প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়ার অংশ নেওয়া সম্ভব!

প্রিয় সংবাদ : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কিছুদিন পরেই। এ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভোটের মাঠে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন দলের সম্ভাব্য এমপি প্রার্থীরা।

এদিকে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) দুই মামলায় ১৭ বছরের সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে রয়েছেন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া। তিনি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না, তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।

সাজাপ্রাপ্ত অবস্থায় কারাগারে থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদ, সাবেক মন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর, বর্তমান ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া।

এমন বাস্তবতায় বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না। সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা হয় ।

আইনজ্ঞরা বলছেন সাজা স্থগিত হলে খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশ নিতে বাধা নেই। সে ক্ষেত্রে কারাগারের ভেতরে থেকেও নির্বাচন করতে পারবেন খালেদা জিয়ার।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে প্রার্থীর অযোগ্যতা নিয়ে সংবিধানে যা বলা আছে,

সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৬৬ (২) এ বলা হয়েছে, কোন ব্যক্তি সংসদের সদস্য নির্বাচিত হইবার এবং সংসদ-সদস্য থাকিবার যোগ্য হইবেন না, যদি (ক) কোন উপযুক্ত আদালত তাহাকে অপ্রকৃতিস্থ বলিয়া ঘোষণা করেন।

(খ) তিনি দেউলিয়া ঘোষিত হইবার পর দায় হইতে অব্যাহতি লাভ না করিয়া থাকেন।

(গ) তিনি কোন বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করেন কিংবা কোন বিদেশি রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য ঘোষণা বা স্বীকার করেন

(ঘ) তিনি নৈতিক স্খলনজনিত কোন ফৌজদারী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া অন্যুন দুই বৎসরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং তাহার মুক্তিলাভের পর পাঁচ বৎসরকাল অতিবাহিত না হইয়া থাকে।

(ঙ) তিনি ১৯৭২ সালের বাংলাদেশ যোগসাজশকারী (বিশেষ ট্রাইব্যুনাল) আদেশের অধীন যে কোন অপরাধের জন্য দণ্ডিত হইয়া থাকেন।

(চ) আইনের দ্বারা পদাধিকারীকে অযোগ্য ঘোষণা করিতেছে না, এমন পদ ব্যতিত তিনি প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোন লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকেন; অথবা

(ছ) তিনি কোন আইনের দ্বারা বা অধীন অনুরূপ নির্বাচনের জন্য অযোগ্য হন।

৩[(২ক) এই অনুচ্ছেদের (২) দফার (গ) উপ-দফাতে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, কোন ব্যক্তি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের নাগরিক হইয়া কোন বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করিলে এবং পরবর্তীতে উক্ত ব্যক্তি-

(ক) দ্বৈত নাগরিকত্ব গ্রহণের ক্ষেত্রে, বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ত্যাগ করিলে; কিংবা

(খ) অন্য ক্ষেত্রে, পুনরায় বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণ করিলে-

এই অনুচ্ছেদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তিনি বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জন করিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন না।]

৪ (৩) এই অনুচেছদের উদ্দেশ্য সাধনকল্পে কোন ব্যক্তি কেবল রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, ডেপুটি স্পিকার, মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপ-মন্ত্রী হইবার কারণে প্রজাতন্ত্রের কর্মে কোন লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত বলিয়া গণ্য হইবেন না।]

(৪) কোন সংসদ-সদস্য তাহার নির্বাচনের পর এই অনুচ্ছেদের (২) দফায় বর্ণিত অযোগ্যতার অধীন হইয়াছেন কিনা কিংবা এই সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুসারে কোন সংসদ-সদস্যের আসন শূন্য হইবে কিনা, সে সম্পর্কে কোন বিতর্ক দেখা দিলে শুনানি ও নিষ্পত্তির জন্য প্রশ্নটি নির্বাচন কমিশনের নিকট প্রেরিত হইবে এবং অনুরূপ ক্ষেত্রে কমিশনের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হইবে।

(৫) এই অনুচ্ছেদের (৪) দফার বিধানাবলী যাহাতে পূর্ণ কার্যকারিতা লাভ করিতে পারে, সেই উদ্দেশ্যে নির্বাচন কমিশনকে ক্ষমতাদানের জন্য সংসদ যেরূপ প্রয়োজন বোধ করিবেন, আইনের দ্বারা সেইরূপ বিধান করিতে পারিবেন।

খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড হওয়ার পর সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, ‘সংবিধানে বলা আছে, নৈতিক স্খলনের জন্য কারও যদি দুই বছরের অধিক সাজা হয়, তাহলে তিনি সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।’

সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি জয়নুল আবেদীন বলেন, ‘আমরা সাজার বিরুদ্ধে আপিল করব। আপিলে সাজা স্থগিত চাইব। সাজা স্থগিত হলে তিনি (খালেদা জিয়া) নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। কোনো সমস্যা হবে না।’

সংবিধানে বলা আছে কেউ দুই বছরের সাজাপ্রাপ্ত হলে নির্বাচনের অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। তাহলে খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সংবিধানে নাগরিকের অধিকারের কথাও বলা আছে।’

কারাগারের ভেতর থেকে সংসদ নির্বাচনে খালেদা জিয়া অংশ নিতে পারবেন কি না? এমন প্রশ্নের জবাবে বার কাউন্সিলের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল বাসেত মজুমদার বলেন, ‘সাজা সাসপেনশন (স্থগিত) হলে খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন। উদাহরণ হিসেবে তিনি ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার কথা উল্লেখ করেন।

খালেদা জিয়ার সাজা ও নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, ‘সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নৈতিক স্খলনজনিত কারণে অভিযুক্ত হলে দুই বছরের অধিক সাজা হলে সাজার পরবর্তী পাঁচ বছর তিনি নির্বাচনে অযোগ্য হবেন- এই হলো বিধান।’

শফিক আহমেদ বলেন, ‘কিন্তু সাজাটি সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত যেতে হবে। নিম্ন আদালতে সাজা হলে হাইকোর্টে আপিল হবে, তারপর আবার সুপ্রিম কোর্টে আপিল হবে। সে পর্যন্ত গিয়ে যদি সাজা টিকে যায়, তাহলে তিনি সাজা খাটার পরবর্তী পাঁচ বছর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ক্ষেত্রে অযোগ্য হবেন।’

দুদকের আইনজীবী মোশারফ হোসেন কাজল বলেন, ‘খালেদা জিয়া দুটি মামলায় অভিযুক্ত ও সাজাপ্রাপ্ত। বিচারিক আদালতে দুটি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়েছেন ১২ বছরের। উচ্চ আদালতে একটি ৫ বছর সাজা বাড়ানো হয়েছে। তিনি প্রধানমন্ত্রী থাকা অবস্থায় ক্ষমতার অপব্যবহার করেছন। এতিমের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। সংবিধানের ৬৬(২) অনুচ্ছেদে বলা আছে কারও নৈতিক পদস্খলের কারণে দুই বছরের সাজা হলে তিনি সাজা খাটার পরবর্তী ৫ বছর নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না। আমি মনি করি খালেদা জিয়া নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন না।’

তবে এ ক্ষেত্রে ভিন্ন নজির দেখা যায়। অবৈধভাবে সম্পদ অর্জনের দায়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় বিশেষ জজ আদালত ২০০৭ সালের ২৬ জুলাই এক রায়ে ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীরকে ১৩ বছরের সাজা দেয়। এরপর ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চাঁদপুর-১ আসনে প্রার্থী হতে মনোনয়ন পত্র দাখিল করলে ১৩ বছরের সাজার কারণে ৩ ডিসেম্বর চাঁদপুরের রিটার্নিং অফিসার তার মনোনয়ন পত্র বাতিল করেন। এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি ইসিতে আপিল করলেও ইসি রিটার্নিং অফিসারের সিদ্ধান্তই বহাল রাখে। নির্বাচন কমিশনের এই সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে মহিউদ্দীন খান আলমগীর ২০০৮ সালের ১৫ ডিসেম্বর হাইকোর্টে রিট করলে আদালত সেদিনই তার আবেদনটি সরাসরি খারিজ করে দেন। কিন্তু মহিউদ্দিন খান আলমগীরের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ১৮ ডিসেম্বর আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি হাইকোর্টের রায় স্থগিত করেন। একই সঙ্গে তাকে নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ দিতে ইসিকে নির্দেশ দেন চেম্বার বিচারপতি। পরে তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন।

আবার ২০০৭ সালের ১৩ জুন অবৈধ সম্পদ অর্জনের দায়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)’র সহকারী পরিচালক নূরুল আলম মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়ার বিরুদ্ধে ২৯ লাখ টাকার মালিক হওয়ার অভিযোগ এনে সূত্রাপুর থানায় মামলা করেন। সে মামলায় ২০০৮ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার বিশেষ জজ আদালত মায়াকে ১৩ বছর কারাদণ্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করে। ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন মায়া চৌধুরী। ২০১০ সালের ২৭ অক্টোবর শুনানি শেষে ১৩ বছরের কারাদণ্ড বাতিল করে খালাসের রায় ঘোষণা করে হাইকোর্ট। এ রায়ের বিরুদ্ধে দুদকের আবেদনের পর ২০১৫ সালের ১৪ জুন মায়াকে হাইকোর্টের দেওয়া খালাসের রায় বাতিল করে আপিল বিভাগ। একইসঙ্গে হাইকোর্টে নতুন করে আপিল শুনানির নির্দেশও দেওয়া হয়। এরপর হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দুদকের করা আপিলের শুনানি শেষে এ মামলাটি হাইকোর্ট পুনরায় শুনানির আদেশ দেয়। শুনানি শেষে আদালত চলতি বছরের ৮ অক্টোবর মায়া চৌধুরীকে এ মামলা থেকে খালাস দেয়া হয়। সাজাপ্রাপ্ত অবস্থায় তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচন অংশ নেন এবং এখন মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ