প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

চট্টগ্রাম বন্দর উন্নয়ন কাজ পেতে চান বিদেশিরা

সমকাল : চট্টগ্রাম বন্দরে সাত কিলোমিটার দীর্ঘ বে-টার্মিনাল নির্মাণ করতে ব্যয় হবে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা। আর পতেঙ্গায় লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণে খরচ হবে প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা। দুই টার্মিনালে ২০ হাজার কোটি টাকার এ কাজ পেতে চায় সাতটি দেশের ১০ প্রতিষ্ঠান। ভারত, চীন, সিঙ্গাপুর, কোরিয়া, আরব আমিরাত, নেদারল্যান্ডস ও ফ্রান্সের প্রতিষ্ঠানগুলো কাজ পেতে চালাচ্ছে তৎপরতা। এরই মধ্যে লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণের জন্য প্রস্তাব আছে বিদেশি পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের। আর বে-টার্মিনালের জন্য গত ২৭ আগস্ট আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয় ভারত ও নেদারল্যান্ডসের যৌথ মালিকানাধীন একটি কোম্পানি। আরও চারটি দেশ আছে আলোচনার পর্যায়ে। তবে টার্মিনাল পরিচালনায় বিদেশিদের সম্পৃক্ততা চান না বন্দর ব্যবহারকারীরা। তারা বলছেন, বন্দরের নিজস্ব ফান্ডে যে অর্থ রয়েছে তা টার্মিনালে বিনিয়োগ করা হলে দেশের অর্থ দেশেই থাকবে। আরেকটি পক্ষ বলছে, কাজের গুণগতমান ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারলে সুযোগ দেওয়া উচিত বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে।

বে-টার্মিনালে ১৭ হাজার কোটি টাকার কাজ পেতে আগ্রহী পাঁচ দেশের পাঁচ প্রতিষ্ঠান :বে-টার্মিনাল নির্মাণ করার আগ্রহ ভারতীয় কোম্পানি এপিএম টার্মিনালস ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড, চীনের চায়না মার্চেন্টস পোর্টস হোল্ডিং কোম্পানি লিমিটেড, কোরিয়ার ইন্টারন্যাশনাল পোর্ট ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন, সিঙ্গাপুরভিত্তিক কোম্পানি পিএসএ টার্মিনাল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ড। কোন দেশকে কাজটি দেওয়া হবে সে বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা জানতে চেয়ে সম্প্রতি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।

সক্ষমতা বাড়বে :বন্দর সূত্রে জানা যায়, বে-টার্মিনালে একটি ১৫০০ মিটার দৈর্ঘ্যের মাল্টিপারপাস টার্মিনাল, ১২২৫ মিটার দীর্ঘ কনটেইনার টার্মিনাল ও ৮৩০ মিটার দীর্ঘ কনটেইনার টার্মিনাল-২ তৈরি করা হবে। এ জন্য সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ১৭ হাজার কোটি টাকা। বে-টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্পটি পিপিপি (সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব) এবং জি টু জি (সরকার টু সরকার) পদ্ধতিতে সম্পন্ন করার জন্য প্রশাসনিকভাবে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বে-টার্মিনাল হলে চট্টগ্রাম বন্দরের বর্তমান সক্ষমতা তিনগুণ বেড়ে যাবে। এখন ৯ দশমিক ৫ মিটারের বেশি ড্রাফটের কোনো জাহাজ বন্দরে নোঙর করার সুযোগ পাচ্ছে না।

কিন্তু বে-টার্মিনাল হলে ১২ থেকে ১৪ মিটার ড্রাফটের জাহাজও সরাসরি জেটিতে নোঙর করতে পারবে। এখন নাব্য সংকটের কারণে চট্টগ্রাম বন্দরে জাহাজ প্রবেশ করাতে জোয়ারের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। কিন্তু বে-টার্মিনালে দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই নোঙর করতে পারবে জাহাজ। বন্দর ব্যবহারকারীরা তাই দীর্ঘদিন ধরে বে-টার্মিনাল নির্মাণের দাবি জানিয়ে আসছেন।

লালদিয়ায় তিন হাজার কোটি টাকার কাজ পেতে আগ্রহী পাঁচ বিদেশি প্রতিষ্ঠান :লালদিয়া টার্মিনালে কাজ করতে আগ্রহ দেখিয়েছে বিদেশি পাঁচটি প্রতিষ্ঠান। এগুলো হলো- দুবাইভিত্তিক ডিপি ওয়ার্ল্ড, ভারতের শীর্ষস্থানীয় প্রাইভেট মালটি পোর্ট অপারেটর-আদানি পোর্টস অ্যান্ড স্পেশাল ইকোনমিক জোন লিমিটেড, ফ্রান্সের বোলোর, বেইজিংভিত্তিক চায়না হারবার অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি লিমিটেড ও সিঙ্গাপুরভিত্তিক গ্লোবাল পোর্ট সার্ভিসেস। পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপের ভিত্তিতে এ টার্মিনালটি নির্মাণ করতে চায় বন্দর কর্তৃপক্ষ। এ জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।

জাহাজের গড় অপেক্ষমাণ সময় কমানোর পাশাপাশি কনটেইনারের ধারণক্ষমতা আরও বাড়াতেই লালদিয়া টার্মিনাল নির্মাণ প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। টার্মিনালটিতে একই সঙ্গে বাল্ক্ক ও কনটেইনার জাহাজ পণ্য ওঠানামা করতে পারবে। এ জন্য গত বছরের ১৮ জুন রিকোয়েস্ট ফর কোয়ালিফিকেশন আহ্বান করে বন্দর কর্তৃপক্ষ। তখনই বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো আগ্রহ প্রকাশ করে টেন্ডারে অংশ নেয়। কিন্তু বন্দর ব্যবহারকারী ও টার্মিনাল অপারেটররা এটি বিদেশিদের কাছে দেওয়ার বিপক্ষে। তারা বলছেন, ফান্ডে ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি অর্থ থাকার পরও কেন তিন হাজার কোটি টাকার এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে বিদেশিদের দ্বারস্থ হবে বন্দর কর্তৃপক্ষের।

সব প্রক্রিয়া শেষ করে চলতি বছরই লালদিয়া টার্মিনালের অপারেটর ঠিক করতে চায় বন্দর কর্তৃপক্ষ। ২০২১ সালের মধ্যে এ প্রকল্প শেষ করতে চান তারা। নগরীর পতেঙ্গা এলাকার ১৪ ও ১৫ নম্বর খালের মাঝামাঝি লালদিয়ার চরে ৭৫ একর জায়গায় নির্মিত হবে টার্মিনালটি। এখানে কর্ণফুলীতে গভীরতা বেশি থাকায় ১০ মিটার গভীরতার জাহাজ জেটিতে ভিড়তে পারবে। এ জন্য প্রয়োজনে বন্দর ব্যবহারকারীদের সঙ্গে আবারও মতবিনিময় করবেন তারা।

সংশ্নিষ্টরা যা বলেন :এ প্রসঙ্গে নৌমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, দেশের স্বার্থ রক্ষা করে সর্বোচ্চ গুণগতমান নিশ্চিত করাই আমাদের লক্ষ্য। তাই কার্যাদেশ দেওয়ার আগে অনেক কিছুই বিবেচনা করা হবে। চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল জুলফিকার আজিজ বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা চেয়ে চিঠি পাঠানো হয়েছে। সরকার থেকে যে নির্দেশনা আসবে সে অনুযায়ী কাজ করা হবে।’

পোর্ট ইউজার্স ফোরামের সভাপতি ও চিটাগাং চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, ‘বিদেশি প্রতিষ্ঠান কীভাবে টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনা করবে, উৎপাদনশীলতা কত হবে, বন্দরের রয়্যালটি শেয়ারিং কত নির্ধারণ হবে, কত বছর তারা এটি পরিচালনা করবে, এরপর কীভাবে বন্দরের কাছে হস্তান্তর করবে, কাজের মান সন্তোষজনক না হলে বিদেশিদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে- এ বিষয়গুলোও খুব গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো নির্ধারণ না করে বিদেশিদের টার্মিনাল পরিচালনার সুযোগ দেওয়া হলে তা বিপদ ডেকে আনতে পারে। বন্দরের ফান্ডে পর্যাপ্ত টাকা থাকার পরও বিদেশিদের টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার বিপক্ষে আমরা।’

বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আহসানুল হক চৌধুরী বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে হলে নতুন টার্মিনালের বিকল্প নেই। কিন্তু টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার সিদ্ধান্ত নিতে হবে বিচক্ষণতার সঙ্গে। অন্যথায় বড় খেসারত দিতে হবে বন্দরকে।’

চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল অপারেটর সাইফ পাওয়ার টেকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন বলেন, ‘দেশে দক্ষ জনশক্তি থাকার পরও বিদেশিদের টার্মিনাল পরিচালনার সুযোগ দেওয়া কতটুকু যুক্তিযুক্ত হবে, তা ভেবে দেখা দরকার।