প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সমঝোতার পথ এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি

ডেস্ক রিপোর্ট : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে সরকার ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের দ্বিতীয় দফা সংলাপেও বড় ধরনের সমঝোতা না হলেও সেই পথ এখনো বন্ধ হয়ে যায়নি বলে মনে করছেন তিন বিশিষ্টজন। তাঁরা মনে করেন, একটা সমঝোতায় পৌঁছতে হলে দুই পক্ষকেই ছাড় দেওয়ার মানসিকতা রাখতে হবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কারো মধ্যে ছাড় দেওয়ার মানসিকতা দেখা যায়নি, তাই সফলতা আসেনি।

গতকাল বুধবার দ্বিতীয় দফা সংলাপ শেষে কালের কণ্ঠকে মূল্যায়ন জানিয়েছেন আইনজীবী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ, অর্থনীতি-সমাজ-রাজনীতি বিশ্লেষক বদিউল আলম মজুমদার ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক।

তাঁরা বলেন, সংলাপের আশার দিক হলো আলোচনার পথ বন্ধ হয়ে যায়নি। আলোচনার মাধ্যমেই সবার অংশগ্রহণে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনই জাতির প্রত্যাশা। দেশের অগ্রগতির স্বার্থে কেউই যেমন আর রাজনৈতিক হানাহানি চায় না, তেমনি চায় না কোনো অগণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসুক। এ ক্ষেত্রে রাজনীতিবিদরা বিচক্ষণতার পরিচয় দেবেন, এটাই তাঁদের প্রত্যাশা।

প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য না হলে সমঝোতা হবে কিভাবে—এ প্রশ্ন তুলেছেন সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ।

সরকার ও ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের দ্বিতীয় দফা সংলাপ শেষে এর মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘ঐক্যফ্রন্ট সংসদ ভেঙে দেওয়ার এবং প্রধান উপদেষ্টা ও ১০ উপদেষ্টা নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার এবং নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের যে প্রস্তাব দিয়েছে তা দিয়ে তো সমঝোতা হবে না। এই দাবিগুলো তো সরকারের পক্ষ থেকে মেনে নেওয়া সম্ভব হবে না। এগুলো তো সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সর্বোচ্চ আদালত বলেছেন, অনির্বাচিত সরকার সংবিধানের মূল স্তম্ভের সঙ্গে সাংঘর্ষিক, তারপর পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তা বাতিল হয়েছে। পত্রপত্রিকায় দেখলাম ঐক্যফ্রন্ট নেতারা বলেছেন, তাঁরা সংবিধানের আওতায়ই প্রস্তাব দেবেন। কিন্তু যে প্রস্তাব দিলেন তা সংবিধানে কোন বিধানে আছে তা তো তাঁদের বলতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। এই অবস্থায় নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনসহ নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি তোলার পেছনে নিশ্চয়ই অন্য কোনো উদ্দেশ্য আছে। গণ্ডগোল সৃষ্টি করাই তাদের আসল উদ্দেশ্য হতে পারে। সুষ্ঠু নির্বাচন যাতে সম্পন্ন হয় এখন সে ব্যাপারেই সবাইকে এগিয়ে আসা উচিত।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) নামের বেসরকারি সংস্থার সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার সংলাপ নিয়ে হতাশা ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন, ‘সংলাপের নামে যে আলোচনা হলো, তার দিকে তাকিয়ে ছিল গোটা জাতি। আমরা দেখলাম, দুটি আলোচনাতেই কোনো ফলাফল আসেনি। অর্থাৎ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও সরকারের মধ্যে কোনো সমঝোতা হয়নি, আলোচনা ফলপ্রসূ হয়নি। ঐক্যফ্রন্টের বড় যে দাবি ছিল, সেটি হলো সুষ্ঠু নির্বাচন ও ভোটাধিকার নিশ্চিত করা। সরকারের সঙ্গে আলোচনায় এ বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি। সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য থাকতে হবে নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ভূমিকা এবং সবার জন্য সমান সুযোগ। সরকারের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে তেমন কোনো সদিচ্ছা দেখা যায়নি। এ অবস্থায় আরো সংলাপ হতে পারে, সমঝোতাও হতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে সেটাই সবাই প্রত্যাশা করে। আর সংলাপ কিংবা আলোচনায় সমঝোতা না হলে অনিশ্চিত ও ভয়াবহ অবস্থা তৈরি হতে পারে। সমঝোতার জন্য সরকারকেই ছাড় দিতে হবে। আশা করি, সরকারের মধ্যে সেই শুভ বুদ্ধির উদয় হবে।’

সরকারের সঙ্গে সংলাপে ঐক্যফ্রন্টের মূল দাবি না মেনে সমঝোতায় আসতে না পারায় জাতি হতাশ হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ড. শাহদীন মালিক। তিনি বলেন, জাতির আশা ছিল সংলাপে কিছু একটা সমাধান আসবে। এই সংলাপের মূল দাবির ব্যাপারে সমঝোতা ও সমাধান আসেনি বলে ঐক্যফ্রন্ট নেতারা সংলাপ শেষে বলেছেন। তিনি বলেন, ‘গোটা জাতি এই সংলাপের ব্যাপারে এখন হতাশ, আমিও সারা জাতির মতোই হতাশ।’

আগামী নির্বাচন অংশীদারিমূলক না হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করে শাহদীন মালিক বলেন, ‘এখন আশঙ্কা হলো, আগামী জাতীয় নির্বাচনটা সম্পূর্ণ সুষ্ঠু ও অংশীদারিমূলক হওয়া নিয়ে। অনেক ধরনের বাধার সৃষ্টি হতে পারে। এই নির্বাচন আমাদের গণতন্ত্রের জন্য ভালো কিছু আনতে পারবে না বলে আমার মনে হয়।’ নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে তিনি বলেন, ‘সংসদ বহাল বা ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করার কথা বলা হয়েছে সংবিধানে, সংসদ বহাল থাকলে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হবে না। সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন অনুষ্ঠানের কথা সংবিধানে ১০ বার বলা হয়েছে। সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করার কথা বলা হয়েছে একবার। সংবিধানে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচনের ব্যবস্থা করার কথা স্পষ্ট করে লেখা আছে। এ ছাড়া আমাদের বেশির ভাগ নির্বাচনই সংসদ ভেঙে দিয়ে হয়েছে। নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ারও বিধান রয়েছে সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদে।’

ড. মালিক বলেন, ‘এখন দেশের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণের একটি শঙ্কা তৈরি হলো। এই সংলাপে সুযোগ ছিল দেশের রাজনীতিকে আরো স্থিতিশীল করার। সমঝোতার মাধ্যমে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই পারে দেশের পরিস্থিতিকে ভালো করতে। আশা করি, রাজনীতিবিদরা সে পথে হাঁটবেন।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ