প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

৭ নভেম্বর : মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যাযজ্ঞের কলঙ্কিত দিবস

সৈয়দ বদরুল আহসান : ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর আসলে তথাকথিত সিপাহী জনতার অভ্যুত্থান ছিলো না। বরং এটি ছিলো জনতাকে পদানত করে একটা প্রগতিশীল রাজনীতির প্রতি তাদের আকাক্সক্ষাকে হত্যা করার দিন। জাতি দেখেছে এই দিনে কীভাবে কর্নেল তাহেরের প্ররোচনায় মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানের অনুগত সৈনিকরা পুরো দেশকে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে মধ্যযুগের দিকে টেনে নিয়ে গেছে।

এই সময়েই তারা আবার সেই বাংলাদেশ জিন্দাবাদ স্লোগানটি তুলে ধরেছে, যে শ্লোগানটি মাত্র তিন মাস আগে জাতির পিতাকে হত্যা করে খন্দকার মোশতাক প্রবর্তন করেছিল। ওই দিনই আরও একটি কালো অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল, ‘জয় বাংলা’কে বাক্সবন্দি করে সেই ১৯৪০-এ দেয়া মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক স্লোগান ‘নারা-এ- তকবির’কে উঠিয়ে আনা হয়েছিল। ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর এই জাতি আর মুক্তিযুদ্ধের রণসঙ্গীত ‘জয় বাংলা বাংলার জয়’ শুনতে পায়নি। এই প্রজাতন্ত্র যেন সেদিন অতি সহজেই ঘরের মধ্যেই ঘাপটি মেরে থাকা শত্রুর হাতের মুঠোয় চলে গিয়েছিল।

৭ নভেম্বর সকালে শেরে বাংলা নগরে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে সাহসী তিন সেনা কর্মকর্তা খালেদ মোশাররফ, নাজমুল হুদা এবং এটিএম হায়দারকে। এতো বছর হয়ে গেল, এখনো সেই জঘন্য হত্যকা-ের তদন্ত করা হয়নি। এর পরের কয়েক সপ্তাহে নিহত এই বীর সেনাদের একজনের বিধবা স্ত্রী জেনারেল জিয়াকে বারবার প্রশ্ন করেছিলেন, কেন তাদেরকে হত্যা করা হয়েছিলো? কিন্তু এ প্রশ্নের কোনো উত্তর জিয়া দেননি। বরং তিনি নিহত অফিসারদের পরিবারকে পুনর্বাসনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এই ঘটনার আরও একটা দিক রয়েছে। যখন এই তিন অফিসার শেরে বাংলা নগরের আমি ক্যাম্পে ছিলেন, তখন সেখান থেকে এক কর্মকর্তা জিয়াকে ফোন করে তাদের কথা জানায়। জিয়া সে ফোনের জবাবে কি বলেছিলেন, তা আর এতোদিন পর জানা সম্ভব নয়। কিছুক্ষণ পর সেখানে তাহের এবং তার কয়েকজন রাজনৈতিক সহযোগী যায়। আর এর পরপরই একদল সৈন্য নাস্তা করতে থাকা তিন সেনা কর্মকর্তাকে টেনে বাইরে নিয়ে যায় এবং নির্মমভাবে হত্যা করে।

এরপর জেনারেল খালেদ মোশাররফ, কর্নেল নাজমুল হুদা এবং কর্নেল এটিএম হায়দারের লাশ দীর্ঘসময় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালের সামনের মাটিতে পড়ে ছিলো। মুক্তিযুদ্ধের এই বীর সেনানীদের অপবাদ দেয়া হয় ভারত ও সোভিয়েতের চর হিসেবে। জেনারেল জিয়া সেই দিন, কিংবা তার পরবর্তী যে পাঁচ বছর সে ক্ষমতায় ছিলো, একবারের জন্যও ওই তিন কর্মকর্তার হত্যাকারীদের চিহ্নিত করার বা সাজা দেয়ার কথা বলেননি। এমনকি ১৯৮১ সালের মে মাসে জিয়া নিজে নিহত হওয়ার পরও কোনো সরকারই পঁচাত্তরের ৭ নভেম্বর ক্যান্টনমেন্টে যে নির্মম হত্যাযজ্ঞ পরিচালিত হয়েছিল তার কোনো তদন্ত করেনি।

আমাদের জাতীয় ইতিহাসের প্রেক্ষিতে একথা বলা যায় যে, ৭ নভেম্বর হলো সেই দিন, যেদিন কর্নেল তাহের ও তার গণবাহিনী জাসদের সঙ্গে মিলে এই জাতির সম্মিলিত আকাক্সক্ষাকে হত্যা করে জিয়াকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। তারা নিশ্চিতভাবেই একজন ভুল লোককে পছন্দ করেছিল। আর তার মূল্যও তারা দিয়েছে, তাহের নিহত হয়েছেন, জাসদ ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে। আর এই দেশ পেয়েছে পাকিস্তানের অনুকরণে একটা সামরিক শাসনের ধারাবাহিকতা।

৭ নভেম্বরের সেই অন্ধকার অধ্যায়ের শাখা-প্রশাখা পরবর্তীকালে কলূষিত করেছে এই জাতির ইতিহাস-ঐতিহ্যকে। জিয়া তার অবৈধ ক্ষমতাদখলকে বৈধতা দিতে সংবিধানকে কাটাছেড়া করেছেন, মৌলনীতি ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতন্ত্রকে বিদায় করে দেয়া হয়েছে। তিনি একত্রিত করেছেন একাত্তরের পরাজিত শক্তিদের। এভাবে এই সাত নভেম্বর এই দেশকে অন্ধকারের নিকষতম গভীরে নিয়ে গেছে। আসলে এই দিনটিই ছিলো আমাদের গর্বিত ইতিহাসকে ধ্বংস করার প্রথম পদক্ষেপ।

লেখক পরিচিতি :দি এশিয়ান এজের এডিটর ইন চার্জ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত