প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ক্ষয় এবং পতন

টিম স্টিল : দীর্ঘ সময় নিলেও, এতে কোন সন্দেহ নেই যে, আমরা খুব নিকট ভবিষ্যতেই ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত দিনগুলো দেখতে পারবো। ব্রিটিশ সাম্রাজের বলা হতো, বিশ্বের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সাম্রাজ্য, সেখানে সূর্য কখনো ডুবে না। আরেকটি বিষয়ে ব্রিটিশরা নিজেদের অভিনন্দন জানাতে পারে, তাদের পূর্বসূরিদের অর্জনের জন্য। ১৬ ও ১৭তম দশকে স্প্যানিশ সাম্রাজ্য প্রথম দাবি করে যে, তাদের সাম্রাজ্যের সূর্য কখনো ডুববে না। এ নিয়ে তারা আত্মতুষ্টিতেও ভুগতো। তবে, এটা নিশ্চিত মুঘলরা সবচেয়ে বড় সন্নিহিত সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিলো। প্রাচীন সময়ে অন্যান্য প্রতিদ্বন্দ্বিদের চাইতে তাদের সাম্রাজ্য ছিলো সবচেয়ে দীর্ঘ। স্কটিশ, ওয়েলস ও আইরিশদের থেকে কিছুটা আলাদা হলেও, এটি নিশ্চিত যে, ইংরেজরাই শেষ পর্যন্ত গ্রেট ব্রিটেনের পতনের সূচনা করেছে। তখন থেকে, কিছুটা হাস্যকর হলেও সহজে দেখতে পাওয়া যায়, সাম্রাজ্যের অনিবার্য পতন ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। পরবর্তী শতাব্দীতে এই ধারা অব্যাহত থাকলেও, খুব কম সংখ্যক ব্রিটিশই বিষয়টি বুঝতে পারে।

একটা সময় অনেকটা এককভাবে ইংরেজরা গোটা পৃথিবী শাসন করার পাশাপাশি দুইটি বিশ্বযুদ্ধও জয় করেছে। অথচ, আজকের ব্রেক্সিটের সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এনিয়ে কান্নাকাটি খুব কমই দেখা যায়।

বিখ্যাত গানপাউডার সাম্রাজ্য হিসাবে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ছিলো ইতিহাসের চতুর্থ ও সবশেষ রাজত্ব। আগের তিনটি গড়ে তুলেছিলো অটোমান, সাফাভিদ ও মুঘলরা। এরা সবাই টিকে ছিলো জুলুম করেই। একদা তাদেরকে মহৎ হিসাবে দেখা হলেও, এখনকার মতো আলোকিত সময়, সেসব শাসনামল নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন হতে পারে।

সমানভাবে হাস্যকর হলেও সত্যি যে, নির্ভরযোগ্য ও শক্তিশালী গান পাউডারের কারণেই সতের শতকে ইংল্যান্ড ও ব্রিটিশের চোখ পড়ে পড়ন্ত মুঘল সাম্রাজ্যের গড়ে তোলা গঙ্গা বদ্বীপের দিকে। যার বড় একটি অংশ জুড়ে ছিলো আজকের বাংলাদেশ। এছাড়া সম্ভবত ষোল শতকের মাঝামাঝি সময়ে লবণ-স্বল্পতার জন্য সৃষ্ট দুর্ভিক্ষের কারণেও ভারতের প্রতি ইংলিশদের আগ্রহ হয়েছিলো।

এটা এখন আর বুঝতে কঠিন না যে, পরবর্তী কয়েক দশকে ইংল্যান্ড আবার ইংল্যান্ড হবে। মনে হচ্ছে ব্রিটেন, গ্রেট ব্রিটেন বলতে আর কোন অর্থবহ বিবরণ থাকবে না।

এর সূচনা হয়েছিলো প্রায় ৪০ বছর আগে, ব্রিটেনের ইউরোপের অক্ষে যোগ দেয়ার মধ্যে দিয়ে। কমতে শুরু করে প্রাচীনকাল থেকে প্রথাগতভাবে ব্রিটেনের প্রতি সবার সমীহ। কিন্তু অতীতের সেই গৌরবোজ্জ্বল মর্যাদা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা চলছে। জনগণের করের অর্থ চুরি করে সম্পদশালী হওয়া পুরুষ ও নারীরা ব্রেক্সিটের দোহাই দিয়ে সেই চেষ্টা করলেও, ব্রিটেনের পতন এখন সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ব্রিটিশ আধিপত্য নিয়ে এখন আর বাহাদুরির কিছু নেই। যেটা আছে আমেরিকানদের। গেলো দুই দশকে, বিশেষ করে বিংশ শতাব্দিতে শিল্পায়ন ও অস্ত্র সরবরাহের বিশাল বাজার তৈরির মাধ্যমে বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশ এখন তারা। পুরানো মিত্র ব্রিটিশদের প্রতিও আমেরিকানদের আগের সেই দৃষ্টিভঙ্গীও এখন আর দেখা যায় না।

নিজেদের দেশ ছাড়া বহির্বিশ্বে যেমন ব্রিটেনের জোরালো বাণিজ্য নেই, তেমনি ব্রিটিনের অন্যান্য অংশেও ইংল্যান্ডের সাথে বাণিজ্য করার কোনো কারণ নেই। ইংল্যান্ড যে স্বেচ্ছা নির্বাসনে চলে যাচ্ছে, সেটা আর বুঝতে বাকি থাকে না।

কিছুদিন আগেও নিজেকে একজন ব্রিটিশ হিসাবে গণ্য করতাম এবং ভাবতাম এই বিষয়টি কি অনুতাপের কারণ হতে পারে? আমি তা মনে করি না। কারণ, ‘ক্ষয় ও পতন’ এই পৃথিবীর একটি পথচলা। মানবজাতির সমগ্র ইতিহাসে যা লিপিবদ্ধ আছে। (মূল ইংরেজি থেকে অনূদিত, ঈষৎ সংক্ষেপিত।) সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব