প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

রূপের মোহ

মো. শাহদাত হোসেন: শেক্সপিয়ারের ‘কিং লিয়ার’ নাটকে আমরা দেখেছি, বোকামি কখনো কখনো জ্ঞানের মুখোশও হতে পারে। কিন্তু একজন পুরুষ যখন সৌন্দর্য্যের ফাঁদে পড়ে, সে তাঁর সব জ্ঞান বিসর্জন দেয়। অর্ধেক রোমান সাম্রাজ্যের সম্রাট এন্টনি, ফ্লোরেন্টাইন শহরের চিত্রকর আন্দ্রে দেল সার্টো, ট্রোজান রাজকুমার প্যারিস – এরা সবাই রূপের মোহে বোকা বনে যাওয়ার উজ্জ্বল উদাহরণ। রূপের প্রেমে এরা হারিয়েছে রাজ্য, স্বাস্থ্য, পরিবার, সম্মান- সব। সুন্দরী নারীরা যে শুধু অন্যদের রূপে বোকা বানান তা নয়। তারা নিজেরাও নিজেদের রূপে বোকা বনে যান। প্রত্যেক সুন্দরী স্ত্রীই তার স্বামীর চোখে নিজের সৌন্দর্য মেপে নেন। “আমি কি সুন্দর?” “তুমি কি আমাকে সুন্দর বলে বিয়ে করেছো?” – এসব প্রশ্ন করে করে।

রূপমুগ্ধ আমি কখনো তাঁকে বলতে পারিনি সে আসলে সুন্দরী কি না! এটা অনেকটা ট্রোজান রাজকুমার প্যারিসের মত পরিস্থিতি, যা আমি সচেতনভাবে এড়িয়ে চলি। জানি না, কে তাঁর মাথায় এই ধারণা ঢুকিয়েছে যে সৌন্দর্য ভালোবাসা মাপার মাপকাঠি। আমার নিরুত্তর থাকাকে সে প্রেমের অভাব বলেই মনে করে। মাঝে মাঝে মনে হয়, সুন্দরীদের মাথার ভেতরে একটা ইকো চেম্বার আছে। যেখানে শয়তান অনবরত বলে যায়, “তুমি এত সুন্দর! তোমার স্বামী/প্রেমিক এর কদর বোঝে না!!”

সব সুন্দরী নারী জীবনসঙ্গী নির্বাচনের ব্যাপারে অবিবেচক। সৌন্দর্য আর প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি, যুদ্ধ দেবতা অ্যারেসকে বাদ দিয়ে খোঁড়া কুমোর দেবতা হেপাস্টাসকে বেছে নিয়েছিলো। হেলেন ইউলিসিস, আচিলেস, অ্যাজাক্সকে প্রত্যাখ্যান করে দূর্বল মেনেলাসকে পছন্দ করেছিলো।

সুন্দরী নারীরা আসলে কারুরই হন না শেষমেষ। হেলেন, ক্লিওপেট্রা ক্রিসেইডা আর লুকরাজিয়া এর বড় উদাহরণ। ইতিহাস বলে, আলেকজন্দ্রিয়ায় যখন ক্লিওপেট্রার প্রাক্তন প্রেমিক অক্টাভিয়াস সিজারের হাতে অবরুদ্ধ ছিলো, বর্তমান প্রেমিক মার্ক এন্টোনির সঙ্গে প্রতারণা করে ক্লিওপেটরা চেষ্টা করেছিলো সিজারের সঙ্গে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের। ব্যর্থ হলে পরিস্থিতি ক্লিওপেট্রাকে বাধ্য করেছিলো সাপের কামড় খেয়ে আত্মহত্যা করতে। নেহাত নাট্যকার আর কবিরাই ক্লিওপেট্রাকে প্রেমের চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে ছেড়েছেন। আন্দ্রে দেল সার্তো তাঁর কেরিয়ার, বিখ্যাত চিত্রকর হবার সম্মান, বাবা মা – সব বিসর্জন দিয়েছিলো তাঁর সুন্দরি বউ লুকরাজিয়ার জন্য। কিন্তু লুকরাজিয়ার আগ্রহ ছিল তার এর দূর সম্পর্কের জুয়ারি ভাইয়ের প্রতি।

এমন ভয়ানক সৌন্দর্যকে কবি ব্রাউনিং বর্ণনা করেছিলেন, “সরীসৃপীয় রূপ” (Serpentining beauty) বলে। অনেকটা বাইবেলে বর্ণিত সাপের মত, যে কিনা পুরুষের সুখ ধ্বংস করেছিলো। এমন বিধ্বংসী নারীদের কেউ কেউ আবার বিবাহ-বণিক। একের পর এক বিবাহ করে স্বামীদের নিঃস্ব রিক্ত করে ছেড়ে দেয়াই এদের কাজ। এরা যেন পতঙ্গভোগী ফুলের মতন। সুন্দর সুন্দর রং দেখিয়ে আকর্ষণ করবে। একবার বাগে পেলেই জীবন নরক বানিয়ে দেবে। বিদেশ ফেরত ধনী পুরুষকে ফাঁদে ফেলতে তাদের সংঘবদ্ধ দল থাকে। আফ্রোদিতির রূপে হুশ হারিয়েছিলো প্যারিস। তাঁকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছিলো, হেরা, অ্যাথেন্স আর আফ্রোদিতি – এই তিন দেবীর মধ্যে সেরা জনকে নির্বাচনের। প্যারিস জ্ঞান, সম্পদ আর ক্ষমতাকে প্রত্যাখ্যান করে সেরা সুন্দরী হেলেনকে নির্বাচন করেছিলো। যার মাসুল সে দিয়েছিলো নিজের জাতির ধ্বংসের মাধ্যমে।

মিস ওয়ার্ল্ড প্রতিযোগিতার বিচারকরাও রূপের কাছে প্রতারিত। আমি পুরুষ জাতিকে এমন সব ফাঁদ হতে সতর্ক থাকার আহ্বান জানাই। সবচেয়ে বেশি হুশিয়ার থাকুন ভয়ঙ্কর সুন্দরীদের ব্যাপারে।

(লেখক ঢাকা কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। মূল ইংরেজী লেখা থেকে অনূদিত ও ঈষৎ সংক্ষেপিত)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ