প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আমি এক ফেরিওয়ালা, গণতন্ত্র নেবেন, গণতন্ত্র

খোন্দকার আতাউল হক : গণতন্ত্র নেবেন গো-গণতন্ত্র! আছে আব্রাহাম লিংকনের গণতন্ত্র, আছে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর গণতন্ত্র, আছে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর গণতন্ত্র, আছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের গণতন্ত্র। নেবেন গো- গণতন্ত্র! আমার গণতন্ত্রে কোনো ফরমালিন নেই। মেডিসিন নেই। যে কোনো রাজনৈতিক দল আমার এই গণতন্ত্র নিতে পারেন।

হ্যারল্ড জে লাস্কির মতে, রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপের ভূমিকা পালনে সক্ষমতাকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা বলে। এছাড়া রাজনৈতিক স্বাধীনতা বলতে ভোটদানের অধিকার, নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অধিকার, নিরপেক্ষভাবে রাজনৈতিক মতামত প্রকাশের অধিকার, সরকারি চাকরি লাভের অধিকার ইত্যাদি হলো রাজনৈতিক স্বাধীনতা। অন্যদিকে অর্থনৈতিক স্বাধীনতার অর্থ, যোগ্যতা ও সামর্থ্য অনুযায়ী জীবিকা নির্বাহের স্বচ্ছন্দ্য ব্যবস্থা এবং দৈনন্দিন অভাব-অনিশ্চয়তা থেকে মুক্তি। কিন্তু আমাদের দেশের রাষ্ট্রীয় কার্যকলাপের সর্বত্রই তো ফরমালিন দ্বারা প্রলেপিত। মাছ, মাংস, ফলমূল থেকে শুরু করে অফিস-আদালত এমনকি ব্যাংকও ফরমালিনমুক্ত নয়।

আমরা জানি, রাজনৈতিক মুক্তি ছাড়া অর্থনৈতিক মুক্তি সম্ভব নয়। রাজনৈতিক মুক্তির দর্শন ছাড়া কোন ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ বা রাষ্ট্র তার কাক্সিক্ষত স্বপ্নপূরণের সক্ষমতা অর্জন করতে পারে না। তাই রাজনৈতিক মুক্তির দর্শনে বিশ্বাসী হয়ে অর্থনৈতিক ও সামাজিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার পথ সুগম করতে হবে। এই রাজনীতির দর্শনেও ফরমালিন মিশ্রিত হচ্ছে। এখানেও সেই ফরমালিন মিক্সিং হচ্ছে।

আসলে মানুষ হচ্ছে এক ধরনের দানব। পৃথিবীতে সবচেয়ে অকৃতজ্ঞ ও খারাপ প্রাণী হচ্ছে মানুষ। এই মানুষের কারণে প্রকৃতির ব্যাপক বিপর্যয় ঘটতে যাচ্ছে। এই অকৃতজ্ঞ মানুষ জাতির কারণে শুধু জলবায়ুরই পরিবর্তন হচ্ছে না, পরিবর্তন হচ্ছে মানবজাতির সাথে সম্পৃক্ত সকল স্থাবর, অস্থাবর ব্যবস্থাপনা, সৌরজগৎ এবং এমন কী পৃথিবীর অবকাঠামোর।

এসবের কারণে আগামীতে সম্ভবত পানি নিয়ে হবে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। তাও হতে পারে পৃথিবীর সর্বনি¤œাঞ্চল বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক। তখন ভারত, চীন, জাপান এবং ভিয়েতনামসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের দেশগুলোর স্লোগান হবে ‘সেফ দ্য বাংলাদেশ’। কারণ ততোদিনে এই বাংলাদেশ হবে উপ-আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোটের বাণিজ্যিক ও অর্থনৈতিক পুঁজি বিনিয়োগের নির্ভরযোগ্য স্থান। তাছাড়া পৃথিবীর দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের ভূ-রাজনীতি ও ভূ-অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু হবে বাংলাদেশ, এমনই ধারণা ভূ-রাজনৈতিক ও ভূ-বাণিজ্যিক বিশেষজ্ঞদের ধারনা।

ফরমালিনের দৌরাত্মের কারণে বাংলাদেশের শুধু জলবায়ুরই পরিবর্তন হচ্ছে না। পরিবর্তন হচ্ছে রাষ্ট্র-ক্ষমতার জলবায়ু, গণতান্ত্রিক জলবায়ু, আইন বিভাগের জলবায়ু, পার্লামেন্টের জলবায়ু, রাজনৈতিক জলবায়ূ, রাজনৈতিক দলবাজির জলবায়ু, নেতৃত্ববাজির জলবায়ু, আমলাতান্ত্রিক জলবায়ু, মৌলিক ও মানবাধিকারের জলবায়ু, সামাজিক নিরাপত্তার জলবায়ু, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সর্বপোরি মানুষের মননশীল হৃদয়ানুভূতির জলবায়ুর।

অর্থাৎ পৃথিবীর অভ্যন্তরে যা কিছু পরিবর্তন বা বিবর্তন হচ্ছে, তার মূল কারিগর হচ্ছে মানব জাতি। শাসনব্যবস্থায় ফরমালিনের কারণে দুর্নীতি, সুইস ব্যাংকে টাকা পাচার এবং ঋণ খেলাপীসহ বহু অঘটনই আগামী দিনের সাক্ষ্য হয়ে থাকবে বলে বু্িদ্ধজীবীরা মনে করেন। কাজেই রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রয়োজন। মানুষই মানুষকে বাঁচানোর জন্য এবং রোগমুক্ত রাখার প্রয়োজনে আবিষ্কার করেছে ওষুধ। ঠিক তেমনি আবার মানুষকে মারার জন্যও আবিষ্কার করেছে নানা ধরনের মারণাস্ত্র। তার মধ্যে ফরমালিন অন্যতম। এই মানুষই তো ফরমালিন চিহ্নিতকরণ যন্ত্র আবিষ্কার করেছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে সরকার প্রায় চব্বিশ লক্ষাধিক সরকারি আমলার বেতন দ্বিগুণ বৃদ্ধি করেছেন। তা এই ফরমালিনে কি র্দ্নুীতি কমেছে? বরং দুর্নীতির সাথে বেতনের বাড়তি টাকা যোগ হয়েছে। সরকার একটি বারের জন্যও ভাবলেন না যে, আমলাদের বেতন বৃদ্ধির ফলে বেসরকারি কোটি কোটি কর্মচারির জীবন-সংসারের দুর্দশা কী ভয়াবহ হতে পারে? ভোট তো কেবল আমলারাই দেবেন না। ওরাও তো দেবে। সাধারণ মানুষকে উপেক্ষা করা সরকারের উচিৎ হয়নি। আমাদের দেশের জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে সাথে মানুষের মননশীল হৃদয়ানুভুতির পরিবর্তনও ঘটে যাচেছ। সে কারণে, প্রেমিক-প্রেমিকা অথবা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রেমাপ্লুত হয়ে চিঠি লিখা এখন আর হয় না। লিখা হয় না, ‘তোমার পটলচেরা কাজল কালো মদির আঁখিতে আছে নারীর হৃদয় নিংড়ানো প্রেম, প্রীতি অলংকার, তার মধ্যে ডুবে যাচ্ছি আমি। এমন দিনও ছিলো এইসব রোমাঞ্চকর হৃদয়াপ্লুত করা প্রেমের চিঠি প্রেমিক প্রেমিকারা রাত জেগে হারিকেন বা কুপি জ্বালিয়ে গভীর রাত পর্যন্ত চুরি করে বারবার পড়তো।

সে চিঠি পড়ার মধ্যে ছিল ভিন্ন এক সাধ, স্বাদ এবং ভালোলাগা; ভালোবাসার কুসুমাদিত্য আনন্দ আর অনুভূতি। কিন্তু এখন আর তা হয় না। এখন অবশ্য আধুনিক প্রযুক্তি মোবাইলের মাধ্যমে হাই-হ্যালো করে কার্য্যসম্পাদন করা হয়। তাতে থাকে না সেই মনজাগানিয়া উচ্ছ্বাস, উদ্যম, গাঢ় হৃদয়ানুভূতির ভালোবাসার পরম পরাকাষ্ঠা। এখন আর থাকে না সদ্য প্রস্ফুটিত কুসুমকলির রেণুমাখা সুগন্ধি ফুলের ন্যায় প্রেমপত্রে দু’নয়নের উৎসুক দৃষ্টি, হৃদয় কুঞ্জের গভীর থেকে বুদবুদ ফেনার মতো উথলে ওঠা উচ্ছ্বসিত মুচকি হাসি আর ঘনঘন চোখের পলক। ঠিক এমনিভাবে ফরমালিনের বদৌলতে দেশের রাষ্ট্রব্যবস্থায় গণতন্ত্র, রাজনীতি, নেতৃত্ব, কর্তৃত্ব, অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিয়মানুবর্তিতার ব্যত্যয় ঘটেছে। ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও শ্রম-কর্ম-পেশার মানুষের দেশ-জাতিপ্রেমকে উপেক্ষা করা হচ্ছে। তাদেরকে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অংশিদার করা হয় না। এই ফরমালিনযুক্ত রাজনীতিই ক্ষমতার নাগরদোলায় পালাবদল করছে। দেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দলই ফরমালিন দ্বারা আবৃত। এদের চলাচলন, কথাবার্তা, বক্তৃতা বিবৃতি সবটাতেই আছে ফরমালিন। এরা এতোটাই ফরমালিন প্রিয় যে, এদের মধ্যে না আছে কল্যাণকর রাষ্ট্রকাঠামো ও শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার স্বচ্ছ আদর্শিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। না আছে দলীয়ভাবে গণতান্ত্রিক চর্চা, না আছে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় ন্যায়বিচার। তবে দেশের শাসনব্যবস্থা ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, নেতৃত্ব কর্তৃত্ব এবং রাজনৈতিক দলগুলোর চেহারা দেখতে ঠিক ফরমালিন মাখানো ফলমূল, শাক-সবজি এবং মাছের মতই। কিন্তু মনে রাখতে হবে ‘অল গ্লিটার ইজ নট গোল্ড’।

তবে ফরমালিনমুক্ত রাষ্ট্রীয় কাঠামো ও শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের জন্য আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক রাজনৈতিক যন্ত্রও আছে। যে রাজনৈতিক যন্ত্র বা পদ্ধতির ব্যবহার করে পৃথিবীর বহুদেশ শুধু সাবলম্বিই হয়নি তারা এখন বিশ্বের ট্রফিক সার্জেন্টও বটে। উন্নত দেশের তালিকায় যেতে হলে, বাংলাদেশকে ফেডারেল পদ্ধতির কেন্দ্রিয় সরকারব্যবস্থা প্রবর্তন করতে হবে। প্রয়োজনে নি¤œকক্ষ ও ‘উচ্চকক্ষের সমন্বয়ে দুইকক্ষবিশিষ্ট পার্লামেন্ট গঠন, জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিল, জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল এবং উপজেলাভিত্তিক স্বশাসিত স্থানীয় সরকারব্যবস্থা চালু করতে হবে। পৌরসভা ও উপজেলা পর্যায়ে শিল্পাঞ্চল, বা অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তুলে গোটা জাতিকে এবং রাষ্ট্রীয় প্রশাসনের আমলাদের ফরমালিন মুক্ত করতে হবে। এই আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রবর্তনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে তথাকথিত ফরমালিনমুক্ত করা সম্ভব।

আমি পেশায় একজন ফেরিওয়ালা। আগে ঢাকা শহরের বিভিন্ন মহল্লায় মৌসুমী নানা জাতের ফলমূল ফেরি করে বিক্রি করতাম। যেমন আঙ্গুর, বেদানা, আপেল, আনারস, নাশপাতি, পেয়ারা, কলা, খেজুর, আম, জাম, তরমুজ প্রভৃতি। যখন দেখলাম আমাদের দেশের মৌসুমি ফলে বড় বড় ব্যবসায়ীরা ফরমালিনসহ বিভিন্ন ধরনের ওষুধ দিয়ে মানুষ মারার ফন্দি করছে; তখন ভাবলাম মানুষ মারার এমন অনৈতিক ব্যবসা আমি করবো না। আমি জেনেশুনে এমন পাপ কাজ করতে পারি না। তাই আমি ফল বিক্রি ছেড়ে দিয়ে শাক-সবজি ফেরি করে বিক্রি করতে থাকি। কিন্তু এখনেও দেখি সেই পুরাতন খেলা। শাক-সবজিকে তরতাজা রাখতে ফরমালিন মেশানো হচ্ছে। এমন আত্মঘাতি কাজকাম দেখে শাক-সবজিও ফেরি করা ছেড়ে দিলাম। কিন্তু প্রবাদ আছে, ‘সব মহাজন ঠেকানো যায়, পেট মহাজনকে ঠেকানো যায় না’। কাজেই জীবন-জীবিকার তাগিদে কিছু একটা তো আমাকে করতেই হবে। তাই ভেবেচিন্তে আবার ফিরে এলাম পুরানো ফেরিওয়ালার পেশায়। তবে এবার ফলমুল বা শাক-সবজি নয়। এবার একটু বেশি লাভের আশায় মাছের ফেরিওয়ালা হলাম। মাছ বিক্রিতে ভালোই লাভ হচ্ছিলো। বিশেষ করে ছোট মাছের চাহিদা বেশি, লাভও বেশি। মাছ ফেরি করে আমার দিনকাল ভালোই চলছিলো। কিন্তু মাছের আড়তে মহাজনদের ভয়ংকর ও বিভৎস রূপ দেখে আমার আক্কেলগুড়–ম হয়ে গেলো। ড্রাম ভরা পানি। তার মধ্যে আছে মাছ। আর ওই ড্রামেই দেয়া হচ্ছে ফরমালিন। এদের আচরণ দেখে মনে হলো, এখানে মানবতার ন্যূনতম মূল্যবোধ নেই। শুনেছি অর্থলোভী মানুষগুলো নাকি সমাজে ভয়ংকর হয়। তাই তাদের বলা হয় অর্থপিশাচ। এবার স্বচক্ষে দেখলাম সেই অর্থ পিশাচদের। এরাই সেই মানুষ নামের অমানুষ। এদের কার্যকলাপ দেখে বাধ সাদলো আমার বিবেক। এই ফলমূল, শাক-সবজি ও মাছ ব্যবসায়ীরা এতোটাই খারাপ যে, তা ভাষায় ব্যক্ত করা কঠিন। এদের ভেতরে মানবতা বলতে কিছু নেই। এরা পুকুর বা নদীতে ফরমালিন ঢেলে মাছ লালন করতেও পারে। এরাই সব অসম্ভবকে সম্ভব করতে পারে।

অবশ্য আম, আনারসসহ বেশকিছু ফলে মেডিসিন দেয়া হচ্ছে দ্রুত বড় করা এবং পাকানোর জন্য। সবজি ক্ষেতেও এখন তাই হচ্ছে। এসব দেখে আমার মনে হলো- ‘মানুষ মানুষের জন্য’ কথাটা মনে হয় ভুল। দেশে শুধু ফল, সবজি আর মাছেই ফরমালিন দেয়া হয় না। ফরমালিন দেয়া হচ্ছে প্রশাসন, রাজনৈতিক দল এবং দলের নেতাকর্মীদের মগজে। সংবিধানের ৭০ ধারা দ্বারা পার্লামেন্টেও ফরমালিন দেয়া হয়েছে। যেখানে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে কেউ কোনো মতপ্রকাশ করতে পারবে না। তাই আমি ওসব অমানবিক ব্যবসা ছেড়ে দিয়ে পরিচ্ছন্ন ও ফরমালিনমুক্ত সকলের গ্রহণযোগ্য গণতন্ত্র ফেরি করে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ঢাকার রাজনৈতিক দলের অফিসের সামনে অথবা বিভিন্ন মহল্লায় নির্ভয়ে আমি হাঁক দিয়ে বলি, নেবেন গো- ফরমালিনমুক্ত গণতন্ত্র! আছে আব্রাহাম লিংকনের গণতন্ত্র, আছে সোহরাওয়ার্দীর গণতন্ত্র, আছে ভাসানীর গণতন্ত্র, আছে বঙ্গবন্ধুর শেখ মুজিবের গণতন্ত্র। আমার গণতন্ত্রে কোনো ফরমালিন বা মেডিসিন নেই। নেবেন গো- গণতন্ত্র, নেবেন! সম্পাদনা : সালেহ্ বিপ্লব

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ