প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শ্রীলঙ্কার জটিল সময়

এ. এস. এম রিয়াদ আরিফ: কি হচ্ছে শ্রীলঙ্কায়! দ্বীপ দেশটিতে গত কয়েকদিন ধরেই নতুন ধরনের এক রাজনৈতিক নাটক চলছে। আর এই নাটককে রাজনীতিবিদরা নাম দিয়েছেন ‘সাংবিধানিক সঙ্কট’। আগে কখনোই দেশটি এই ধরনের সমস্যায় পড়েনি। নতুন এই সঙ্কটে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে। তবে সাধারণ জনগণ আর এ ধরনের নাটক দেখতে চান না। দ্রুতই তারা দেশটিতে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনার পক্ষে।

নতুন এই সঙ্কটের শুরু গত ২৬ অক্টোবর। ঐদিন প্রেসিডেন্ট মাইথ্রিপালা সিরিসেনা প্রধানমন্ত্রী রানিল বিক্রমাসিংহকে বরখাস্ত করেন। পরের দিন স্থগিত করেন পার্লামেন্ট। ভেঙে দেন মন্ত্রিসভা। সঙ্কট চরমে ওঠে, যখন তিনি সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দ রাজাপাকসেকে নতুন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেন। দুর্নীতি ও যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত রাজাপাকসে ২০১৫ সালের নির্বাচনে হেরে গিয়েছিলেন। প্রেসিডেন্টের হঠাৎ নেয়া এই সিদ্ধান্তে দেশটি রাজনীতি তো বটেই অর্থনীতিও অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

শ্রীলঙ্কার পার্লামেন্টে মোট ২২৫ আসন। ২০১৫ সালের নির্বাচনে দেশটির ইউনাইটেড ন্যাশনাল পার্টির প্রধান রণিল বিক্রমাসিংহ পেয়েছিলেন ১০৫ আসন। আর রাজাপাকসে’র ফ্রিডম পার্টি পেয়েছিলো ৯৫টি আসন। কিন্তু বর্তমানে দুজনের কারোরই ১০০টি আসনও নেই। এ পরিস্থিতিতে নতুন প্রধানমন্ত্রী রাজাপাকসে’কে পার্লামেন্টে সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রমাণ দিতে হবে। না দিতে পারলে প্রেসিডেন্ট সিরিসেনাকেও পদত্যাগ করতে হবে। এই পরিস্থিতে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে দেশটিতে নতুন জাতীয় ও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। কিন্তু শ্রীলঙ্কার বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা মোটেই ভালো নয়। বর্তমানে দেশটির মোট প্রবৃদ্ধি মাত্র ৩.১%।

সার্কভূক্ত দেশগুলোর মধ্যে শ্রীলঙ্কার উন্নয়ন সূচক অপেক্ষাকৃত ভালো ছিলো। দেশটিতে সাক্ষরতার হারও সন্তোষজনক, প্রায় ৯২ শতাংশ। হঠাৎ শুরু হওয়া এই রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেশটির এই উন্নয়নের জন্য হুমকি স্বরূপ। তার উপর এই পরিস্থিতির দিকে বিশেষ নজর রয়েছে এই অঞ্চলের প্রভাবশালী দুই দেশ ভারত ও চীনের। প্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই দেশ শ্রীলঙ্কার উপর প্রভাব বিস্তারে এক রকম প্রতিযোগিতায় নেমেছে। অথচ মাত্র বছর দু’য়েক আগে দেশটি গণতন্ত্রের পথে হাঁটার পদক্ষেপ নিয়েছে। রাজনৈতিক এই সঙ্কট সেই অগ্রগতিকেও বাধাগ্রস্ত করবে।

তার উপর শ্রীলঙ্কার ইতিহাস কখনোই তাদের পক্ষে ছিলো না। শ্রলীঙ্কাকে প্রায় তিন দশক ধরে তামিল বিচ্ছিন্নতাবাদী লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম বা এলটিটিই’র সাথে গৃহযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। ২০০৯ সালে ঐ যুদ্ধের অবসান হয়। কিন্তু এরপর থেকেই দেশটিতে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা চলছে। এর কারণ হিসেবে সংখ্যালঘু তামিলদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলগুলো সংখ্যাগরিষ্ট সিংহলি জনগোষ্ঠীকে সুবিধা দিয়ে আসছে। আর বছরের পর বছর তামিলরা উপেক্ষিত হচ্ছে। যার ফলে দেশটির প্রায় সব জায়গায় সহিংসতা লেগেই আছে যা অথনৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যাকে আরো প্রকট করছে। এছাড়া দেশটির মাথায় রয়েছে যুদ্ধাপরাধের কলঙ্ক। গৃহযুদ্ধ চলাকালীনই এলটিটিই ও শ্রীলঙ্কান সামরিক বাহিনী-উভইয়ের বিরুদ্ধেই মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে। বিশেষ করে অপহরণ, চাঁদাবাজি ও শিশুদেরকে সেনা হিসেবে কাজ করানোর অভিযোগ রয়েছে।

কিন্তু ২০০৯ সালে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের অবসান হলে জনমনে নতুন আশার সৃষ্টি হয়েছিলো। আন্তর্জাতিক অনুদানও আসছিলো। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক সংকট, জেগে ওঠা শ্রীলঙ্কাকে আবারো অন্ধকারের দিকেই ঠেলে দিচ্ছে। জনগণ আশা হারিয়ে ফেলছে। আন্তর্জাতিক চাপও বাড়ছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও যদিও বা দেশটিতে জরুরি নির্বাচন দেয়া হয়, তাহলেও দেখা যাবে হেরে যাওয়া দলটি নতুন করে সহিংসতা তৈরি করছে। এজন্য প্রেসিডেন্টের উচিত, দেশটিতে অতি দ্রুত স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে এখনই সব ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা।

(এ. এস. এম রিয়াদ আরিফের লেখা অবলম্বনে)

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ