মেনে নিয়েছে বা মেনে নিতে প্রধানমন্ত্রী ‘সম্মত’ হয়েছেন । যে দাবিগুলো সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক সেগুলো মানা সম্ভব নয় সেটাও স্পষ্ট করে বলেছেন।

ঐক্যফ্রন্টের ছোট তরফের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, ‘আলোচনা মনঃপূত হয়নি। সংলাপে সমাধান আসেনি’। তারপরও তিনি আশা ছাড়েননি বলে জানিয়েছেন। কী হলে আলোচনা তার মনঃপূত হতো তা অবশ্য তিনি বলেননি। তবে ধারণা করা যায়, শেখ হাসিনা যদি পদত্যাগের ঘোষণা দিতেন তা হলে মান্নাসহ অনেকে খুশি হতেন। কিন্তু এমন আশা তো দুরাশায় পরিণত হওয়ারই কথা।

সাত দফা দাবি নিয়ে গিয়েছিলেন ঐক্যফ্রন্টের নেতৃবৃন্দ। তারা কি ভেবেছিলেন গণভবনে গেলেই সব দাবি মানাতে পারবেন? আলোচনায় উভয়পক্ষের ছাড় দেয়ার মনোভাব থাকতে হয় । প্রধানমন্ত্রী তো নমনীয় ছিলেন। আগের দিন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় বক্তারা প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে হুমকিধমকি দিয়ে অনেক কটুবাক্য উচ্চারণ করলেও বড় জনসভা করার জন্য ঐক্যফ্রন্টকে অভিনন্দন জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

সংবিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয় বলে আলোচনায় প্রধানমন্ত্রী যে দুটো দাবি পুরোপুরি নাকচ করে দিয়েছেন তার একটি হলো সংসদ ভেঙে দিয়ে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠান এবং দ্বিতীয়টি হলো ১০ সদস্য বিশিষ্ট নির্বাচনকালীন সরকার গঠন। তবে নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড, বিদেশি পর্যবেক্ষক, রাজবন্দীদের মুক্তি ইত্যাদি বিষয়গুলোর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেননি। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জামিনে মুক্তির দাবি তোলা হয়েছে। তবে এটা গ্রাহ্য হয়নি আইনি বিষয় বলে। তিনি শাস্তি পেয়েছেন দুর্নীতির মামলায় আদালত কর্তৃক। এখন জামিন কিংবা মুক্তির বিষয়টি নিষ্পত্তিও হবে আদালত কর্তৃক।

রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রধান উপদেষ্টাসহ ১০ উপদেষ্টার যে নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি ঐক্যফ্রন্ট জানিয়েছে তা বিবেচনায় নেওয়া হয়নি সরকারের বা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে। একদিকে এমন সরকার ব্যবস্থা সংবিধানে নেই। আবার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আলোচনা করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে একজন প্রধান উপদেষ্টা বাছাইয়ের বাস্তব অবস্থা কি দেশে আছে? রাজনৈতিক দলগুলো এই প্রশ্নে একমত হতে পারবে? একজন ‘গ্রহণযোগ্য’ ব্যক্তি খুঁজে পাওয়া কি সহজ কাজ? ‘এ’ যাকে গ্রহণযোগ্য মনে করবে, ‘বি’ তাকে না বলবে।

আলোচনাকে সফল বা ব্যর্থ না বলে ঐক্যফ্রন্ট আশা জিইয়ে রেখেছে। ড. কামাল হোসেন সীমিত পরিসরে আরো আলোচনার প্রস্তাব করলেও তা খুব গুরুত্ব পায়নি। ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘ডায়ালগ শেষ, অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হতে পারে’। তিনি ঐক্যফ্রন্টের কিছু দাবিকে ‘নির্বাচন পেছানোর বাহানা’ বলে উল্লেখ করেছেন।

খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি আদায়ে দ্রুত আন্দোলনে নামার তাগিদ অনুভব করছেন বিএনপি নেতারা। তবে সেই আন্দোলন করা কতোটুকু সম্ভব হবে সেটাই এখন দেখার বিষয়। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ‘সরকার দাবি না মানলে আন্দোলনের মাধ্যমে দাবি আদায়ের চেষ্টা করা করা হবে’। লক্ষ করার বিষয় যে, মির্জা আলমগীর কিন্তু দাবি মানতে সরকারকে বাধ্য করার কথা বলেননি। দাবি আদায়ের চেষ্টা করার কথা বলেছেন।

কিন্তু তাদের এই চেষ্টা সফল না হলে কী হবে? বিএনপি বা ঐক্যফ্রন্ট কী নির্বাচনে অংশ নেবে? নাকি ২০১৪ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে?

কেউ কেউ মনে করছেন, ‘সরকারের আশ্বাস এবং বাস্তবতায় অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব নয়’। বিএনপি যেমন তার সুবিধাজনক অবস্থায় নির্বাচন চাইছে, তেমনি আওয়ামী লীগও চাইবে তাদের সুবিধাজনক অবস্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে। এই ক্ষেত্রে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা হবে কোন পয়েন্টে? বিএনপি এবং তার সমর্থকদের বর্তমান অবস্থা মেনে নিয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়ে সরকারের প্রতি চ্যালেঞ্জ জানাতে হবে ।

যে যতো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণই করুন না কেন, এটাই বাস্তব সত্য যে, একাদশ জাতীয় নির্বাচন ততোটুকু অবাধ ও গ্রহণযোগ্য হবে যতোটুকু হলে আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় ফেরা নিশ্চিত হবে। বিএনপির হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার মতো গণতান্ত্রিক বাতাবরণ দেশে এখনও তৈরি হয়নি।

ভালো লক্ষণ এটাই যে, আলোচনা হওয়ায় রাজনীতিতে কিছুটা হলেও স্বস্তি ফিরে এসেছে। রাজনীতিকরা গরম বক্তৃতা দিয়েও পরস্পর মুখোমুখি হচ্ছেন। বরফ গলতে শুরু করেছে। হাওয়া শীতল আছে। ঐক্যফ্রন্ট ৮ নভেম্বের রোডমার্চ কর্মসূচি স্থগিত ঘোষণা করে উত্তেজনা প্রশমনে ভূমিকা রেখেছে। এরপর কোনো পক্ষেরই উচিত হবে না উস্কানি দিয়ে একে গরম করে তোলা । নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হয়েছে। ২৩ ডিসেম্বরের নির্বাচনে সবাই অংশ নিক, গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রা কন্টক মুক্ত হোক। সম্পাদনা : ইকবাল খান

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ