প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘কওমি জননী’ খেতাব নিয়ে আলেমসমাজে অস্বস্তি

ডেস্ক রিপোট: আজ মহা সমারোহে সম্পন্ন হলো মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে আয়োজিত শুকরানা মাহফিল। কওমি শিক্ষা সনদের স্বীকৃতি আইন জাতীয় সংসদে পাশ করার ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রাখায় প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে এ বিশেষ মাহফিলের আয়োজন করে সম্মিলিত কওমি শিক্ষাবোর্ড আল-হাইআতুল উলয়া লিল-জামিয়াতিল কওমিয়া।

আজ ৪ অক্টোবর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দি উদ্যানে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত এ মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়।

শুকরিয়া মাহফিলে সারাদেশের লক্ষাধিক কওমি শিক্ষার্থী ও শিক্ষক, ইমাম-খতিব ও আলেম-উলামা অংশগ্রহণ করেন।

হাইয়াতুল উলয়ার চেয়্যারম্যান আল্লামা আহমদ শফীর সভাপতিত্বে শুকরানা মাহফিলে প্রধান অতিথি ছিলেন গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সমাবেশে বক্তব্য রাখেন হাইয়াতুল উলয়ার অংশিদার ৬ বোর্ডের শীর্ষ নেতৃত্বসহ দেশবরেণ্য উলামায়ে কেলাম এবং মন্ত্রীপরিষদের সদস্যবৃন্দ।

বক্তব্যে তারা কওমি মাদরাসার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও অবদানের কথা তুলে ধরেন। কওমি শিক্ষা সনদের স্বীকৃতির প্রয়োজনীয়তা এবং তা প্রদানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা ও অবদানের ভূয়সী প্রশংসা করেন অতিথিরা।

তারা বলেন, প্রধানমন্ত্রীর দৃঢ় প্রত্যয় না থাকলে আজ কওমি শিক্ষা সনদের স্বীকৃতি আইন জাতীয় সংসাদে পাশ হতো না। এ ক্ষেত্রে তিনি সব ধরনে চাপ ও ভিন্নমত উপেক্ষা করে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বক্তব্যেও বলেন, কওমি শিক্ষাধারার মাধ্যমেই এ দেশে শিক্ষার সূচনা হয়েছে। নিরক্ষরতামুক্ত শিক্ষিত ও আদর্শ জাতি গঠনে কওমি মাদরাসার অবদান অসামান্য।

প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, আমি জাতীয় সংসদে আইন পাশ করেছি যেন কেউ এসে তা বাতিল করতে না পারে।

এর সবকিছু আল্লাহর জন্য করেছেন বলে উল্লেখ করেন তিনি।

এ বক্তব্য শুধু আজ নয় বরং আরও একাধিকবার প্রধানমন্ত্রী বলেছেন ‘এ কাজ তিনি আল্লাহর জন্য করেছেন’। স্বীকৃতি বাস্তবায়ন কমিটির সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যেও বিষয়টি এভাবেই এসেছে।

তারা বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী তাদের বলেছেন স্বীকৃতির কোনো বিনিময় তিনি চান না। সংবর্ধনাও চান না তিনি। শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তিনি স্বীকৃতি প্রদান করেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় ভদ্রোচিত সৌজন্য ও শুকরিয়া প্রকাশেই ছিল সোহরাওয়ার্দি উদ্যানের এই শুকরানা মাহফিল।

তবুও মঞ্চে উপস্থিত কারো কারো বক্তব্যে অতিরঞ্জন ও অতি উৎসাহে বিরক্ত হয়েছেন অন্যরা। বিশেষত বেফাকুল মাদারিসিল কওমিয়া, গহরডাঙ্গা বোর্ডের সভাপতি মুফতী রুহুল আমিনের নিজের পক্ষ থেকে একটি খেতাব প্রদানের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছেন দেশের শীর্ষ আলেমরা। তিনি শুকরানা মাহফিলের মঞ্চে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ‘কওমি জননী’ খেতাব প্রদান করেন।

তিনি তার বক্তব্যে বলেন, ‘(স্বীকৃতি প্রদানের ক্ষেত্রে) এই চৌদ্দ লক্ষ শিক্ষার্থীর জননী ভূমিকা আপনি পালন করেছেন। আজ আমি এই জনসমুদ্র থেকে আপনাকে উপাধি দিলাম আপনি কওমি জননী।’

মুফতী রুহুল আমিনের এই বক্তব্য জাতীয় গণমাধ্যমে ঢালাও করে প্রচার করছে। দাবি করা হচ্ছে, শুকরানা মাহফিলের মঞ্চ থেকে এ খেতাব দেয়া হয়েছে। এতে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে সর্বস্তরের আলেমদের মাঝে। কানাঘুষা শুরু হয়েছে মাহফিল অঙ্গনেই। দেশের একাধিক শীর্ষ আলেমের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা ইসলাম টাইমসকে তাদের আপত্তির কথা জানান।

তারা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে বলেন, জনক-জননীর প্রচলিত ধারার সঙ্গে ইসলাম একমত নয়। সুতরাং আমরা মনে করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রতি সম্মান প্রকাশে অন্য কোনো শব্দও ব্যবহার করা যেতো। যেমন অন্যরা করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর সাহসিকতা, ভূমিকা ও অবদানের জন্য আমরা তার প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু এজন্য এমন শব্দ কেন ব্যবহার করতে হবে যা ইসলামি আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, তা আমাদের বোধগম্য নয়।

দেশের শীর্ষ আলেম বাংলাদেশ কওমি মাদরাসা শিক্ষাবোর্ড বেফাকের সহ-সভাপতি ও হাইআতুল উলয়ার সদস্য আল্লামা আযহার আলী আনোয়ার শাহ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলছি, মুফতী রুহুল আমিন যে শব্দ ব্যবহার করেছেন তার সঙ্গে আমি একমত নই। এটা হাইআতুল উলয়ার সিদ্ধান্তও না। বরং তার একান্ত ব্যক্তিগত বক্তব্য।’

আল্লামা আনোয়ার শাহ মনে করেন দেশের শীর্ষ আলেমদের মঞ্চ থেকে এমন একটি বক্তব্য দেয়ার আগে অবশ্যই তার আরও সতর্ক হওয়া উচিৎ ছিলো। এমন একটি কথা হঠাৎ হুজুগে বলে ফেলাটা নির্বুদ্ধিতার পরিচয়, বাচালতার পরিচয়।

এমন শব্দচয়ন কারো-ই ভালো লাগেনি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মঞ্চে উপস্থিত আজাদ এদারায়ে তালিমের একজন শীর্ষ কর্মকর্তা ও প্রবীণ আলেম নাম না প্রকাশের শর্তে বলেছেন, এটা হাইআতুল উলয়ার সিদ্ধান্ত নয় এবং আমাদের বোর্ডের সিদ্ধান্তও নয়। বক্তার বক্তৃতায় চলে এসেছে।

এমন ‘শব্দচয়ন’ তার পছন্দ হয়নি বলেও জানিয়েছেন বর্ষীয়ান এ আলেম।

মুফতী রুহুল আমীনের এমন উৎসাহী বক্তব্য নিয়ে সামাজিক মাধ্যমেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখাতে শুরু করেছেন অনেকেই। তারা বলছেন, একটি শিক্ষাবোর্ডের প্রধান হিসেবে শব্দ ব্যবহারে আরও ভারসাম্য রক্ষা প্রয়োজন ছিলো তার।

উল্লেখ্য, মুফতী রুহুল আমিন এবার নড়াইল-১ আসন থেকে নৌকা প্রতীকে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ঘোষণা দিয়েছেন। শুকরানা মাহফিলে তার অনুসারীদের মধ্যে বিশেষ কথা সংবলিত গেঞ্জি পরে দৃষ্টি আকর্ষণের নানান চেষ্টাও চোখে পড়েছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ