প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

৭ নভেম্বর ছিলো কর্নেল (অব:) তাহেরের নেতৃত্বে একটি সিপাহী বিদ্রোহ

মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু স্টকহোম থেকে: ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শুক্রবার জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে সামরিক বাহিনী থেকে বহিষ্কৃত ও চাকরিরত কতিপয় বিপথগামি সেনা কর্মকর্তা। একে সামরিক অভ্যুত্থান বলে আখ্যায়িত করা যায় না। ১৫ আগস্ট বাংলাদেশে কোনো সামরিক অভ্যুত্থান হয়নি; হয়েছে উশৃঙ্খলতা, অরাজকতা ও দুস্কৃতিকারী দ্বারা অতর্কিত একটি হামলা। যারা কাজটি করেছে তাদের অনেকেই সামরিক বাহিনীতে শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে বহিষ্কৃত ছিলেন। তাদের ব্যক্তিগত আক্রোশের সাথে প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী মুক্তিযুদ্ধের বিপক্ষশক্তি একত্রিত হয়ে সেদিন বঙ্গবন্ধুর পরিবারকে নৃশংসভাবে হত্যা করা করেছিলো। এখানে সিআইএ’র সম্পর্কের কথাও অনেকে বলে থাকেন।

১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে সমাজতান্ত্রিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়? তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ হিসেবে মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান বাকশালে যোগদান করেছিলেন। তবে মেজর জেনারেল শফিউল্লাহর চেয়ে সিনিয়র হওয়া সত্ত্বেও তাকে সেনাপ্রধান না করাতে তিনি প্রথম থেকেই বঙ্গবন্ধুর উপর মনক্ষুন্ন ছিলেন। অনেকে মনে করেন জিয়াকে সেনাপ্রধান করলে হয়তো তিনি অনেক আগেই বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে ক্ষমতা দখল করতেন। কারণ জিয়া ছিলেন একজন ক্ষমতালোভী, উচ্চাভিলাসী ব্যক্তি। অতীতে তার বিভিন্ন কার্যকলাপ তা প্রমাণিত করেছে।

এদিকে, জিয়াউর রহমান বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকাকালীন সামরিক বাহিনীতে তার বিরুদ্ধে কয়েকবার ব্যর্থ অভ্যুত্থান হয়েছে। এই কারণে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ওই সময় একে অপরকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখা শুরু করে। পরবর্তীতে ব্যর্থ অভ্যুত্থানকারী এ সকল মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের জিয়া ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করেছিলেন। জিয়ার হুকুমে নিহত অনেক অফিসারের পরিবার এখনো বেঁচে আছে। তাদের এব্যাপারে এগিয়ে এসে সবকিছু তুলে ধরে জিয়ার আসল চরিত্রের মুখোশ উন্মোচন করা উচিত বলে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি মনে করে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর কৌশলে জেনারেল জিয়া ক্ষমতা দখল না করলে দেশে এত সামরিক অফিসার হত্যা হতো না। শুধুমাত্র ক্ষমতাকে আঁকড়ে রাখার লক্ষে তিনি যাকেই সন্দেহ করেছেন তাকেই ঠা-া মাথায় হত্যা করার নির্দেশ দিয়েছেন। তার এই হত্যা শুরু হয় কর্নেল (অব:) তাহেরকে ফাঁসি দেয়ার মধ্য দিয়ে। অথচ এই তাহেরই তাকে একসময় জেল থেকে মুক্ত করেছিলেন। পরবর্তীতে জিয়া কর্নেল (অব:) তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে বঙ্গবন্ধু-হত্যাকারিদের বাংলাদেশ দূতাবাসে চাকুরি দিয়ে পুরস্কৃত করেছিলেন। এখানেই পরিষ্কার হয়ে আসে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর হত্যার সাথে জেনারেল জিয়ার সম্পর্কটা।

তবে তাহেরের ৭ নভেম্বরের সিপাই বিদ্রোহের ব্যাপারে অনেকেই দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি নিজেই নিজের ফাঁদে পড়েছিলেন। সেদিন সাধারণ সিপাইদের উসকিয়ে দেয়ার কারণে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে তারা অনেক অফিসারকে হত্যা করে। এতগুলো নিরীহ অফিসার হত্যার জন্য অনেকে সরাসরি কর্নেল (অব:) তাহেরকে দায়ী করেন। কর্নেল তাহের ৭ নভেম্বর সিপাইদের নিয়ে বিদ্রোহ না করলে কারাগারে বন্দি জিয়াকে বঙ্গবন্ধু হত্যার দোষে বিচারের সন্মুখীন হতে হতো। খালেদ মোশাররফ তাকে সরাসরি হত্যা না করে গ্রেফতার করার উদ্দেশ্যই ছিলো বঙ্গবন্ধু-হত্যার সকল রহস্য জিয়ার মুখ থেকে বের করে আনা। কিন্তু সেই সুযোগ আর পাওয়া যায়নি। কর্নেল তাহেরের সিপাই বিদ্রোহ সবকিছু উলট পালট করে দেয়। পরবর্তিতে জিয়ার বিচার হওয়াতো দূরের কথা, উল্টো তাকে বীরের মত মুক্ত করে এনেছিলেন কর্নেল (অব:) তাহের। চতুর জিয়া মুক্তির পর আর অপেক্ষা না করে তার জীবন রক্ষাকারী কর্নেল (অব:) তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেন।

ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ দিয়ে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, ৭ নভেম্বর আসলে ছিলো জাসদ সমর্থিত কর্নেল (অব:) তাহেরের নেতৃত্বে ঘটে যাওয়া একটি সিপাই বিদ্রোহ। যার নাম দেওয়া হয়েছিলো সিপাহী জনতা বিপ্ল। এই তথাকথিত বিপ্লবের মাধ্যমে তিনি শুধু বন্দী জিয়াকে মুক্ত করে সেনাপ্রধান বানাতে পেরেছিলেন। সেনাপ্রধান হওয়ার পর জিয়া কৌশলে কর্নেল (অব:) তাহেরের সিপাহী জনতা বিপ্লবের অন্যান্য পরিকল্পনাগুলো আর সফল হতে দেননি। সুতরাং কর্নেল (অব:) তাহেরের সিপাহী বিদ্রোহের কারণে ৭ নভেম্বরকে জাসদের জন্য একটি ঐতিহাসিক দিন বলা যেতে পারে, কিন্তু বিএনপির জন্য কিছুই ছিলো না। অথচ মিথ্যা ইতিহাসের বদৌলতে দিনটিকে এখন পালন করছে বিএনপি। তারা বলছে, এই দিন জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করে আনা হয়েছিলো। একেবারে সত্য কথা। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে কে দিয়েছিলো এই মুক্তি? এইদিন বিএনপি কেনো ভুলেও তাদের দলের প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের মুক্তিদাতা কর্নেল (অব:) তাহেরের নাম উচ্চারণ করে না?

পঁচাত্তরের পর এভাবেই দেশের জনগণকে এক বিভ্রান্তির দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। বিএনপির যদি ৭ নভেম্বর পালন করতে হয় তাহলে সবার আগে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করতে হবে কর্নেল (অব:) তাহেরকে। যিনি তাদের নেতাকে মুক্ত করেছিলেন। কিন্তু বিএনপি কি তা করছে? করছে না। কারণ সত্য সামনে আসলে তাদের নেতা জিয়াকে মরণোত্তর বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে। যে দাবি হাসানুল হক ইনুসহ জাসদের নেতারা এখন করছেন।

সব কথার শেষ কথা হলো, ৭ নভেম্বর ছিলো কর্নেল (অব:) তাহেরের নেতৃত্বে একটি সিপাই বিদ্রোহ, বিএনপির কোনো দিবস নয়। দিনটি জাসদ নেতা কর্নেল (অব:) তাহেরের সিপাহী বিদ্রোহের দিন। এজন্য একমাত্র জাসদই পালন করতে পারে ৭ নভেম্বর, বিএনপি নয়। বিএনপি যদি জিয়ার মুক্তি দিবস উপলক্ষে ৭ নভেম্বর পালন করে তাহলে জিয়ার মুক্তিদাতা কর্নেল (অব:) তাহেরকে তাদের শ্রদ্ধা ও সন্মানের সাথে স্মরণ করতে হবে। এখন আর মিথ্যা ইতিহাস রচনা করে জনগণকে ধোঁকা দেয়া যাবে না। সুতরাং বিএনপির ৭ নভেম্বর পালন থেকে দূরে সরে আসাই হবে সবচেয়ে বড় উত্তম কাজ। শাক দিয়ে মাছ ঢেকে বিএনপি আর কতদিন রাজনীতি করবে? সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ